ক্যান্সারের ওষুধের চাহিদা দেশের ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কি তৈরি করতে সক্ষম?

চাহিদার ৯৮ শতাংশ আমাদের দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো প্রস্তুত করতে সক্ষম। আমরা ছাড়াও প্রায় ১৮টি প্রতিষ্ঠান ক্যান্সারের ওষুধ উৎপাদন করছে এবং প্রতিটি কোম্পানির যথেষ্ট সক্ষমতা আছে। দেশের কোথাও ক্যান্সারের ওষুধের অপ্রতুলতা আছে বলে আমার জানা নেই।

স্তন ক্যান্সারের নতুন কোনো ওষুধ তৈরির পরিকল্পনা আছে কিনা বা তার সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে কিনা?

ক্যান্সার খুবই সেনসিটিভ ইস্যু। এর ধরন প্রতিনিয়ত বদলায়। যেমন আগে স্তন ক্যান্সারের যে চিকিৎসা পদ্ধতি ছিল। তা এখন বদলাচ্ছে। আরো ইফেক্টিভ এবং আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি আছে। আমরা চেষ্টা করি, আমাদের রোগীরা যেন সর্বোত্তম চিকিৎসা পদ্ধতিটি ব্যবহার করতে পারেন। দেশে স্তন ক্যান্সারের রোগীর সংখ্যা অনেক। তবে সবাই তো দেশের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করানোর সক্ষমতা রাখেন না। তাই আমরা চাই দেশের মানুষের সক্ষমতা অনুযায়ী ওষুধ তৈরি করতে। অত্যাধুনিক যে ওষুধগুলো রয়েছে সেগুলো তৈরির চেষ্টা করছি। সেসব নিয়ে আমাদের গবেষণাকাজও চলমান রয়েছে। এছাড়া আমাদের কোম্পানির যে স্তন ক্যান্সারের কেমোথেরাপিগুলো রয়েছে তা সাশ্রয়ী ও কার্যকর। আমরা এটি নিয়ে ইতিবাচক সাড়া পাই।

দেশে বাজারজাত করা ওষুধ এবং রফতানি করা ওষুধে গুণগত মানে কোনো তারতম্য আছে কিনা?

আমাদের দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো সিজিএমপির (কারেন্ট গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস) মধ্য দিয়ে চলে। তাই দুই দেশের জন্য দুই রকমের ওষুধের কোয়ালিটি নির্ধারণ করার কোনো সুযোগ নেই। চাহিদা অনুযায়ী প্যাকেজিং বা ভাষা পরিবর্তন করি। এর সঙ্গে ওষুধের কার্যকারিতার কোনো সম্পর্ক নেই।

ওষুধের দাম নিয়ে দেশে রোগীদের নানা মত আছে। দেশে ক্যান্সারের ওষুধের দাম নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

আমাদের দেশের মানুষের আয় এখনো অনেক কম। সেই হিসাবে ক্যান্সার চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল। অনেকে বলেন ভারতে ওষুধের দাম কম। বাংলাদেশে ক্যান্সারের জন্য যুগান্তকারী যেসব ওষুধের উদ্ভাবন করা হয়েছে, যেমন ইমিউনোথেরাপি, অ্যান্টিবডি—এসব ওষুধের দাম ভারত থেকেও আমাদের দেশে কম। এছাড়া সিঙ্গাপুর-থাইল্যান্ডের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে আমাদের দেশের ওষুধের দাম আরো কম। সেই দিক থেকে চিন্তা করলে আমরা বলতে পারি আমাদের দেশের ওষুধের দাম কম। তবে সার্বিক দিক চিন্তা করলে ওষুধের দামসহ ক্যান্সারের চিকিৎসা আমাদের দেশে এখনো ব্যয়বহুল।

ক্যান্সারের ওষুধ এখনো ব্যয়বহুল দেশের নিম্নবিত্ত জনগণের জন্য। ওষুধের দাম কমাতে সরকার থেকে কোনো সহযোগিতা প্রয়োজন কিনা?

