‘যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই,
যাহা পাই তাহা চাই না।’
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (মরীচিকা)
মানুষের মস্তিষ্ক এক অদ্ভুত গোলকধাঁধা। আমরা যা চাই না, অনেক সময় সেদিকেই ছুটে চলি; যা আমাদের জন্য ক্ষতিকর, তাতেই আসক্ত হয়ে পড়ি। এই যে নিজের মনের সঙ্গে নিজের চিরন্তন যুদ্ধ, এর নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছে একটি হরমোন—যার নাম ডোপামিন।
অনেকে একে ‘সুখের হরমোন’ বা ‘প্লেজার কেমিক্যাল’ বলেন। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, ডোপামিন সম্পর্কে আমাদের ধারণা একেবারেই ভুল। নিউরোসায়েন্টিস্ট নিকোলাই কুকোশকিনের মতে, ডোপামিন আমাদের আনন্দ দেয় না, বরং এটি আমাদের ‘আরো চাই’—এই তাড়নার পেছনে ছোটায়।
আদিম অতৃপ্তি ও বিবর্তনের খেলা
আদিম যুগে মানুষ বনের ফলমূল খেয়ে শান্তিতে ছিল এ ধারণা ভুল। বিবর্তন কেবল তাদেরই টিকিয়ে রেখেছে, তারা ছিল অশান্ত ও অতৃপ্ত। তাদের মধ্যে যারা গুহায় বসে সন্তুষ্ট ছিল না, বরং আরো বেশি খাবার বা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মরিয়া ছিল, তারাই বেঁচে ফিরেছে। পরবর্তীতে বংশবিস্তার করে মানুষকে টিকিয়ে রেখেছে। ডোপামিন হলো সেই আদিম কণ্ঠস্বর যা সবসময় কানে ফিসফিস করে বলে—‘যা আছে তাতে হবে না, আরো বেশি কিছু চাই’।
এখন মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ডোপামিন না থাকলে কী হতো? ১৯১৫-২৬ সালের দিকে ‘এনসেফালাইটিস লেথারজিকা’ নামক এক রহস্যময় রোগে অনেক মানুষ এক ধরনের জড়তায় চলে গিয়েছিল। তারা ক্ষুধার্ত থাকলেও হাত বাড়িয়ে খাবার খেত না, কেউ বল ছুঁড়ে দিলেও ধরত না। তাদের শরীরে মূলত ডোপামিনের অভাব দেখা দিয়েছিল।
ডোপামিনের অভাব মানুষকে পঙ্গু করে না, বরং তাকে এক ‘অন্ধকার কক্ষে’ বন্দি করে ফেলে যেখানে কোনো অনুভূতি বা কাজের ইচ্ছা অবশিষ্ট থাকে না।
ডোপামিন কি সত্যিই ‘সুখ’ দেয়?
ডোপামিন মানুষকে সুখী করে না। গবেষণায় দেখা গেছে, চনমনে থাকার ওষুধ (যেমন অ্যাডারাল) মানুষকে বেশি মনোযোগী বা কর্মক্ষম করে তোলে, কিন্তু তা মনে পরম শান্তি বা ইউফোরিয়া আনে না। এমনকি ইঁদুরের ওপর পরীক্ষায় দেখা গেছে, ডোপামিন বাড়ালে তারা খাবারের জন্য বেশি খাটতে রাজি হয়, কিন্তু তাদের খাবারের স্বাদ উপভোগের মাত্রা বাড়ে না।
ডোপামিন আসলে ‘সারপ্রাইজ’ বা ‘প্রত্যাশার চেয়ে বেশি’ পাওয়ার সংকেত। কেউ লটারি জিতলে যে ডোপামিন নিঃসরণ হবে, বারবার জিতলে তা আর হবে না। কারণ তখন মস্তিষ্ক বিষয়টিকে স্বাভাবিক ধরে নেয়।
আর তাই ডোপামিনকে ‘সুখের সংকেত’ না বলে বরং সংকেত বলা বেশি যুক্তিযুক্ত। যখন মানুষ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে তখন মস্তিষ্ক ডোপামিন ছিটিয়ে সমাধানের পথ খোঁজার জন্য তাড়া দেয়। এ ‘অনিশ্চয়তা’ বা প্যাটার্ন খোঁজার নেশা মানুষকে জুয়া বা সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্ত করে তোলে।
অতৃপ্তিই কি জীবনের চালিকাশক্তি?
ডোপামিনের এ কারসাজি বেশ হতাশাজনক। এর মানে হলো, আমরা যা-ই করি না কেন, শেষ পর্যন্ত মানুষ একঘেয়েমি আর অসন্তুষ্টিতে ভুগবেই। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ হলো—এ একঘেয়েমির ভয়ই নতুন কিছু করতে বাধ্য করে। এই অতৃপ্তিই মানুষকে চাঁদ বা মঙ্গলে পাঠিয়েছে, সৃষ্টি করেছে নতুন নতুন শিল্প ও প্রযুক্তি। বিবর্তন সে প্রাণীকেই পছন্দ করে যে অশান্ত। কারণ যে পশুটি সামান্য খাবারে সন্তুষ্ট হয়ে বসে থাকে, সে ভবিষ্যতের সংকটে টিকে থাকতে পারে না।










