বিশ্বজুড়ে চলছে প্রযুক্তির লড়াই। আর এ লড়াইয়ের নেপথ্যে রয়েছে ১৭টি মূল্যবান ধাতু, বিজ্ঞানের ভাষায় যাদের বলা হয় ‘রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট’ বা বিরল মৃত্তিকা। স্মার্টফোনের ব্যাটারি থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ি কিংবা পরিবেশবান্ধব জ্বালানি সর্বত্র এসব উপাদান অপরিহার্য। তবে প্রচলিত পদ্ধতিতে মাটির গভীর থেকে এ খনিজ আহরণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
এ সংকটের সমাধানে গবেষকরা এখন ভিন্নধর্মী এক পথ দেখাচ্ছেন। অস্ট্রিয়া ও আমেরিকার বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন, কোনো রকম খনন ছাড়াই কেবল শিল্পবর্জ্য ও বিশেষ জাতের ‘ছত্রাক’ ব্যবহার করে এ অমূল্য সম্পদ আহরণ করা সম্ভব।
‘মাইকোমাইনিং’: যখন ছত্রাকই খনি শ্রমিক
ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আলেকজান্ডার বিসমার্ক ও মিচেল জোনস এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, ছত্রাকের শিকড় সদৃশ তন্তু বা ‘মাইসেলিয়া’ প্রাকৃতিকভাবেই মাটি বা কাদা থেকে পুষ্টি শুষে নেয়। ল্যাবরেটরিতে দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কিছু ছত্রাক শিল্পবর্জ্যের স্তূপ থেকে পুষ্টির সঙ্গে বিরল মৃত্তিকা উপাদানগুলো শুষে নিতে সক্ষম। বিজ্ঞানীরা এ পদ্ধতির নাম দিয়েছেন ‘মাইকোমাইনিং’।
পদ্ধতিটি অনেকটা এরকম: শিল্পবর্জ্য বা দূষিত এলাকায় এ ছত্রাক চাষ করা হবে। ছত্রাকগুলো বড় হওয়ার সময় বর্জ্য থেকে মূল্যবান ধাতু শুষে নেবে। পরবর্তীতে এ ছত্রাক পুড়িয়ে অবশিষ্ট ছাই থেকে আলাদা করা হবে বিরল মৃত্তিকা।

ছত্রাকের ছাই থেকে মূল্যবান ধাতু প্রক্রিয়াজাতকরণ
বর্জ্যের স্তূপে লুকানো বিলিয়ন ডলার
এতদিন কয়লার ছাই কিংবা অ্যালুমিনিয়াম তৈরির বর্জ্য ‘রেড মাড’-কে কেবল আবর্জনা হিসেবেই দেখা হতো। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে, বর্জ্যের স্তূপগুলো আসলে বিরল খনিজের ভাণ্ডার। অধ্যাপক জুলিয়েট ক্লিঙ্গার বলেন, আমরা যদি নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখি, তবে দেখব আমাদের চারপাশের বর্জ্যই সম্পদে ঠাসা। মাটির গভীরে গর্ত না করে বর্জ্য থেকেই প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ করা সম্ভব।
পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে কেবল কয়লার ছাইয়ের স্তূপেই প্রায় ৮৪০ কোটি ডলার মূল্যের বিরল খনিজ রয়েছে। রেড মাড বা লাল কাদাতে প্রাকৃতিকভাবে মাটির স্তরের চেয়ে ১০ থেকে ২০ গুণ বেশি ঘনত্বের খনিজ পাওয়া সম্ভব।
টেক্সাসের রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী জেমস ট্যুর এমন একটি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন, যেখানে খুব অল্প সময়ে প্রচণ্ড তাপ ব্যবহার করে বর্জ্য থেকে ধাতু আলাদা করা যায়। এ পদ্ধতিতে জ্বালানি খরচ কম, যন্ত্রপাতি বহনযোগ্য। সেইসঙ্গে এতে খনির মতো পরিবেশ ধ্বংসও হয় না।
চীনের একাধিপত্য ও নতুন কৌশল
বর্তমানে বৈশ্বিক বিরল মৃত্তিকা বাজারের প্রায় ৭০ শতাংশ খনি ও ৯০ শতাংশ প্রসেসিং নিয়ন্ত্রণ করে চীন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো বিশ্বনেতারা এ খনিজ সরবরাহে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় মরিয়া। তবে ছত্রাক প্রযুক্তি বা বর্জ্য থেকে খনিজ আহরণ পদ্ধতি সফল হলে অন্য দেশগুলোর আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্য হারে কমবে। রাইস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেমস ট্যুর উদ্ভাবিত ‘ফ্ল্যাশ জুল হিটিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করে ই-বর্জ্য বা পুরনো কম্পিউটার থেকেও এ খনিজ আহরণের কাজ চলছে।

পরিবেশ ও অর্থনীতির মেলবন্ধন
প্রচলিত খনি প্রকল্পে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়। কিন্তু ছত্রাক বা বর্জ্য ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন খনিজ পাওয়া যাচ্ছে, অন্যদিকে বিষাক্ত বর্জ্য পরিষ্কার বা ‘বায়ো-রেমিডিয়েশন’ সম্পন্ন হচ্ছে। একে পরিবেশ ও শিল্পের একটি ‘সিম্বিওসিস’ বা মিথোজীবী সম্পর্ক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ছত্রাক দ্রুত বেড়ে ওঠে, অন্ধকারে টিকে থাকতে পারে, গাছের তুলনায় অনেক কম যত্নে বড়ও হয়। একবার ছত্রাক সংগ্রহ করা হলে, সেগুলো থেকে বায়োগ্যাস বানানো যেতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরাই বলছেন—এ পদ্ধতি হয়তো পুরো সমাধান নয়, বরং বাড়তি সহায়ক হতে পারে। কারণ ছত্রাকে ধাতুর ঘনত্ব তুলনামূলক কম। পাশাপাশি বড় আকারে ছত্রাক চাষ করলে পরিবেশের ওপর কী প্রভাব পড়বে, সেটাও ভাবনার বিষয়।
যদিও ছত্রাক প্রযুক্তি এখনো গবেষণাগারের সীমাবদ্ধতায় রয়েছে, তবুও ২০৩০ সালের মধ্যে এ পদ্ধতিতে বাণিজ্যিক খনিজ আহরণের স্বপ্ন দেখছেন বিজ্ঞানীরা। বর্জ্য যখন সম্পদে পরিণত হবে, তখন হয়তো ভূ-রাজনীতির মোড় খনি থেকে সরে এসে প্রযুক্তির ল্যাবে স্থির হবে।
বিবিসি অবলম্বনে









