কাশি-সর্দি বা জ্বরের মৌসুমে ঘরোয়া স্বস্তি এনে দেয় ছোট্ট একটি নীল বোতল। মেনথলের ঝাঁঝালো গন্ধ আর বুকে ঘষে দেয়া ঠান্ডা অনুভূতি অনেকের শৈশব স্মৃতিরই অংশ। সেই ছোট্ট নীল বোতলটির নাম ভিক্স ভেপোরাব। সুগন্ধী এ মলম তৈরির পেছনেও রয়েছে আবেগঘন এক গল্প।

যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার ফার্মাসিস্ট লান্সফোর্ড রিচার্ডসনের ছেলের ছিল ‘ক্রুপ’ নামের শ্বাসযন্ত্রের অসুখ। হাপর ধরা কাশিতে ছেলের কষ্ট দেখে ১৮৯৪ সালে তিনি ফার্মেসিতে নানা তেল আর উপাদান মিশিয়ে একটি মলম তৈরি করেন। মেনথল, কর্পূর, ইউক্যালিপটাসসহ নানা তেলের মিশ্রণে তৈরি মলমটি ছেলের শ্বাসকষ্ট ও কাশি কমায়। সেখান থেকেই জন্ম পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিখ্যাত ভিক্স ভেপোরাবের। ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু মহামারির সময় দুনিয়াজুড়ে জনপ্রিয়তা পায় এটি।

রিচার্ডসন প্রথমে এই মলম বাজারে আনেন ২৫ সেন্ট মূল্যে। এতে পেট্রোলিয়াম জেলির সঙ্গে ছিল মেনথল, কর্পূর, ইউক্যালিপটাস ও অন্যান্য তেলের মিশ্রণ। নাকে জমাটভাব দূর করার পাশাপাশি বুক ঘষলে কাশি কমাতেও সাহায্য করে এ মলম। রিচার্ডসন এর নাম দেন ‘ভিক্স ক্রুপ অ্যান্ড নিউমোনিয়া সলভ’। ভিক নামটা নেন তার শ্যালক ডা. জোশুয়া ভিকের নাম থেকে, নামটি তার কাছে সহজ ও আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল।

১৯১১ সালে তার ছেলে হেনরি স্মিথ পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব নেন। তিনি পণ্যের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ভিক্স ভেপোরাব। আর কাঁচের পাত্র বদলে দেন গাঢ় নীল বোতলে। রিচার্ডসন নানা অসুখের জন্য ২১ ধরনের ওষুধ তৈরি করেছিলেন, কিন্তু এগুলোর কোনোটাই জনপ্রিয় হয়নি। তাই হেনরি সব বাদ দিয়ে শুধু ভেপোরাবকে কেন্দ্র করে ব্যবসা গড়ে তোলেন।

১৯১৮ সালে যখন স্প্যানিশ ফ্লু বিশ্বজুড়ে মহামারির রূপ ধারণ করে কেড়ে নেয় ৫ কোটি মানুষের প্রাণ, তখন ভিক্স ভেপোরাব বিক্রি হঠাৎ আকাশচুম্বী হয়। ফ্লু সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে—কেবল পণ্য বিক্রির জন্য নয়, বরং মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে বিজ্ঞাপণ নির্মাণ করেছিল কোম্পানিটি। বিজ্ঞাপনে বলা হতো, ভেপোরাব ব্যবহার করলে শ্বাস নিতে আরাম হয়।

অক্টোবর ১৯১৮-তেই কোম্পানিটি ঘোষণা করে, বিপুল চাহিদায় তাদের কয়েক মাসের মজুদ তিন সপ্তাহেই শেষ হয়ে গেছে। কারখানা দিনে প্রায় ২৪ ঘণ্টা চালু রেখে সপ্তাহে ১০ লাখেরও বেশি বোতল তৈরি করতে থাকে তারা। এক বছরের মধ্যে বিক্রি প্রায় তিনগুণ বেড়ে যায়।

বর্তমানে ভিক্স ভেপোরাব প্রায় ৭০টি দেশে বিক্রি হয়। বছরে উৎপাদিত হয় এক মিলিয়নেরও বেশি গ্যালন মলম। ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে এক বিলিয়নেরও বেশি বোতল বিক্রি হয়েছিল। বর্তমানে এই ব্র্যান্ডের মালিক প্রোক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল।

লেখিকা ক্যাথারিন আর্নল্ড এর মতে, আমেরিকার অনেক প্রজন্ম শীত-জ্বরের মৌসুমে ঘরে সেই নীল বোতলের ভিক্সের গন্ধে বড় হয়েছে। এটি কোকা-কোলা বা ক্যাম্পবেল স্যুপের মতোই এক সাংস্কৃতিক প্রতীক।