ডা. ফারজানা পারভীন নূপুর
বসন্ত শেষে বাংলার ঋতুতে আসতে চলেছে গ্রীষ্মকাল। এ সময়ে কিছু অসুখ-বিসুখ আপনার স্বাভাবিক জীবনযাপন বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে। তীব্র তাপপ্রবাহ আর শুষ্ক আবহাওয়ায় শরীরে জীবাণুর আক্রমণ বেড়ে যায়। হঠাৎ সর্দি-জ্বরে ভুগতে হয় অনেকের। পানিস্বল্পতা, রোদে পোড়া ত্বক, ঘামাচি, ফুড পয়জনিংসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত হতে হয়। তীব্র গরমে বছর বছর হিট স্ট্রোকে আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে। তাই গরমের সময় অসুস্থতা থেকে বাঁচতে নিতে হবে বাড়তি সতর্কতা—
সর্দি-জ্বর
অতিরিক্ত গরমে অনেকের সর্দি-জ্বর লেগেই থাকে। আবহাওয়ার হঠাৎ পরিবর্তন, অতিরিক্ত ঘাম এবং বাইরে থেকে ঘরে ফিরে এসেই ফ্রিজের ঠাণ্ডা পানি পান করাসহ নানা কারণে এ সময় সর্দি-জ্বর বেড়ে যায়।
করণীয়
তাড়াতাড়ি সেরে উঠতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি ও জিংকযুক্ত খাবার খেতে পারেন। গরম স্যুপ ও গরম পানিতে লেবুর রস পান করলে এ সময় খুব উপকার পাওয়া যায়।
কোমল পানীয়, অ্যালকোহল বা এনার্জি ড্রিংক পরিহার করুন। পর্যাপ্ত পানি ও ফলের রস পান করুন।
হাঁচি-কাশির সময় নাক-মুখ টিস্যু দিয়ে ঢেকে নিন এবং ব্যবহৃত টিস্যু ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন।
নিজের ইচ্ছেমতো ওষুধের দোকান থেকে সিরাপ বা অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ কিনে খাবেন না। অসুখ-বিসুখ অবহেলা না করে, একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করুন।
ঘামাচি
আমাদের শরীরে ঘাম তৈরি হলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তা ঘর্মগ্রন্থির মাধ্যমে বের হয়ে ত্বকের উপরিভাগে চলে আসে। প্রচণ্ড গরমে অতিরিক্ত ঘাম তৈরি হলে অনেক সময় সেই ঘাম ঘর্মগ্রন্থির ছিদ্রপথ দিয়ে বের হতে পারে না। ফলে ত্বকের নিচের ঘর্মগ্রন্থি ফেটে যায়। এই পরিস্থিতিতে ত্বকে ছোট ছোট র্যাশ দেখা দেয়, যা ঘামাচি নামে পরিচিত। ঘর্মগ্রন্থির সমস্যা থেকে এর উৎপত্তি বলেই এ নামকরণ। শিশুদের ক্ষেত্রে মাথায়, ঘাড়ে, বগলে, শরীরের ওপরের অংশে, রানের ভাঁজে, কনুই ও হাঁটুর ভাঁজে ঘামাচি হতে দেখা যায়। বড়দের বুকে-পিঠে-পেটে ঘামাচি হয়।
ঘামাচি প্রতিরোধে যা মেনে চলতে হবে
সরাসরি রোদের উত্তাপ এড়িয়ে চলুন। প্রয়োজনে ছাতা ব্যবহার করুন।
সুতির পাতলা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরিধান করুন। শরীরে পানিশূন্যতা যেন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন।
আবদ্ধ স্যাঁতসেঁতে ঘরে না থেকে বাতাস চলাচল করে এমন ঘরে ঘুমান।
ঘুমন্ত শিশুকে কিছুক্ষণ পরপর পাশ পরিবর্তন করে দিন।
ঘামাচি প্রতিকারে ক্ষেত্রবিশেষে অ্যান্টিহিস্টামিনজাতীয় ওষুধ সেবনের প্রয়োজন হতে পারে। তবে সব অ্যান্টিহিস্টামিন সবার জন্য নিরাপদ নয়। তাই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিজঅর্ডার
