ডা. ইশতিয়াক মোশাররফ
সাধারণত প্রস্রাবের সঙ্গে রক্তের প্রোটিন, বিশেষ করে অ্যালবুমিন নিঃসরণ হয় না। কিন্তু নেফ্রোটিক সিনড্রোম নামক কিডনি রোগের কারণে প্রস্রাবের সঙ্গে অত্যধিক পরিমাণে প্রোটিন বেরিয়ে যায় এবং রক্তে অ্যালবুমিনের মাত্রা অনেক কমে যায়। ধীরে ধীরে শরীরে পানি জমতে শুরু করে এবং শরীর ফুলে যায়। এছাড়া রক্তে চর্বির মাত্রাও অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যেতে পারে। যেকোনো বয়সী মানুষ নেফ্রোটিক সিনড্রোমে আক্রান্ত হতে পারে, তবে দুই-পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার বেশি দেখা যায়। সঠিক সময়ে যথাযথ চিকিৎসা নেয়া হলে এ রোগ থেকে সম্পূর্ণ আরোগ্যলাভ করা সম্ভব।
নেফ্রোটিক সিনড্রোম কী?
কিডনির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো গ্লোমেরুলাস। এটি নেফ্রনের মধ্যে অবস্থিত ছোট ছোট রক্তনালির (ক্যাপিলারি) জালিকা, যা রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত তরল ছেঁকে শরীর থেকে বের করে দেয়। রক্ত যখন গ্লোমেরুলাসে প্রবেশ করে, তখন পানি, লবণ, গ্লুকোজ, ইউরিয়াসহ অন্যান্য ছোট অণু ক্যাপিলারির প্রাচীর পেরিয়ে টিউবিউল অংশে পৌঁছে। পরবর্তী সময়ে টিউবিউল থেকে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পানি, খনিজ ও পুষ্টি উপাদান আবার রক্তে ফিরে আসে। বাকি অতিরিক্ত পানি ও বর্জ্য পদার্থ প্রস্রাবের সঙ্গে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। তবে প্রোটিন ও লোহিত রক্তকণিকার মতো বড় অণুগুলো গ্লোমেরুলাস থেকে ছেঁকে বের হতে পারে না। কোনো কারণে গ্লোমেরুলাস ক্ষতিগ্রস্ত হলে এ ছাঁকন প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হয়। ফলে গ্লোমেরুলাস প্রোটিনকে আর রক্তে ধরে রাখতে পারে না। তখন প্রোটিনও প্রস্রাবের সঙ্গে বের হয়ে যায়। এতে শরীরে প্রোটিন ঘাটতি শুরু হয়। এ অবস্থাকেই নেফ্রোটিক সিনড্রোম বলে।
লক্ষণ ও উপসর্গ
নেফ্রোটিক সিনড্রোমের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে
শরীর ফুলে যাওয়া
প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং প্রস্রাবের সঙ্গে ৩ গ্রাম বা এর অধিক পরিমাণে প্রোটিন নিঃসরণ হওয়া
খাবারে অরুচি
অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা
শরীরে পানি জমার কারণে ওজন বৃদ্ধি পাওয়া
রক্তে চর্বি বা কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যাওয়া
উচ্চ রক্তচাপ
নেফ্রোটিক সিনড্রোমের চিকিৎসা
সাধারণত রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা ও রোগের তীব্রতাভেদে নেফ্রোটিক সিনড্রোমের চিকিৎসা করা হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এ রোগের চিকিৎসায় স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ অত্যন্ত কার্যকর। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মাত্রায় স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেয়া হয়, যা কিডনির প্রদাহ হ্রাস করে এবং প্রস্রাবে প্রোটিনের পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে। প্রাপ্তবয়স্কদের স্টেরয়েড ওষুধের পাশাপাশি ইমিউনো সাপ্রেসিভ ওষুধ গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে। এছাড়া রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এসিই ইনহিবিটর বা এআরবি জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা হয়, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং প্রস্রাবে অতিরিক্ত প্রোটিন নিঃসরণের পরিমাণ কমায়। শরীরে অতিরিক্ত পানি ও ফোলা ভাব কমাতে ডাইরেটিকস বা প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়ানোর ওষুধ দেয়া হয়। অনেক সময় এ রোগে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যায়, সেক্ষেত্রে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ গ্রহণ করতে হতে পারে। এসব চিকিৎসার পাশাপাশি নিয়মিত রক্ত, প্রস্রাব, রক্তচাপ ও ওজন পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেয়া, লবণ কম খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন নেফ্রোটিক সিনড্রোম প্রতিরোধে এবং নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক।
লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস, এমডি (নেফ্রোলজি)
কনসালট্যান্ট, নেফ্রোলজিস্ট, ল্যাবএইড লি. (ডায়াগনস্টিকস), কলাবাগান









