এটি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে পরাগরেণুজনিত অ্যালার্জি বা পলেন অ্যালার্জির বিস্তার এবং তীব্রতা বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বায়ুদূষণ এবং পরিবর্তিত পরিবেশগত পরিস্থিতির ফলে বাতাসে পরাগরেণুর পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অ্যালার্জিজনিত রোগ দ্রুত বাড়ছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, উষ্ণতা বাড়ায় উদ্ভিদের জীবনচক্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটছে। আগের তুলনায় অনেক আগে ফুল ফোটা শুরু হচ্ছে এবং সেই সঙ্গে পরাগরেণু নিঃসরণের সময়ও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ফলে বাতাসে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রায় পরাগরেণু উপস্থিত থাকছে, যা মানুষের শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে অ্যালার্জির সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে অ্যালার্জিক রাইনাইটিস, যা সাধারণভাবে হে ফিভার নামে পরিচিত, এখন বিশ্বব্যাপী একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
শুধু সময়ই নয়, পরাগরেণুর ঘনত্বও বাড়ছে। গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় উদ্ভিদ বেশি পরিমাণে পরাগরেণু উৎপন্ন করছে। ফলে অ্যালার্জির উপসর্গ যেমন হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখে চুলকানি এবং শ্বাসকষ্ট আরো বেশি তীব্র হয়ে উঠছে। অনেক ক্ষেত্রে এ অ্যালার্জি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিচ্ছে, যা রোগীদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে বায়ুদূষণ এ সমস্যাকে আরো জটিল করে তুলছে। শহরাঞ্চলে যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্প-কারখানার নির্গমন এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার থেকে উৎপন্ন ক্ষতিকর কণাগুলো পরাগরেণুর সঙ্গে মিশে তার অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে কম পরিমাণ পরাগরেণুও মানুষের শরীরে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দূষিত বায়ু পরাগরেণুর গঠনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে এটিকে আরো আক্রমণাত্মক করে তোলে।
এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাদের আগে থেকেই শ্বাসতন্ত্রজনিত সমস্যা রয়েছে। শহরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, কারণ সেখানে বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি এবং সবুজ পরিবেশ কম। তবে বর্তমানে গ্রামাঞ্চলেও এ সমস্যার বিস্তার ঘটছে, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্ক সংকেত।
বিশেষজ্ঞরা আরো জানান, জলবায়ু পরিবর্তনে বিভিন্ন উদ্ভিদের ভৌগোলিক বিস্তারও পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে নতুন নতুন অঞ্চলে অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী উদ্ভিদ ছড়িয়ে পড়ছে, যা আগে ওই অঞ্চলের মানুষের জন্য অচেনা ছিল। এতে নতুন জনগোষ্ঠী অ্যালার্জির ঝুঁকিতে পড়ছে এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী অ্যালার্জির প্রকোপ যে হারে বাড়ছে, তা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক গবেষণায় আশঙ্কা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে অ্যালার্জিজনিত রোগ মহামারীর আকার ধারণ করতে পারে, যদি এ প্রবণতা অব্যাহত থাকে। দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি এটি মানুষের কর্মক্ষমতা ও জীবনমানকেও প্রভাবিত করছে।
এ প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। পরাগরেণুর মৌসুমে অপ্রয়োজনীয় বাইরে বের হওয়া কমানো, মাস্ক ব্যবহার করা, ঘরের জানালা বন্ধ রাখা এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা—এসব পদক্ষেপ অ্যালার্জির ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতি গ্রহণ এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রা গড়ে তোলার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরাগরেণুজনিত অ্যালার্জির এ সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে এখনই পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ, গবেষণা এবং সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে এ সমস্যার মোকাবেলা করা সম্ভব। সব পর্যায়ে সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এ ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
সব মিলিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পরাগরেণুজনিত অ্যালার্জির বিস্তার একটি নীরব কিন্তু গুরুতর স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এটি আরো বড় আকার ধারণ করতে পারে, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
সূত্র: ন্যাচরাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন










