হংকংয়ের আকাশচুম্বী দালানগুলোয় তখন সন্ধ্যার ব্যস্ততা। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর অজ্ঞাতে তখন ঝলমলে রেস্তোরাঁ ও অভিজাত ক্লাবের আড়ালে দানা বাঁধছে ভয়ংকর ষড়যন্ত্র। ২০১০ সালের সেই এপ্রিলে মার্কিন গোয়েন্দা ইতিহাসের সূচনা হয় এক অন্ধকার অধ্যায়ের।
ওই সময় হংকংয়ে বসবাস করছিলেন জেরি চুন শিং লি। তিনি জেন চেং লি নামেও পরিচিত। ২০০৭ সালে সিআইএর ১৩ বছরের ক্যারিয়ার ইস্তফা দিয়ে এশিয়ার এ আর্থিক কেন্দ্রে চলে যান তিনি। নামী এক অকশন হাউজে সিকিউরিটি চিফের দায়িত্ব নেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ছিলেন ক্ষুব্ধ, যাকে গোয়েন্দা পরিভাষায় বলা হয় ‘ডিসগ্রান্টল্ড’। তার মনে হয়েছিল, সিআইএতে যোগ্য সম্মান পাননি, থমকে গিয়েছিল ক্যারিয়ার।
প্রলোভনের জাল
২০১০ সালের এপ্রিল। হংকংয়ে লির সঙ্গে যোগাযোগ করেন চীনের দুই গোয়েন্দা কর্মকর্তা। তারা জানতেন, লির কাছে এমন সব তথ্য আছে যা বেইজিংয়ের জন্য সোনার খনির চেয়েও দামী। সরাসরি প্রস্তাব দেয়া হলো, মার্কিন জাতীয় প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত গোপন তথ্যের বিনিময়ে দেয়া হবে নগদ ১ লাখ ডলার। শুধু তা-ই নয়, চীন সরকার তাকে ‘সারা জীবনের জন্য’ দেখে রাখবে।
ধারণা করা হয়, লোভ ও ক্ষোভের আগুনে পুড়ে সেই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান লি। মে মাসের মাঝামাঝিতে তার হংকংয়ের এইচএসবিসি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার হংকং ডলার, যা ছিল শুরু। পরবর্তী তিন বছরে লির অ্যাকাউন্টে ধাপে ধাপে জমা হয় আরো কয়েক লাখ ডলার।
ডিজিটাল নথির আড়ালে ষড়যন্ত্র
২০১০ সালের ২৬ মে। ল্যাপটপে একটি ফাইল তৈরি করলেন লি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে সাধারণ কোনো নোট। কিন্তু এতে ছিল মার্কিন গোয়েন্দা নেটওয়ার্কে চরম আঘাত হানার সরঞ্জাম। সেই ফাইলে লি লিখে রেখেছিলেন সিআইএ অফিসারদের নির্দিষ্ট পোস্টিংয়ের অবস্থান, অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তাদের কোথায় নিয়োগ দেয়া হয় তার বিবরণ এবং একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল সিআইএ অপারেশনের সময় ও স্থান।
ফাইলটি তৈরির পর লি তা একটি থাম্ব ড্রাইভে সরিয়ে ফেললেন এবং ল্যাপটপ থেকে মূল ফাইলটি মুছে দিলেন। তিনি জানতেন, ধরা পড়লে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। কারণ এ তথ্যগুলো ছিল ‘সিক্রেট’ শ্রেণির।
গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের ধস
বলা হয়ে থাকে, লির বিশ্বাসঘাতকতার ফল হলো মারাত্মক। ২০১০-১২ সালের মধ্যে চীনের ভেতরে মার্কিন গোয়েন্দা নেটওয়ার্কে অভূতপূর্ব বিপর্যয় নেমে আসে। একের পর এক মার্কিন ‘অ্যাসেট’ বা গুপ্তচর নিখোঁজ হতে শুরু করে। বেইজিং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মার্কিন গোয়েন্দা চক্রের মূলোৎপাটন করছিল। এমনও বলা হয়, লির দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই চীন সরকার ১৮-২০ জন মার্কিন সূত্রকে হত্যা বা কারাবন্দি করতে সক্ষম হয়। সিআইএর জন্য এটি বড় ধরনের বিপর্যয়। এজেন্ট হারানোর পাশাপাশি কৌশলগত পতনও বটে।
ভার্জিনিয়ার ল্যাংলিতে সিআইএ সদর দপ্তরে তখন আতঙ্ক। ভেতরে কোনো ‘মোল’ বা গুপ্তচর আছে কিনা তা নিয়ে তদন্ত শুরু করল এফবিআই। সন্দেহের তালিকায় সবার ওপরে উঠে এল জেরি চুন শিং লির নাম।
হাওয়াইয়ের হোটেল রুম
২০১২ সালের আগস্ট। লি তখন পরিবার নিয়ে হাওয়াইয়ের হনলুলুর একটি হোটেলে অবস্থান করছিলেন। আদালতের অনুমতি নিয়ে তার কক্ষে তল্লাশি চালানো হলো। লির লাগেজের ভেতর পাওয়া গেল সেই ডিলিট করা ফাইলসহ থাম্ব ড্রাইভটি। কিন্তু এর চেয়েও বড় আবিষ্কার ছিল অন্য দুটি জিনিস। ৪৯ পৃষ্ঠার ডে-প্ল্যানার ও ২১ পৃষ্ঠার অ্যাড্রেস বুক।
