যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ অঞ্চলে স্থানীয় সময় রোববার ভোর ২টায় ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে গেছে। এর ফলে দিনটি কার্যত ২৩ ঘণ্টার হয়ে যাবে। এর কারণ হলো ‘ডেলাইট সেভিং টাইম’ উদ্যোগ।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর সময়ের এ পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক হয়। এবারও হচ্ছে। কারণ অনেক মার্কিন এই ব্যবস্থা পছন্দ করেন না। এতে মানুষের ঘুমের সময়সূচি বিঘ্নিত হবে। যেমন সকালবেলা অনেকে কুকুর নিয়ে হাঁটতে বের হন। কিন্তু সময় এগিয়ে যাওয়ায় অন্ধকার থাকতেই তাদের বেরোতে হবে। বির্তকের মাঝেও এ প্রথা বাতিল বা পরিবর্তনের বিষয়ে রাজনৈতিক ও নীতিগত মতভেদ ভীষণ গভীর।

যুক্তরাষ্ট্রে শীতকালে সাধারণ স্ট্যান্ডার্ড টাইম বজায় থাকে। বসন্তে (মার্চে) ঘড়ি ১ ঘণ্টা এগিয়ে ডেলাইট সেভিং টাইম করা হয়। শরতে (নভেম্বরে) আবার ১ ঘণ্টা পিছিয়ে স্ট্যান্ডার্ড টাইমে ফিরে আসে। জনমত জরিপে দেখা যায়, বছরে দুইবার ঘড়ি পরিবর্তনের এ ব্যবস্থাকে অনেকেই অপছন্দ করেন। তবুও এটি পরিবর্তনের মতো রাজনৈতিক উদ্যোগ সফল হয়নি।

ডেলাইট সেভিং টাইম যদি স্থায়ী করা হয়, তাহলে শীতকালে কিছু সময়ের জন্য মিশিগানের ডেট্রয়েটে প্রায় ৯টার দিকে সূর্য উঠবে। আবার যদি সারা বছর স্ট্যান্ডার্ড টাইম রাখা হয়, তবে জুন মাসে সিয়াটলে সূর্য উঠবে ভোর ৪টা ১১ মিনিটে।

সেভ স্ট্যান্ডার্ড টাইম নামের সংগঠনের প্রেসিডেন্ট জে পি বলেন, ‘আমরা কোনো আইন করে সূর্যকে আমাদের ইচ্ছামতো কক্ষপথ থেকে সরাতে পারি না।’

নিউইয়র্ক সিটির বাসিন্দা জিনি লরেন শীতকালে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত অনুসরণ করে কাজ করেন। কাজ শেষে বাইরে বের হয়ে দিনের আলোয় ঘোরার সুযোগ পান না তিনি। ৪১ বছর বয়সী এই স্বাস্থ্যকর্মী বলেন, ‘বছরের বেশিরভাগ সময়ই আমরা ডেলাইট সেভিং টাইমে থাকি। আমরা আসলে এটা কেন করছি?’

যুক্তরাষ্ট্রে সময়ের নিয়ম নিয়ে নানা সময়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। ১৮৮৩ সালে রেলপথের সুবিধার্থে টাইম জোন চালু হওয়ার পর থেকেই বিষয়টি পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশও একইভাবে সময় পরিবর্তনের ব্যবস্থা চালু করেছে। প্রায় ১৪০টি দেশ কোনো না কোনো সময় ডেলাইট সেভিং টাইম ব্যবহার করেছে; বর্তমানে প্রায় অর্ধেক দেশ এটি অনুসরণ করছে।

গত বছরের এক জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ১০ প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে মাত্র একজন বর্তমান ব্যবস্থাকে সমর্থন করেন। প্রায় অর্ধেক মানুষ এর বিরোধিতা করেন এবং প্রায় ৪০ শতাংশের এ বিষয়ে নির্দিষ্ট মতামত নেই। তবে যদি একটি বিকল্প বেছে নিতে বলা হয়, বেশিরভাগ আমেরিকান স্থায়ী ডেলাইট সেভিং টাইমকেই পছন্দ করেন।

