মানুষের জীবনযাত্রার সামান্য পরিবর্তন কীভাবে বন্যপ্রাণীর ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে তার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে লস অ্যাঞ্জেলেসের ডার্ক-আইড জাঙ্কো নামের চড়ুইজাতীয় পাখিরা। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, কোভিড-১৯ মহামারীর সময় মানুষের অনুপস্থিতিতে মাত্র কয়েক বছরেই এ পাখিদের ঠোঁটের আকৃতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। বিজ্ঞানিরা বলছেন, এটি ‘দ্রুত বিবর্তনের’ একটি বিরল দৃষ্টান্ত।
ডার্ক-আইড জাঙ্কো সাধারণত পাহাড়ি বনাঞ্চলের পাখি। কিন্তু জলবায়ু সংকটের কারণে তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কয়েক দশক আগে তারা দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার শহুরে পরিবেশে বিশেষ করে লস অ্যাঞ্জেলেসের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া ক্যাম্পাসে বসতি স্থাপন শুরু করে।
গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, পাহাড়ি জাঙ্কোদের ঠোঁট লম্বা হয় যা দিয়ে তারা বীজ ও পতঙ্গ শিকার করে। বিপরীতে শহরের জাঙ্কোদের ঠোঁট তুলনামূলক খাটো ও স্থূল। গবেষকদের মতে, মানুষের ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট খাবারের সঙ্গে মানিয়ে নিতেই তাদের ঠোঁটের এ পরিবর্তন।
ইউসিএলএর গবেষক পামেলা ইয়ে এবং এলিনর ডায়ামন্ট সম্প্রতি ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস’ জার্নালে তাদের গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। তারা জানান, ২০২১-২০২২ পর্যন্ত মহামারীর কারণে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া ক্যাম্পাস বন্ধ থাকাকালীন ডাইনিং হলগুলো অব্যবহৃত ছিল। তখন জন্ম নেওয়া পাখিদের ঠোঁট আবার তাদের পূর্বপুরুষ বা পাহাড়ি পাখিদের মতো লম্বা হতে শুরু করে। কারণ তখন তাদের প্রাকৃতিক খাবারের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল।
২০২৩-২০২৪ সালে বিধিনিষেধ উঠে যাওয়ার পর শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ফিরলে মানুষের ফেলে দেয়া খাবারের সহজলভ্যতা বাড়ে। তখন নতুন প্রজন্মের পাখিদের ঠোঁট আবারো ছোট ও স্থূল হয়ে যায়।
এ বিষয়ে প্রধাণ গবেষক এলিনর ডায়ামন্ট বলেন, ‘আমরা সাধারণত মনে করি, বিবর্তন একটি ধীর প্রক্রিয়া। কিন্তু বছরভিত্তিক তুলনা করার সময় আমরা এ পরিবর্তনের তীব্রতা দেখে সত্যিই অবাক হয়েছি।’
অন্য এক গবেষক বলেন, বিবর্তনের এ ঘটনা চার্লস ডারউইনের গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের ফিঞ্চ পাখিদের কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৮৩৫ সালে ডারউইন দেখেছিলেন ভিন্ন ভিন্ন দ্বীপে খাবারের উৎসের ওপর ভিত্তি করে ফিঞ্চদের ঠোঁট আলাদা হয়। পরবর্তীতে ১৯৭০-এর দশকে খরার কারণেও ফিঞ্চদের মধ্যেও দ্রুত বিবর্তন দেখা যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে ২০১৭ সালে গ্রেট টিট পাখি এবং ২০২৫ সালের এক রিপোর্টে হামিংবার্ডের ক্ষেত্রেও ফিডারের খাবারের কারণে ঠোঁট লম্বা হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে মহামারীর মতো একটি সাময়িক ঘটনার প্রেক্ষিতে দুই দফায় (একবার লম্বা ও পরে আবার খাটো হওয়া) বিবর্তনের এমন ঘটনা আগে কখনো নথিবদ্ধ করা হয়নি।
কর্নেল ল্যাব অব অর্নিথোলজির নির্বাহী পরিচালক ইয়ান ওয়েন্স এ গবেষণাকে ‘চমকপ্রদ’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে গবেষকরা এখনই নিশ্চিতভাবে একে জেনেটিক পরিবর্তন বলছেন না। এর পেছনে জিনগত বা পরিবেশগত অন্য কোন কারণ আছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য তারা বর্তমানে পাখিদের রক্ত থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করছেন। যদিও তারা ‘জিন ফ্লো’ বা অন্য এলাকা থেকে পাখির আগমনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। কারণ পাখিদের আচরণে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে ইউসিএলএর অধ্যাপক পামেলা ইয়ে বলেন, ‘মানুষ ও প্রকৃতি আসলে একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আমাদের বাড়ির আঙিনাতেই হয়তো প্রতিনিয়ত এমন দ্রুত বিবর্তন ঘটছে যা আমরা লক্ষ্য করছি না।’
সিএনএন অবলম্বনে









