মুখের হাসি শুধু আত্মবিশ্বাসের প্রতীক নয়, এটি আমাদের স্বাস্থ্য ও পরিচর্যার প্রতিফলন। কিন্তু ডায়াবেটিসের মতো নীরব ঘাতক সেই হাসিকে নিঃশব্দে মুছে দিতে পারে যদি আমরা মুখ ও দাঁতের যত্নে অবহেলা করি। সুস্থ দাঁত মানেই সুস্থ শরীর—আর ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি ৫ জন ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে অন্তত ৩ জন কোনো না কোনো সময় দাঁতের বা মাড়ির সমস্যায় ভোগেন। এর অন্যতম কারণ হলো—সঠিকভাবে দাঁতের যত্ন না নেওয়া। ডায়াবেটিসে দাঁতের যত্ন কেবল সৌন্দর্য রক্ষার বিষয় নয়, এটি রোগ নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবেও বিবেচিত হওয়া উচিত।

ডায়াবেটিস রোগীর দাঁত ও মাড়ির বেশি সমস্যা হওয়ার কারণসমূহ

মুখ শুকিয়ে যাওয়া (Dry Mouth / Xerostomia) : ডায়াবেটিসের কারণে লালাগ্রন্থির কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। মুখে লালা না থাকলে খাদ্যের টুকরো ও ব্যাকটেরিয়া সহজে জমে যায়। লালা দাঁতকে অ্যাসিড থেকে রক্ষা করে, এটি কমে গেলে দাঁতের ক্ষয় শুরু হয়।

উচ্চ রক্তে শর্করার মাত্রা (High Blood Sugar) : রক্তে সুগার বেশি থাকলে লালার মধ্যেও গ্লুকোজ বেড়ে যায়। এটি মুখে ব্যাকটেরিয়ার জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। ব্যাকটেরিয়া এই গ্লুকোজকে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে অ্যাসিড তৈরি করে, যা দাঁতের এনামেল নষ্ট করে।

গাম ডিজিজ (মাড়ির রোগ) : ডায়াবেটিস রোগীরা প্রায়ই জিনজিভাইটিস বা পেরিওডোন্টাইটিসে ভোগেন। মাড়ির রোগে দাঁতের গোড়া দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে দাঁতের সংরক্ষণশক্তি কমে যায়। দাঁতের চারপাশে ইনফেকশন হলে ক্ষয় আরও দ্রুত হয়।

ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হওয়া : ডায়াবেটিস রোগীদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। ফলে মুখের যে কোনো ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাস সহজেই দাঁতের টিস্যু আক্রান্ত করতে পারে। ইনফেকশন হলে ক্ষয় ও দাঁতের ভাঙন দ্রুত হয়।

খাদ্যাভ্যাস ও ওষুধের প্রভাব : অনেক ডায়াবেটিস রোগী চিনি-মুক্ত কিন্তু অ্যাসিডিক খাবার বা পানীয় গ্রহণ করেন, যেগুলো দাঁতের এনামেল নষ্ট করে। কিছু ডায়াবেটিসের ওষুধ মুখ শুকিয়ে যাওয়ার কারণ হয়, যা ক্ষয় বাড়ায়।

কেন দাঁতের যত্ন জরুরি

  • উচ্চ রক্তে শর্করা দাঁতের আশেপাশের কোষে ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়ায়।
  • গাম ডিজিজ বা মাড়ির রোগের সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।
  • মুখ শুকিয়ে যাওয়া (Xerostomia) – যার ফলে দাঁতের ক্ষয় ও দুর্গন্ধ বাড়ে।
  • ফাঙ্গাল ইনফেকশন (যেমন: থ্রাশ) হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়।
  • দাঁতের চিকিৎসা করলে সেরে উঠতে সময় বেশি লাগে।

প্রতিদিনের দাঁতের যত্ন কিভাবে নিবেন

দাঁত ব্রাশ করা : দিনে দুইবার—সকালে ও ঘুমানোর আগে ব্রাশ করুন। নরম ব্রিসেলযুক্ত টুথব্রাশ ব্যবহার করুন যাতে মাড়িতে আঘাত না লাগে। ফ্লুরাইডযুক্ত পেস্ট ব্যবহার করুন, যা দাঁতকে ক্ষয় থেকে রক্ষা করে। দুই মিনিট সময় নিয়ে ধীরে ধীরে সবদিকে ব্রাশ করুন। ইচ্ছা করলে ইলেকট্রিক ব্রাশ ব্যবহার করতে পারেন—এটি বেশি কার্যকর।

ফ্লস ব্যবহার : প্রতিদিন একবার ডেন্টাল ফ্লস দিয়ে দাঁতের মাঝখানের ময়লা পরিষ্কার করুন। ফ্লস করতে কষ্ট হলে ইন্টারডেন্টাল ব্রাশ বা ওয়াটার ফ্লসার ব্যবহার করতে পারেন।

মাউথওয়াশ ব্যবহার : দিনে একবার অ্যালকোহল-ফ্রি অ্যান্টিসেপটিক মাউথওয়াশ ব্যবহার করুন। মুখ শুকিয়ে গেলে অ্যালকোহলযুক্ত মাউথওয়াশ এড়িয়ে চলুন।

মুখ শুকিয়ে যাওয়া : দিনে প্রচুর পানি পান করুন। চিনি-মুক্ত চুইংগাম বা লজেন্স খেলে লালা উৎপাদন বাড়ে। তামাকজাত দ্রব্য, অ্যালকোহল ও ক্যাফেইন এড়িয়ে চলুন। প্রয়োজনে সালিভা রিপ্লেসমেন্ট জেল বা স্প্রে ব্যবহার করুন।

শর্করার নিয়ন্ত্রণ : সুগার নিয়ন্ত্রণে থাকলে দাঁতের ইনফেকশন, মাড়ির রোগ এবং অন্যান্য জটিলতা অনেকটাই কমে যায়। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ ও ব্যায়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নিয়মিত চেকআপ : প্রতি ৬ মাসে একবার ডেন্টাল চেকআপ করান। ডেন্টিস্টকে জানান যে আপনি ডায়াবেটিস রোগী। স্কেলিং বা দাঁতের পেশাদার পরিষ্কার করানো ভালো। এছাড়া মাড়ি ফুলে যাওয়া, রক্তপাত, দাঁত নড়বড়ে হয়ে যাওয়া, দুর্গন্ধযুক্ত নিঃশ্বাস বা মুখে ব্যথা হলে দেরি না করে ডেন্টাল চিকিৎসা নিন।

ডা. শামীম রেজা মণ্ডল

বি.ডি.এস ডি.ডি.এস – ডেন্টাল সার্জারি (বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় – সাবেক পিজি হাসপাতাল)

সিনিয়র লেকচারার, পাইওনিয়ার ডেন্টাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল, ঢাকা।