বয়স মাত্র কয়েক বছর অথচ চুল নেই, ত্বক কুঁচকে গেছে, শরীরের ওজন সামান্য। জন্মের সময় একেবারে স্বাভাবিক থাকলেও খুব দ্রুতই শরীরে প্রকট হয়ে উঠছে বার্ধক্য। যেন পা সিনেমায় দেখা সংগ্রামী শিশুটি, যার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন অমিতাভ বচ্চন।
অল্প বয়সেই বুড়িয়ে যাওয়া বিরল এ জেনেটিক রোগের নাম—প্রোজেরিয়া। চিকিৎসাশাস্ত্রের ভাষায় এর পূর্ণ নাম হাচিনসন গিলফোর্ড সিনড্রম। এর কোনো চিকিৎসাও নেই।
কী এই প্রোজেরিয়া?
প্রোজেরিয়া হলো একটি অতি বিরল জিনগত রোগ। শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ প্রোজেরাস থেকে, যার অর্থ অপ্রাপ্তবয়স্ক বৃদ্ধ। ১৮৮৬ সালে চিকিৎসক ডা. জোনাথন হাচিনসন ও ১৮৯৭ সালে ডা. হ্যাস্টিং গিলফোর্ড এ রোগটি সম্পর্কে ধারণা দেন। তাদের নামানুসারে এই রোগটিকে হাচিনসন-গিলফোর্ড প্রোজেরিয়া সিনড্রোম বলা হয়।

আক্রান্ত শিশুর শরীর অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে বার্ধক্যের দিকে এগোতে থাকে। সাধারণত জন্মের পর প্রথম এক–দুই বছর শিশুর বৃদ্ধি স্বাভাবিক মনে হলেও ধীরে ধীরে রোগের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পৃথিবীতে প্রতি ৪০ থেকে ৮০ লাখ শিশুর মধ্যে একজন এ রোগে আক্রান্ত হয়। সারা বিশ্বে প্রোজেরিয়া আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা প্রায় ৪০০ জন। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কয়েকজন শিশুর শরীরে এ রোগ শনাক্ত হয়েছে।
রোগের কারণ
প্রোজেরিয়া রিসার্চ ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, শরীরের প্রতিটি কোষে থাকে এলএমএনএ নামের একটি জিন। এই জিন থেকে উৎপন্ন হয় লামিন-এ নামের একটি প্রোটিন, যা কোষের নিউক্লিয়াসকে সঠিক আকারে রাখতে সাহায্য করে। প্রোজেরিয়ায় এলএমএনএ-জিনে মিউটেশন ঘটে, ফলে প্রোটিনের গঠনে ত্রুটি দেখা দেয়। এর প্রভাব পড়ে পুরো শরীরে—কোষ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে, আর শরীর বার্ধক্যের দিকে ছুটে যায়।

লক্ষণ ও উপসর্গ
জন্মের সময় স্বাভাবিক মনে হলেও ১-২ বছরের মধ্যে শিশুর শরীরে অস্বাভাবিকত্বগুলো ধরা পড়ে। প্রোজেরিয়ায় আক্রান্ত শিশুরা সাধারণত—
- স্বাভাবিক উচ্চতা ও ওজন ধরে রাখতে পারে না,
- মাথার চুল, ভ্রু ও পাপড়ি পড়ে যায়,
- ত্বক পাতলা ও কুঁচকে যায়,
- হাড় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে,
- হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা দেখা দেয়।
তবে আশ্চর্যের বিষয়, এরা সাধারণত মানসিকভাবে পুরোপুরি স্বাভাবিক থাকে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রেই অত্যন্ত মেধাবী হয়।
জীবনের দৈর্ঘ্য
প্রোজেরিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের গড় আয়ু মাত্র ১৪ থেকে ১৫ বছর। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হৃদ্রোগ বা স্ট্রোকের কারণে তাদের মৃত্যু ঘটে। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে এখন অনেকেই ২০ বছরের বেশি বেঁচে থাকছে।
চিকিৎসা ও গবেষণা
প্রোজেরিয়ার এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নেই। তবে গবেষণায় অগ্রগতি হয়েছে। সম্প্রতি এ রোগের জন্য একটি ওষুধ অনুমোদন পেয়েছে, যা আক্রান্ত শিশুদের জীবনকাল কিছুটা বাড়াতে পারে। পাশাপাশি হরমোন থেরাপি, কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ ও হৃদ্যন্ত্র সুরক্ষার চিকিৎসাও দেওয়া হয়।
বিশ্বজুড়ে প্রোজেরিয়া রিসার্চ ফাউন্ডেশন এই রোগ নিয়ে সচেতনতা ও চিকিৎসা গবেষণায় কাজ করছে। রোগটি খুবই বিরল, তাই অনেক সময় শনাক্ত হতে দেরি হয়। সচেতনতা বাড়ালে শিশুটি দ্রুত চিকিৎসা পেতে পারে, জীবন কিছুটা হলেও দীর্ঘায়িত হতে পারে। সহজ হতে পারে বেঁচে থাকার দিনগুলো।










