বিভিন্ন কারণে লিভারে দীর্ঘদিন ধরে প্রদাহ সৃষ্টি হলে লিভারের কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লিভারের পুনর্গঠনক্ষমতা থাকার কারণে নতুন কোষ তৈরি হলেও একই সঙ্গে ফাইব্রাস টিস্যুও তৈরি হতে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে এ প্রক্রিয়া চলতে থাকলে লিভারে ফাইবারের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং লিভারের স্বাভাবিক গঠন পরিবর্তিত হয়ে যায়। তখন লিভার শক্ত হয়ে যায় এবং এর ভেতরের রক্তচাপও বেড়ে যায়। এর ফলে ধীরে ধীরে লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা কমতে থাকে এবং একসময় বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়। লিভারের এ অবস্থাকেই লিভার সিরোসিস বলা হয়।

আমাদের দেশে মোট কত মানুষ লিভার রোগে আক্রান্ত, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো জাতীয় গবেষণা এখনো নেই। তবে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিভার বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, সেখানে ভর্তি হওয়া রোগীদের প্রায় ৭০ শতাংশই লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত।

বাংলাদেশে লিভার সিরোসিসের প্রধান কারণ হলো ক্রনিক হেপাটাইটিস ‘‌বি’। এর পরেই রয়েছে ক্রনিক হেপাটাইটিস ‘‌সি’। বর্তমানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ফ্যাটি লিভার ডিজিজ। অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং সেডেন্টারি বা কম শারীরিক পরিশ্রমের জীবনযাপনের কারণে ফ্যাটি লিভারের প্রকোপ দিন দিন বাড়ছে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের দেশের প্রায় ৩৪ শতাংশ মানুষের ফ্যাটি লিভার রয়েছে, অর্থাৎ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী এ সমস্যায় ভুগছে। তবে ফ্যাটি লিভার থাকা সবার ক্ষেত্রেই সিরোসিস হয় না; এর মধ্যে প্রায় ১০-১৫ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে লিভার সিরোসিস তৈরি হতে পারে।

বিশ্বব্যাপী জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে ফ্যাটি লিভারের হার বাড়ছে এবং এর সঙ্গে সঙ্গে লিভার সিরোসিসের সংখ্যাও বাড়ছে।

এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন (যা পাশ্চাত্য দেশগুলোতে বেশি দেখা যায়), অটোইমিউন রোগ যেমন অটোইমিউন হেপাটাইটিস এবং কিছু জেনেটিক কারণেও লিভার সিরোসিস হতে পারে।

লিভার সিরোসিসের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো লক্ষণই দেখা যায় না। লিভারের অনেক ক্রনিক রোগই দীর্ঘ সময় পর্যন্ত নীরবে চলতে থাকে এবং রোগী তেমন কোনো উপসর্গ অনুভব করেন না। তবে কিছু ক্ষেত্রে রোগীরা হালকা দুর্বলতা বা ক্লান্তি অনুভব করতে পারেন।

রোগটি যখন দীর্ঘদিন ধরে ভেতরে ভেতরে চলতে থাকে এবং একসময় লিভারের প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়, তখন বিভিন্ন উপসর্গ প্রকাশ পেতে শুরু করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো পেটে পানি জমা, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় অ্যাসাইটিস বলা হয়। পাশাপাশি পা ফুলে যেতে পারে এবং শরীরে দুর্বলতা ও ক্ষুধামান্দ্য দেখা দিতে পারে।

এছাড়া লিভার সিরোসিসের কারণে পরিপাকতন্ত্রের কিছু রক্তনালি ফুলে যায়। কখনো কখনো এসব রক্তনালি ফেটে রক্তপাত হতে পারে। তখন রোগীর বমির সঙ্গে রক্ত যেতে পারে অথবা কালো পায়খানার মাধ্যমে রক্তপাত প্রকাশ পেতে পারে।

আরো গুরুতর অবস্থায় লিভার সিরোসিস মস্তিষ্ককেও প্রভাবিত করতে পারে। তখন রোগীর মধ্যে বিভ্রান্তি, ভুলে যাওয়ার প্রবণতা, ঘুমের ব্যাঘাত, খিঁচুনি ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অনেক সময় রোগী অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারেন।

অর্থাৎ লিভার সিরোসিস যখন অগ্রসর বা অ্যাডভান্সড পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন এসব বিভিন্ন জটিল উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে।

লিভার সিরোসিস হলে চিকিৎসার মাধ্যমে লিভারকে আগের অবস্থায় পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। তবে সিরোসিসের সঠিক কারণ শনাক্ত করে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু করলে রোগের অগ্রগতি ধীর করা যায় এবং জটিলতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব এবং রোগী ভালো থাকতে পারেন।

যেমন হেপাটাইটিস ‘‌বি’ বা ‘‌সি’র কারণে সিরোসিস হলে দ্রুত অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ শুরু করা হয়। এতে লিভারের ক্ষতি পুরোপুরি সারানো না গেলেও রোগের অবনতি কমে এবং জটিলতার ঝুঁকি হ্রাস পায়। সিরোসিসের কারণে পেটে পানি জমা, পা ফুলে যাওয়া বা রক্তপাতের মতো উপসর্গ দেখা দিলে সেগুলোর চিকিৎসা দেয়া হয়। তবে যখন ওষুধে রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয় না, তখন লিভার ট্রান্সপ্লান্ট একটি কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি।

লিভার সিরোসিস প্রতিরোধ করাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর প্রধান কারণগুলো—হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি এবং ফ্যাটি লিভার—অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। এজন্য প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা করে হেপাটাইটিস বি ও সি আছে কিনা তা জানা এবং দ্রুত চিকিৎসা নেয়া জরুরি। হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধের জন্য ভ্যাকসিন রয়েছে, যা নেয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নিরাপদ রক্ত গ্রহণ এবং জীবাণুমুক্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার নিশ্চিত করলেও হেপাটাইটিস বি ও সি সংক্রমণ অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

এছাড়া নিয়মিত ব্যায়াম করা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি কমানো যায়। এসব বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে পারলে লিভার সিরোসিসের ঝুঁকি অনেক কমানো যায়।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, হেপাটোলজি বিভাগ

লিভার ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