বসন্তের শেষে ও গ্রীষ্মের শুরুতে রোদ, তাপমাত্রা, বাতাসে আর্দ্রতার তারতম্য শুধু শরীর নয়, মনের ওপরও ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ঋতু পরিবর্তনের এ সময়ে এক ধরনের বিষণ্নতা ও হতাশা অনুভূত হতে পারে যাকে সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিজঅর্ডার বলে। সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত হলে দিনের বেশির ভাগ সময় বিষণ্ন বোধ হয়। ক্লান্তি, কোনো কাজে মনোযোগ দিতে না পারা, উদ্বেগ ও বিরক্তি, ঘুম কম হওয়া কিংবা অতিরিক্ত ঘুমানোর মতো লক্ষণ প্রকাশ পায়। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম, পছন্দের কাজগুলো বারবার করার মাধ্যমে বিষণ্নতা কমাতে পারেন। তবে সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিজঅর্ডারের তীব্রতা বেশি হলে একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
হিট স্ট্রোক
প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্র পরিবেশে বেশি সময় থাকলে শরীরের তাপমাত্রা অত্যধিক বেড়ে গিয়ে হতে পারে হিট স্ট্রোক। হিট স্ট্রোকে অনেক সময় বড় ধরনের ক্ষতি হয়, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। যারা দিনের বেলায় ঘরের বাইরে রোদে কাজ করেন, তাদের হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি থাকে। তাপ নিয়ন্ত্রণক্ষমতা কম থাকায় বৃদ্ধ ও শিশুরাও রয়েছে ঝুঁকিতে। তাই গরমের এ সময়টায় সাবধানে থাকতে হবে।
হিট স্ট্রোক প্রতিরোধে করণীয়—
ঢিলেঢালা ও হালকা রঙের পোশাক পরিধান করুন।
রোদে বাইরে যাওয়ার সময় ক্যাপ কিংবা ছাতা ব্যবহার করুন। অহেতুক রোদে ঘোরাঘুরি করবেন না।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন। ভাজা-পোড়া ও অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলুন।
কেউ হিট স্ট্রোক করলে অন্যদের করণীয়—
রোগীকে দ্রুত শীতল স্থানে নিয়ে যান।
শরীর পানিতে ভিজিয়ে দিয়ে বাতাস করুন।
সম্ভব হলে কাঁধে, বগলে ও কুঁচকিতে বরফ দিন।
রোগীর জ্ঞান থাকলে তাকে খাবার স্যালাইন দিন।
যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করুন।
ফুড পয়জনিং বা খাদ্যে বিষক্রিয়া
গরমের সময় ফুড পয়জনিং বেশি হয়। এ সময় খাবার দ্রুত নষ্ট হয়ে তাতে জীবাণু সংক্রমিত হয়। সাধারণত পচা-বাসি, অস্বাস্থ্যকর, জীবাণুযুক্ত খাবার ও পানীয় পান করলে ফুড পয়জনিং বা খাদ্যে বিষক্রিয়া হতে পারে। তবে গরমের দিনে খাবার বেশি তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং সেই পচা-বাসি খাবার খাওয়া ফুড পয়জনিংয়ের অন্যতম কারণ। এর ফলে হজমে সমস্যা, বমি, পাতলা পায়খানা, পেটব্যথা ও অনেক সময় জ্বর হতে পারে। এ সময় কিছু সাবধানতা মেনে চললে খুব সহজে খাদ্যে বিষক্রিয়া এড়ানো যায়।
খাদ্যে বিষক্রিয়া এড়াতে
গরমে নষ্ট হয়ে যাওয়া খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। পথে-ঘাটে তৈরি খাবার না খেয়ে স্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার খেলে ফুড পয়জনিংয়ের আশঙ্কা কমে যায়।
খাওয়ার আগে হাত ও ব্যবহৃত থালাবাসন ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিন।
শাকসবজি, মাছ, মাংস ইত্যাদি রান্না করার আগে ভালোভাবে ধুয়ে নিন।
খাবার ভালোভাবে সিদ্ধ করে রান্না করুন। খাবার সবসময় ঢেকে রাখুন।
বমি, পাতলা পায়খানা এবং অন্যান্য শারীরিক জটিলতার মাত্রা বেশি মনে হলে (যেমন রোগী মুখে না খেতে পারলে) খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বমি হলে দ্রুত হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিন।
লেখক: মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
ল্যাবএইড লি. (ডায়াগনস্টিকস), কলাবাগান, ঢাকা









