প্রায় সাত দশক ধরে বিশ্বের সবচেয়ে দূর্গম বন, তেপান্তরের সাগর আর উঁচু পর্বতের বুক চষে বেড়ানো মানুষটির নাম স্যার ডেভিড অ্যাটেনবোরো। তার কণ্ঠে যখন আমরা শুনি সমুদ্রের ঢেউ, প্রবালের ঘ্রাণ আর বন্য প্রাণীর রহস্যময় জীবনকথা, তখন মনে হয় প্রকৃতি নিজেই কথা বলছে। প্রকৃতি সংরক্ষণে নিরলস কাজ করে যাওয়া ডেভিড অ্যাটেনবোরো নিজেই যেন হয়ে দাঁড়িয়েছেন প্রকৃতির কণ্ঠস্বর।
৯৯ বছর বয়সেও তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। নতুন প্রামাণ্যচিত্র ‘ওশান উইদ ডেভিড অ্যাটেনবোরো’–এ তিনি এমন সব দৃশ্য তুলে ধরেছেন যা সমানভাবে হৃদয়কে পূর্ণ করে এবং কষ্টও দেয়। প্রবালের রঙিন দুনিয়া, মাছের মিছিল যেমন আছে, তেমনি আছে ধ্বংসযজ্ঞের নির্মম দলিল—বড় বড় ট্রলার সমুদ্রতলের জীববৈচিত্র্যকে এক লহমায় নিশ্চিহ্ন করছে, হাজার হাজার মাছ জালে টেনে তোলা হচ্ছে, আর ধনী দেশগুলো প্রাচীন উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে করছে খাদ্য বঞ্চিত।

ছবি-বিবিসি
‘এটা স্রেফ আধুনিক উপনিবেশবাদ,’ দৃঢ় কণ্ঠে বলেন অ্যাটেনবোরো। ‘বহু প্রজন্মের জীবনযাপনকে ধ্বংস করে এই উপনিবেশবাদ আমরা চালাচ্ছি জলপথে।‘
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে সম্প্রতি দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্মরণ করেন নিজের জীবনের মোড় ঘোরানো সাগরতলে সেই প্রথম ডাইভের অভিজ্ঞতা—১৯৫৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে। ‘প্রথমবার যখন ডুব সাঁতার কেটে প্রবালের কাছে গেলাম, মনে হলো পৃথিবী নতুন রূপে ধরা দিল,’ বলেন তিনি। ‘অসংখ্য মাছ, প্রবালের হাজার রকম গঠন, রঙের মেলা—সব যেন ইন্দ্রিয়কে আক্রমণ করল। সেই অভিজ্ঞতা জীবনের দর্শন বদলে দিয়েছিল।‘
কিন্তু সেই প্রবাল প্রাচীর আর আগের মতো নেই। সাগরের উষ্ণতা ও অমিত লোভের শিকার হয়ে প্রবাল আজ প্রায় মুমূর্ষু। তা সত্ত্বেও অ্যাটেনবোরোর কণ্ঠে ভর করেছে এক ধরনের অদম্য আশাবাদ। তিনি বলেন, ‘আমি ভাবতে চাই, সেই প্রবাল প্রাচীর হয়তো বাঁচবে। যেখানে আমরা প্রকৃতিকে সেরে উঠতে সুযোগ দিয়েছি, সেখানেই সে ফিরে এসেছে। আমার বিশ্বাস, আমরা সমুদ্রকে ছেড়ে না গেলে সমুদ্রও আমাদের ছেড়ে যাবে না।‘
প্রশ্ন করা হয়েছিল—এই প্রামাণ্যচিত্রে কি তার কণ্ঠে ক্ষোভ ফুটে ওঠেছে? তার জবাব— ‘প্রকৃতির এই অযথা ক্ষয় আমাকে কষ্ট দেয়। এই বেদনা যদি দর্শক অনুভব করেন, সেটাই আমার সার্থকতা।‘

ছবি- ওশানোগ্রাফি ম্যাগাজিন
অনেকে জলবায়ু পরিবর্তন আর প্রকৃতি ধ্বংসের কাছে হেরে গিয়ে হতাশ হয়ে পড়ছেন। তাদের উদ্দেশে অ্যাটেনবোরোর বার্তা স্পষ্ট— ‘আশা হারাবেন না। প্রকৃতি আমাদের সবচেয়ে বড় বন্ধু। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিলে, অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই ফিরে আসে সমুদ্রের প্রাণ। মাছ, কচ্ছপ, হাঙর থেকে শুরু করে শৈবাল পর্যন্ত প্রাণবৈচিত্র্য ফিরতে শুরু করে। এটা মানুষেরও কল্যাণ আনে।‘
তিনি বলেন, ‘সব সমাধান দূর ভবিষ্যতের জন্য নয়। যেসব সুরক্ষিত এলাকা সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলো কয়েক বছরের মধ্যেই স্থানীয় মানুষকে সুবিধা দিয়েছে, বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন শোষণ করেছে, আর জীববৈচিত্র্যকে ফিরিয়ে এনেছে। প্রকৃতি ও মানুষ—উভয়েরই জিতে যাওয়ার এই সম্পর্ক আমাদের সামনে উদাহরণ হিসেবে থাকা উচিত।‘

ছবি- দ্য টাইমস
৯৯ বছর বয়সে এখন ঠিক কী তাকে কাজ করে যেতে অনুপ্রাণিত করে— এমন প্রশ্নের জবাবে কিংবদন্তি এই সংরক্ষণবিদ হেসে বলেন, ‘যারা আমার সঙ্গী, তারা এখনো আমায় কাজের প্রস্তাব দেয়। আমি তাদের সঙ্গে কাজ করতে ভালোবাসি। প্রকৃতির গল্প বলা আর কখনোই এত জরুরি ছিল না— এটা বোঝার পর আরো উৎসাহ পাই।‘
অ্যাটেনবোরো মনে করেন, সমাজ আজ প্রকৃতি থেকে অনেক দূরে সরে এসেছে। ‘আমরা বহু উপকার পেয়েছি, সন্দেহ নেই। কিন্তু এর ফলে আমাদের সংবেদনশীলতাও কমেছে—প্রকৃতির ক্ষতি অনেকেই আর টের পান না। তাই গল্প বলা, ছবি তোলা, প্রামাণ্যচিত্র বানানো—সবই এখন আরো প্রয়োজন।‘
জীবনের অন্তিম প্রান্তে এসে কীভাবে নিজের কাজকে স্মরণ করতে চান? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি নির্ভার সুরে বলেন, ‘আমি আশা করি, আমার কাজ একদিন ২০ শতকের শেষ এবং ২১ শতকের শুরুর প্রাকৃতিক নথি হিসেবে গণ্য হবে। আর হয়তো এটাও বোঝাবে, এটাই সেই সময় যখন মানুষ বুঝেছিল—তাদের টিকে থাকার জন্য প্রকৃতিরও টিকে থাকা দরকার।‘