ডায়েরি দুটিতে লি নিজ হাতে লিখে রেখেছিলেন সিআইএর সবচেয়ে গোপন বিষয়গুলো। সেখানে ছিল মার্কিন গুপ্তচরদের প্রকৃত নাম, ফোন নম্বর, সিআইএর গোপন আস্তানা বা ফ্যাসিলিটির ঠিকানা এবং ২০০৪ সালের আগের বিভিন্ন অপারেশনাল মিটিংয়ের নোট। লির কাছে এ নথিগুলো রাখা ছিল সরাসরি আইন লঙ্ঘন। কারণ চাকরি ছাড়ার সময় অঙ্গীকার করেছিলেন, কোনো গোপন তথ্য নিজের কাছে রাখবেন না।
এফবিআই হুট করেই জেরি চুন শিং লির হোটেল রুমে তল্লাশি চালিয়েছে এমন নয়। এর পেছনে ছিল সংস্থার দীর্ঘদিনের গভীর উদ্বেগ, সুনির্দিষ্ট কিছু ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বা সতর্কবার্তা এবং একটি পদ্ধতিগত তদন্ত।
লির প্রতি সন্দেহের মূল সূত্র হলো, ২০১০-১২ সালের মধ্যে চীনের ভেতর সিআইএর গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়া। মার্কিন কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তারা নিশ্চিত ছিলেন, এত কম সময়ে এত বড় একটা নেটওয়ার্ক ধ্বংস হওয়ার পেছনে অবশ্যই ভেতরের কেউ রয়েছে।
তদন্তকারীরা যখন বিশ্বাসঘাতকের সন্ধান করছিলেন, তখন সন্দেহভাজন হিসেবে লির নাম উঠে আসে। বিশেষ করে তার চাকরির অভিজ্ঞতা মনোযোগ কাড়ে। লি ১৯৯৪ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত সংস্থায় কেস অফিসার হিসেবে কাজ করেছেন। দীর্ঘ ১৩ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি এমন সব তথ্য জানতেন যা ফাঁস হলে চীনে মার্কিন কার্যক্রম ধ্বংস হয়ে যেতে পারত। এছাড়া একসময় চীনের ভেতরেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন লি। ফলে চীনের মাটিতে কারা মার্কিন গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করছে, তাদের নেটওয়ার্ক এবং কার্যক্রম সম্পর্কে তার সরাসরি জ্ঞান ছিল। এছাড়া চীনে ধরা পড়া নেটওয়ার্কের অনেক তথ্যের অ্যাকসেস একসময় লির ছিল।
বিড়াল-ইঁদুর খেলা
২০১২ সালে তল্লাশির পরও লি তৎক্ষণাৎ গ্রেফতার হননি। এফবিআই তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকল। চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কী কথা হয়েছে তা গোয়েন্দারা জানতে চেয়েছিলেন। লি জানালেন, চীনা গোয়েন্দারা কাজের দায়িত্ব দিয়েছিল, কিন্তু তিনি কোনো তথ্য দেননি।
থাম্ব ড্রাইভের ফাইলটির কথা যখন তোলা হলো, লি প্রথমে আকাশ থেকে পড়লেন। এমন কোনো ফাইল তৈরির কথা অস্বীকার করলেন। কিন্তু এক সপ্তাহ পরই ভোল পাল্টে স্বীকার করলেন। বললেন, হ্যাঁ, তৈরি করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু চীনাদের সেটা দেয়ার কথা ভেবেও শেষ পর্যন্ত দেননি।
ধারণা করা হয়, লি বছরের পর বছর মিথ্যা বলে গেছেন। কারণ কখনো চীনা গোয়েন্দাদের তথ্য দেয়ার কথা স্বীকার করেননি। কখনো বলেছেন এগুলো তার ব্যক্তিগত ‘ডায়েরি’, কখনো বলেছেন তিনি কিছুই জানেন না। কিন্তু ব্যাংকে জমা হওয়া লাখ লাখ ডলারের কোনো সদুত্তর লির কাছে ছিল না।
বিচার ও সাজা
২০১৮ সালের জানুয়ারিতে নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে নামার পর লি গ্রেফতার হন। পরের বছরের মে মাসে তিনি আদালতে দোষ স্বীকার করেন। প্রসিকিউটররা দাবি করেন, লির বিশ্বাসঘাতকতা মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে এবং অনেক মানুষের জীবন বিপন্ন করেছে।
অন্যদিকে লির আইনজীবীরা দাবি করেছিলেন যে তিনি ‘চীনা গুপ্তচর’ নন, কিন্তু প্রমাণের পাহাড় ছিল তার বিরুদ্ধে। মার্কিন অ্যাটর্নি জি জ্যাচারি টেরউইলিগার কড়া ভাষায় বলেন, ‘লি তার নিজের দেশকে বিক্রি করে দিয়েছেন।’ বিচারক জেরি চুন শিং লিকে ১৯ বছরের কারাদণ্ড দেন।
বিশ্লেষকদের মতে, লির ১৯ বছরের জেল হয়তো বিচার নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু যে গোয়েন্দা নেটওয়ার্কটি ধ্বংস হয়েছে, তার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সিআইএর হয়তো কয়েক দশক লেগে যাবে।