২০১৮ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ১৯টি অঙ্গরাজ্য স্থায়ী ডেলাইট সেভিং টাইম চালুর পক্ষে আইন পাস করেছে।

তবে একটি বড় বাধা রয়েছে, এটি কার্যকর করতে কংগ্রেসের অনুমোদন দরকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এবং ১৯৭৪ সালে স্বল্প সময়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে স্থায়ী ডেলাইট সেভিং টাইম চালু ছিল।

২০২২ সালে সিনেট এ বিষয়ে একটি বিল পাস করলেও প্রতিনিধি পরিষদে অনুরূপ বিল ভোটে তোলা হয়নি।

আলাবামার রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান মাইক রজার্স বলেন, এয়ারলাইন শিল্পের চাপও একটি কারণ। তাদের মতে, সময় পরিবর্তনের ফলে ফ্লাইট সূচি জটিল হয়ে পড়তে পারে।

ফ্লোরিডার রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান গ্রেগ স্টিউব আরেকটি প্রস্তাব দিয়েছেন, দুই ব্যবস্থার মাঝামাঝি সমাধান হিসেবে সময় ৩০ মিনিট এগিয়ে দেয়া। তার মতে, এতে দুইপক্ষের মাঝামাঝি সমঝোতা হতে পারে। যদিও এতে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের সময়সূচির সঙ্গে পুরোপুরি মিলবে না।

ঘুম ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সকালে বেশি আলো পাওয়া মানুষের জন্য ভালো।

ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞান অধ্যাপক কারিন জনসন বলেন, স্থায়ী স্ট্যান্ডার্ড টাইম চালু হলে শিক্ষার্থী, চালকসহ সবার দৈনন্দিন কাজের দক্ষতা বাড়তে পারে। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন আমাদের শরীরের জৈবঘড়ি ঠিক রাখতে সকালের আলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কেনেথ রাইট বলেন, ঘড়ি এক ঘণ্টা এগিয়ে দেয়ার পরের কয়েক দিনে সড়ক দুর্ঘটনা, হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে। স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার দিক থেকে স্থায়ী স্ট্যান্ডার্ড টাইমই সবচেয়ে ভালো বিকল্প।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে কেবল অ্যারিজোনা (নাভাহো নেশন বাদে) ও হাওয়াই ডেলাইট সেভিং টাইম অনুসরণ করে না।

গত দুই বছরে কয়েকটি অঙ্গরাজ্য স্থায়ী স্ট্যান্ডার্ড টাইম চালুর বিলের আংশিক অগ্রগতি করেছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে শর্ত রাখা হয়েছে, পাশের অঙ্গরাজ্যগুলোও একই সিদ্ধান্ত নিলে তবেই এটি কার্যকর হবে। যেমন ভার্জিনিয়া বলেছে, মেরিল্যান্ড ও ওয়াশিংটন ডিসি একই সিদ্ধান্ত নিলে তবেই তারা স্ট্যান্ডার্ড টাইমে যাবে।

কলোরাডোর স্কট ইয়েটস ‘লক দ্য ক্লক’ নামের একটি ওয়েবসাইট পরিচালনা করেন। তিন চান ফেডারেল সরকার এমন আইন করুক যাতে দুই বছরের মধ্যে বছরে দুইবার ঘড়ি পরিবর্তনের প্রথা বন্ধ হয়।

তার প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি অঙ্গরাজ্যকে তখন বেছে নিতে হবে, ডেলাইট সেভিং টাইম নাকি স্ট্যান্ডার্ড টাইম।

ততদিন পর্যন্ত তিনি একটি সহজ পরামর্শ দেন, ‘আপনি যদি বস হন, সোমবার কর্মীদের বলুন তারা যেন এক ঘণ্টা পরে কাজে আসে। আর যদি বস না হন, তাহলে আপনার বসকে বলুন, সোমবার এক ঘণ্টা দেরিতে আসতে চান। নিরাপত্তার জন্য একটু বেশি ঘুমান।’

এপি অবলম্বনে