সরকার এখানে সহায়তা দিয়েছে। আমাদের এটি কর মওকুফ করে দিয়েছে। কাঁচামাল আমদানিতেও সরকার ভ্যাট মওকুফ করেছে। সরকারকে এখন যেটা করতে হবে তা হলো – আধুনিক গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা। ওষুধ শিল্পের অগ্রগতিতে আমাদের যেটি দরকার তা হলো আমাদের গবেষণা ও উন্নয়নে সরকারের মনোযোগ। গবেষণা ও উন্নয়ন যদি আমরা না করি তাহলে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে আমরা তাল মিলিয়ে চলতে পারব না। স্বাস্থ্যসেবাকে উন্নত করতে পারব না। আমি এখন চীনের একটি ব্যবস্থার উদাহরণ দিতে পারি। সেখানে সরকার নিজ উদ্যোগে ন্যাশনাল রিসার্চ ল্যাব করে দেয়। সেই রিসার্চ ল্যাবে বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি তাদের প্রয়োজনীয় আধুনিকতম গবেষণাগুলো করে। প্রয়োজনীয় ওষুধ উদ্ভাবন করে এবং এ ল্যাবের মধ্য দিয়ে উৎপাদন করতে সক্ষম হয়। এটির মাধ্যমে তাদের বিশাল জনগোষ্ঠীর উন্নতমানের আধুনিক সেবা নিশ্চিত করতে পারে। আমাদের এখানে এই মডেল যদি আমরা মাথায় আনি তাহলে আমাদের ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি অবশ্যই অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে।

ক্যান্সারের ওষুধ উৎপাদনে দেশে প্রচলিত আইন ও নীতি কতটা সহায়ক? এক্ষেত্রে আপনাদের কোনো পর্যবেক্ষণ বা প্রত্যাশা আছে কি?

আমাদের দেশে বা পৃথিবীতে নতুন নতুন রোগ আসছে। নতুন নতুন রোগের সঙ্গে নতুন নতুন চিকিৎসা পদ্ধতিও আবিষ্কৃত হচ্ছে। আমাদের এখানে প্রচলিত আইনে, আধুনিকতর চিকিৎসা ব্যবস্থা সীমিত আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী করা এবং তাদের সহজে সেবা দিতে কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে। যেমন আমাদের এখানে আমরা ওরকমভাবে অবকাঠামো উন্নত করতে পারিনি। আমাদের দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। অথচ আমরা উন্নয়নশীল দেশের মতো করে এত রেগুলেশন করে রেখেছি, যেটা আমরা আসলে মানতে পারছি না। যার কারণে উন্নত বিশ্বের যে চিকিৎসাপদ্ধতি রয়েছে সেগুলো আনতে পারছি না। যেমন বায়োসেমিলার, ইমিউনোথেরাপি, কর্টিসেল থেরাপি—এ চিকিৎসাগুলো অন্য দেশের মানুষ ব্যবহার করছে ক্যান্সারসহ মারণব্যাধি বিভিন্ন অসুখ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। এদিক থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে পড়ছি। আমাদের এখানে যে নীতিমালা আছে তা অনেক বেশি সহজীকরণ দরকার। এটি দুটি কারণে দরকার। মূলত ট্রিপস-এগ্রিমেন্ট যখন বন্ধ হয়ে যাবে; সেই প্রতিবন্ধকতাকে মোকাবেলা করার জন্য আগামী ১০ বছরে যে ড্রাগ প্রয়োজন সেগুলো এখনই রেজিস্ট্রেশন করা দরকার। না হলে আমাদের দেশের মানুষ বিরাট স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ব।

এ শিল্পের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে বলে আপনার মনে হয়?

সবশেষে আমরা বলতে চাই, ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি হিসেবে আমরা ব্যাপকভাবে অগ্রসর হচ্ছি। দেশে এ ইন্ডাস্ট্রিতেই প্রতিটি সেক্টরে দক্ষ জনবল কাজ করে। আমি খুবই আশাবাদী যে সরকার যদি এ শিল্পকে সহযোগিতা করে তাহলে এ খাত ভবিষ্যতে গার্মেন্ট শিল্পের মতোই উন্নতি করবে।

এস এম মাহমুদুল হক পল্লব

এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট

অনকোলজি বিভাগ, বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড