এপিলেপসি বা মৃগী রোগের সঙ্গে আমরা সবাই কম-বেশি পরিচিত। গ্রামাঞ্চলে কারো এ রোগ হলে অনেকেই ধারণা করেন তাকে জিন-ভূতে ধরেছে। রোগীকে কবিরাজের কাছে নিয়ে ঝাড়ফুঁক, তাবিজ-কবজসহ নানা অপচিকিৎসা করানো হয়, যা ঠিক নয়। মৃগী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে অনেক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তাই এ রোগ নিয়ন্ত্রণে যেকোনো ভ্রান্ত ধারণা থেকে বের হয়ে সঠিক চিকিৎসা ও পরিবারের সদস্যদের সচেতনতা অতি জরুরি।
মৃগী রোগ কী?
স্নায়ুতন্ত্রের জটিলতাজনিত একটি রোগ মৃগী। আমাদের মস্তিষ্ক বা স্নায়ুকোষে কিছু নিউরোট্রান্সমিটার বা রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে। এ রাসায়নিক পদার্থ এক স্নায়ুকোষের সঙ্গে অন্য স্নায়ুকোষের যোগাযোগ রক্ষা করে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা স্বাভাবিক রাখে। কোনো কারণে এ রাসায়নিক পদার্থের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেলে স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ বিঘ্নিত হয়। তখন মস্তিষ্কের কার্যক্রম অতিরিক্ত বেড়ে সুস্থ-স্বাভাবিক একজন ব্যক্তির শরীরে হঠাৎ কাঁপুনি বা খিঁচুনিসহ নানা অস্বাভাবিক লক্ষণ প্রকাশ পায়। একে মৃগী রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
কেন হয়?
শতকরা ৩০-৪০ ভাগ ক্ষেত্রে মৃগী রোগের কারণ বংশগত। বাবা-মা এ রোগে ভুগে থাকলে কিংবা মৃগী রোগের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে এতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি দ্বিগুণ বেড়ে যায়। এছাড়া জন্মের সময় বা জন্মের আগে-পরে মস্তিষ্কে কোনো আঘাত পেলে বা মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাব হলে এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অতিরিক্ত জ্বর, অপুষ্টি, মস্তিষ্কে প্রদাহ, মস্তিষ্কে টিউমার, স্ট্রোক বা মস্তিষ্কের অন্য কোনো সংক্রামক রোগ যেমন মেনিনজাইটিস, এনসেফালাইটিস, আলঝেইমার প্রভৃতি কারণেও মৃগী রোগ হতে পারে।

লক্ষণ ও উপসর্গ
মৃগী রোগের ক্ষেত্রে এক বা একাধিক যেসব উপসর্গ দেখা দিতে পারে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা
হঠাৎ হাত থেকে কিছু ছিটকে পড়া
কিছু সময়ের জন্য মনোযোগ হারিয়ে ফেলা
শরীরের কোনো অংশ ঝিমঝিম বা অবশ অনুভূত হওয়া
হঠাৎ করেই বিশেষ ধরনের গন্ধ বা স্বাদ অনুভব করা
অস্বাভাবিক আচরণ বা পাগলামি করা
শরীর শক্ত হয়ে যাওয়া
শরীর কাঁপুনি দিয়ে পড়ে যাওয়া
অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
জিহ্বা ও দাঁতে কামড় লাগা
খিঁচুনি ও খিঁচুনির সময় কখনো কখনো প্রস্রাব-পায়খানা হওয়া
মুখ দিয়ে ফেনা বের হওয়া
উপরোল্লিখিত যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে তাৎক্ষণিক করণীয় হিসেবে মৃগী রোগীকে মেঝেতে শুইয়ে দিতে হবে এবং মাথার নিচে নরম কাপড় ভাঁজ করে দিতে হবে। রোগীকে এক পাশ করে শোয়াতে হবে, যাতে লালা বা থুতু মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। পুরোপুরি সচেতন না হওয়া পর্যন্ত রোগীর মুখে পানি দেয়া যাবে না। রোগী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হবে।
মৃগী রোগের চিকিৎসা
মৃগী রোগে আক্রান্ত বেশির ভাগ রোগী সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। এজন্য এ রোগের যেকোনো উপসর্গ দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করা জরুরি।
সাধারণত মৃগী রোগের লক্ষণ ও তীব্রতাভেদে রোগীকে অ্যান্টিএপিলেপটিক ওষুধ যেমন ভালপ্রোয়েট, ইথোসুক্সিমাইড, ক্লোনাজিপাম, কার্বামাজেপাইন ও প্রিমিডোন সেবনের পরামর্শ দেয়া হয়। শতকরা ৭০ ভাগ ক্ষেত্রে এ অ্যান্টিএপিলেপটিক ওষুধগুলোর মাধ্যমেই মৃগী রোগের উপসর্গ বা খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কারণ এগুলো মস্তিষ্ক থেকে নিঃসৃত হওয়া রাসায়নিক পদার্থের পরিমাণে ভারসাম্য এনে স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকলাপ স্বাভাবিক রাখে। চিকিৎসার প্রাথমিক পর্যায়ে ওষুধের মাত্রা কম রাখা হয় এবং ধীরে ধীরে তা বাড়ানো হয় যতদিন না খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণে আসে। একপর্যায়ে রোগী ওষুধ ছাড়াই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। ওষুধের মাধ্যমে রোগ নিয়ন্ত্রণে না এলে বা কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। এছাড়া ভ্যাগাস নার্ভ স্টিমুলেশন (ভিএনএস), রেসপনসিভ নার্ভ স্টিমুলেশন (আরএনএস) ও কিটো ডায়েট (শর্করাযুক্ত খাবার কম ও চর্বিযুক্ত খাবার বেশি খাওয়া) এর মাধ্যমেও মৃগীরোগের চিকিৎসা করা হয়।
মৃগী রোগীর করণীয়
মৃগী নিয়ন্ত্রণে মৃগী রোগীর কিছু সচেতনতা অবলম্বন আবশ্যক। যেমন:
- কোন কাজগুলো করলে বা ঠিক কী কী কারণে মৃগী রোগের উপসর্গ শুরু হয় এবং উপসর্গগুলো কতক্ষণ স্থায়ী হয় তা ভালোভাবে জেনে রাখুন এবং কারণগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন।
- গোসল করা, সাঁতার কাটা, রান্না করা, গাড়ি চালানো প্রভৃতি কাজের সময় খিঁচুনি শুরু হলে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। তাই এসব কাজের সময় পাশে কাউকে রাখুন।
- নিয়মিত ওষুধ সেবন করুন। চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত ওষুধ বন্ধ করবেন না।
- সময়মতো খাওয়া-দাওয়া করুন।
- পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
- ধূমপান ও মদ্যপান করবেন না।
- মানসিক চাপমুক্ত থাকুন।
লেখক: কনসালট্যান্ট, নিউরোলজি বিভাগ, ল্যাবএইড লিমিটেড (ডায়াগনস্টিকস)










