বিশ্বের অসাধারণ ডিজাইনারদের একজন জর্জিও আরমানি, যিনি সৃষ্টি করেছেন অনবদ্য সব নকশা এবং প্রতীকী মডেল। তবে তার সম্পর্কে এমন কিছু বিষয় আছে যা অনেকেই জানেন না। তিনি একজন নিরামিষভোজী, মদ্যপান করেন না, সাধারণত কালো পোশাক পরেন এবং অবিশ্বাস্যরকম বিনয়ী। তিনি খুব কম সাক্ষাৎকার দেন, তাই তার ব্যক্তিগত জীবনের অনেক কিছুই রহস্যে ঘেরা। চলুন জেনে নেয়া যাক জর্জিও আর্মানি সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য—

৪০ বছর বয়সে স্বাধীন ক্যারিয়ার

বয়স চল্লিশের কোঠায় পৌছালে যেখানে অনেকেই মিডলাইফ ক্রাইসিস এ ভোগেন সেখানে জর্জিও আরমানি ৪০ বছর বয়সে স্বাধীন ক্যারিয়ার শুরু করেন। জীবনসঙ্গী সের্জিও গালেয়োত্তির অনুপ্রাণা ও সহযোগীতায় একটি ছোট ঘর থেকে শুরু করেন—আরমানি পোশাক বানাতেন, আর গালেয়োত্তি সেগুলো ডিপার্টমেন্ট স্টোরে বিক্রি করতেন। শুরুতে তহবিল আসে পুরনো গাড়ি বিক্রি করে। ১৯৭৫ সালে তারা প্রথম কালেকশন উপস্থাপন করেন, যেখানে সীমিত কিছু পুরুষ ও নারীর পোশাক ছিল। অর্থনৈতিক মন্দার সময়ও এ সংগ্রহ বিশাল সাফল্য পায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের বড় ডিপার্টমেন্ট স্টোর বার্নিজে বিক্রি হয়।

প্রতিটি লাইন আলাদা ব্র্যান্ডের অধীনে

আন্তর্জাতিক সাফল্যের পর আরমানি শুধু পোশাকেই থেমে থাকেননি, বরং ফ্যাশনের সঙ্গে মিল রেখে অন্যান্য জিনিসও তৈরি করতে শুরু করেন। তার হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে—সবকিছুর অভ্যন্তরীণ নকশা তিনিই করতেন। সব জায়গায় তিনি অনুসরণ করতেন পরিচ্ছন্নতা ও মিনিমালিজম। আরমানি ছাতার নীচে তার ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে— জর্জিও আরমানি, এম্পোরিও আরমানি, আরমানি জিন্স, আরমানি এক্সচেঞ্জ, আরমানি জুনিয়র, আরমানি হোটেল ও অন্যান্য।

চিকন মডেলদের নিষিদ্ধ করেন

২০০৬ সালে আরমানি প্রথম ডিজাইনার হিসেবে জিরো-সাইজ মডেলদের তার ফ্যাশন শোতে নিষিদ্ধ করেন। তিনি স্বাস্থ্যকর শারীরিক গড়নের পক্ষে ছিলেন এবং ১৮-এর নিচে বিএমআই-র মডেলদের ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এর পেছনে কারণ ছিল ২২ বছর বয়সী উরুগুয়ের মডেল লুইসেল রামোসের মৃত্যু, যিনি অনাহারে থেকে মারা যান।

প্রথম লাইভস্ট্রিম ফ্যাশন শো

আরমানি ছিলেন সত্যিকারের উদ্ভাবক। ২০০৭ সালে তিনি প্রথমবার তার সংগ্রহ অনলাইনে সরাসরি সম্প্রচার করেন। তখন অনেকেই এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ বলেছিল, কারণ নকশা নকল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু আরমানি ভয় না পেয়ে গ্রহণ করেন এবং নিজেকে আলাদা করে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যান। আজ যেখানে লাইভস্ট্রিম স্বাভাবিক, তখন তার এই সিদ্ধান্ত ছিল সাহসী এক পদক্ষেপ।

স্পোর্টস এন্থুসিয়াস্ট

জর্জিও আরমানি ছিলেন স্পোর্টস এন্থুসিয়াস্ট। তিনি ইন্টার মিলানের ভক্ত এবং অলিম্পিয়া মিলানো বাস্কেটবল দলের বোর্ডের সদস্য। ২০০৬ সালে অলিম্পিকে ইতালির পতাকাবাহকের ইউনিফর্ম ডিজাইন থেকে শুরু করে ফেরারি ফর্মুলা ওয়ান টিমের অফিসিয়াল টিম ওয়্যার—সবই ছিল তার ডিজাইন। এছাড়াও তিনি ইংল্যান্ডের চেলসি ফুটবল ক্লাব এবং অস্ট্রেলিয়ার র‍্যাবিটোসসহ বিভিন্ন পেশাদার ক্রীড়া দলের জন্যও ইউনিফর্ম ডিজাইন করেছেন।

প্রচ্ছদ শিল্পী

তিনি শুধু পোশাকই ডিজাইন করেননি তিনি ইতালির পোপের সুসমাচারের বইয়ের প্রচ্ছদও ডিজাইন করেছেন।

বিশ্বের ধনীতম এলজিবিটিকিউ ব্যক্তিত্ব

ব্যক্তিগত জীবনকে আড়ালে রাখতে পছন্দ করতেন আরমানি। তবে ২০০০ সালে ‘ভ্যানিটি ফেয়ার’–কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি তার যৌনতা নিয়ে খুব সংক্ষিপ্ত কিন্তু স্পষ্ট মন্তব্য করেছিলেন— “আমার জীবনে নারী ছিল। আর কখনো কখনো পুরুষও”। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই এলজিবিটিকিউআই+ সম্প্রদায়ের একজন অংশ হিসেবে সমাদৃত হয়ে আসছেন। মৃত্যুকালে তাঁর সাম্রাজ্যের মূল্য ছিল ৮.৬ বিলিয়ন ইউরো, এবং তিনি ছিলেন বিশ্বের ধনীতম এলজিবিটিকিউআইএ+ ব্যক্তিত্ব।

জর্জিও আরমানির উত্তরাধিকার গেঁথে আছে ফ্যাশন, সিনেমা ও সংস্কৃতির প্রতিটি স্তরে। তার আভিজাত্য চিরকাল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।