কিডনি আমাদের শরীরের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যা রক্ত পরিশোধন করে এবং বর্জ্য পদার্থ প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেয়। শরীরের তরল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখতেও এটি সহযোগিতা করে থাকে। কিন্তু কিডনিতে কোনো জটিলতা সৃষ্টি হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো শরীরে। এমনকি কিডনি বিকল রোগীকে বাঁচিয়ে রাখতে নিয়মিত ডায়ালাইসিসেরও প্রয়োজন হয়। এই ঘাতক ব্যাধি কিডনি রোগ থেকে বাঁচতে তাই রোগ প্রতিরোধ করাটাই হবে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। যেকোনো সচেতন মানুষের উচিত কিডনি স্বাস্থ্যের যত্ন নেয়া, কিডনি রোগ সম্পর্কে ধারণা রাখা এবং সঠিক সময়ে সুচিকিৎসা গ্রহণ করা—

অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি

হঠাৎ করে কিডনির কার্যকারিতা অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়াকে অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি বলা হয়। এ অবস্থায় কিডনি ঠিকমতো রক্ত পরিশোধন করতে পারে না, ফলে শরীরে বিষাক্ত পদার্থ ও অতিরিক্ত তরল জমে যায়। চিকিৎসাবিহীন থাকলে এর কারণে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের সৃষ্টি হয় এবং মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দেয়।

লক্ষণ-উপসর্গ

 প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায়

 কিডনিতে তরল জমা হয়। যার ফলে শ্বাসকষ্ট, পা, পায়ের গোড়ালি ও পায়ের পাতা ফুলে যায়

 ক্লান্তি, বিভ্রান্তি ও ঝাপসা অনুভূত হয়

 বমি বমি ভাব হয়

 পেটে ও পাঁজরের নিচের দিকে তীব্র ব্যথা হয়

 শারীরিক দুর্বলতা, অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন ও চুলকানি দেখা দেয়

 ক্ষুধা কম লাগে

 বুকে ব্যথা ও চাপ অনুভূত হয়

 গুরুতর ক্ষেত্রে খিঁচুনিও উঠতে পারে

ধরন

কিডনি ইনজুরি সাধারণত দুই ধরনের। অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি বা সাময়িকভাবে কিডনি বিকল হওয়া এবং ক্রনিক কিডনি ইনজুরি বা দীর্ঘমেয়াদে কিডনি বিকল হওয়া। অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি বেশির ভাগ সময় সঠিক ও সময়মতো চিকিৎসায় ভালো করা সম্ভব।

কারণ

কিডনিতে রক্তের প্রবাহ কমে যাওয়া: এটি এমন অবস্থা যখন কোনো কারণে কিডনিতে রক্তের প্রবাহ কমে যায় এবং কিডনির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এতে অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি দেখা দিতে পারে। বেশকিছু কারণে কিডনিতে রক্তের প্রবাহ কমে যেতে পারে। যেমন—

 শরীরে পানিস্বল্পতা তৈরি হলে

 সেপসিস কিংবা সেপটিক শকের কারণে কিডনিতে সংক্রমণ হলে

 অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন ও ন্যাপ্রোক্সেন-জাতীয় ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

 হৃদরোগ, হার্ট ফেইলিওর ও হার্ট অ্যাটাক

 লিভার সিরোসিস ও লিভার ফেইলিওর

 অ্যানাফিলাক্সিস বা অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়া

ওপরে উল্লেখিত বিষয়গুলোর কারণে কিডনিতে রক্তের প্রবাহ কমে গিয়ে কিডনি ইনজুরি হতে পারে।

কিডনি স্বাস্থ্যের অবনতি: কিছু বিষয় রয়েছে যা কিডনির ব্যাপক ক্ষতি করে এবং এর ধারাবাহিকতায় অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি দেখা দিতে পারে। যেমন:

 কিডনির ছাঁকনি বা গ্লোমেরুলাসের প্রদাহজনিত রোগ বা গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস

 কিডনির অভ্যন্তরীণ এবং আশপাশের শিরা ও ধমনিতে রক্ত জমাট বাঁধা (থ্রম্বোসিস)

 অটো ইমিউন ডিজিজ যেমন—লুপাসের কারণে সৃষ্ট গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস

 কোলেস্টেরল জমে রক্তনালিতে রক্তের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়া

 হিমোলাইটিক ইউরেমিক সিনড্রোম, যেখানে লোহিত রক্তক্ষণিকা খুব দ্রুত ভেঙে যায়।

কিডনিতে প্রস্রাব আটকে থাকা: যখন প্রস্রাব স্বাভাবিকভাবে শরীর থেকে বের হতে পারে না, অর্থাৎ বাধাপ্রাপ্ত হয় সেই অবস্থাকে মূত্রনালির অবরোধ বা ইউরিনারি অবস্ট্রাকশন বলে। এটি অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরির অন্যতম কারণ। নানা কারণে কিডনিতে প্রস্রাব আটকে যাওয়ার এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে। তার মধ্যে রয়েছে—

 কিডনিতে পাথর

 প্রোস্টেট গ্রন্থির অস্বাভাবিক বৃদ্ধি

 মূত্রনালিতে রক্তের জমাট বাঁধা

 বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার যেমন—মূত্রাশয়ের ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সার, প্রোস্টেট ক্যান্সার, জরায়ুমুখ ক্যান্সার

 মূত্রনালির ওপর চাপ সৃষ্টি করা কোনো কিছুর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি

 মূত্রাশয় নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুর কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া

প্রতিরোধে করণীয়

 যারা অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরির ঝুঁকিতে রয়েছেন, তারা নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করিয়ে নিন।

 ঝুঁকিতে থাকা কারো নতুন অসুখ কিংবা তীব্র অসুস্থতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।

 কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে কিডনি রোগের ঝুঁকি আরো বেড়ে যেতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাবেন না।

 প্রস্রাবের ধরনে পরিবর্তন লক্ষ করলে সতর্ক হোন। অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরিতে প্রস্রাবের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়।

 বেঁচে থাকার জন্য কিডনি আমাদের শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। কিডনিতে যেকোনো জটিলতা দেখা দিলে অবহেলা কিংবা কালক্ষেপণ করলে মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তাই জটিলতা দেখা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন কিডনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে সুচিকিৎসা গ্রহণ করুন।

লেখক: কিডনি বিশেষজ্ঞ

কনসালট্যান্ট, নেফ্রোলজিস্ট

ল্যাবএইড লি. (ডায়াগনস্টিকস), কলাবাগান