বর্তমান সময়ে ঘরে-বাইরে ৩০ পেরোনো প্রায় সব নারীরাই ক্লান্ত। দেহ-মনে অবসাদ, চুল পড়ছে, নখ ভেঙে যাচ্ছে, ঘুম আসছে না, ঘন ঘন অসুস্থ হচ্ছে — আমরা ধরেই নিয়েছি এ ক্লান্তি এখন বাস্তবতা। কিন্তু এ ক্লান্তির পেছনে আসল কারণটা হয়তো মানসিক চাপ কিংবা ‘অতিরিক্ত কাজ’ও নয়। এর পেছনে রয়েছে চিকিৎসাযোগ্য কারণ- লৌহঘাটতি বা আয়রন ডেফিসিয়েন্সি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, যুক্তরাজ্যে প্রজননক্ষম বয়সের প্রতি তিনজন নারীর একজনই এ সমস্যায় ভুগছে।
উপেক্ষিত এক শারীরিক সংকট
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশন পরিচালিত ‘গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ’ গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী নারীদের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার শীর্ষ পাঁচ কারণের একটি হলো লৌহঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা। এনএইচএস জানায়, আয়রনের অভাব রক্তে অক্সিজেন পরিবহনে ঘাটতি তৈরি করে। ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায় না। আর যেহেতু নারীরা মাসিকের মাধ্যমে নিয়মিত রক্তক্ষরণে আয়রন হারান, তাই পুরুষের তুলনায় নারীর প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ আয়রন প্রয়োজন।
এর চিকিৎসা খুব সহজ হওয়া সত্ত্বেও শুধু সচেতনতা ও শনাক্তের অভাব এবং চিকিৎসকের অবহেলায় বহু নারী বছরের পর বছর এ ক্লান্তি নিয়ে বেঁচে আছেন। ম্যানচেস্টারের চিকিৎসক ড. কায়াথ্রি জন বলেন, অনেক চিকিৎসক এখনো আয়রন ঘাটতির ব্যাপ্তি বা লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন নন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীদের বলা হয়—এটা ‘স্বাভাবিক ক্লান্তি’।

লক্ষণ:
ড. কায়াথ্রি জন জানান, লৌহঘাটতি কেবল রক্তস্বল্পতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চুল পড়া, মানসিক ঝাপসাভাব, উদ্বেগ, হৃৎকম্প, বিষণ্ণতা, এমনকি জয়েন্টে ব্যথা-সবই এর উপসর্গ হতে পারে। নারীদের মধ্যে লৌহঘাটতির সবচেয়ে বড় কারণ হলো মাসিকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ।
চিকিৎসা
ক্যামব্রিজের চিকিৎসক ড. অ্যান্ড্রু ক্লাইন জানান, অনেকেই মুখে খাওয়ার আয়রন সহ্য করতে পারেন না। প্রায় প্রতি চারজনের একজনের ক্ষেত্রে মুখে খাওয়া আয়রন ট্যাবলেট অকার্যকর। এ অবস্থায় সরাসরি শিরায় আয়রন ইনজেকশন দেয়া কার্যকর ও দ্রুত ফলদায়ক।
খাদ্যাভ্যাস ও আধুনিক জীবনযাপন
তবে যে কোন সমস্যায় প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ জরুরি। খাদ্যাভাস বা জীবনযাপনের পরিবর্তনে আয়রন ঘাটতি রোধ করা যায়। ব্রিটিশ পুষ্টিবিদ নিকোলা লাডলাম-রেইন জানান, উদ্ভিজ্জ আয়রনের চেয়ে প্রাণিজ আয়রন বেশি উপকারী। যে কোনো ধরণের মাংস, সামুদ্রিক মাছ, ডিম, দুধ ও যকৃত প্রাণিজ আয়রনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। উদ্ভিজ্জ উৎেসের মধ্যে আছে- মসুর যাল, পালং শাক, শিম জাতীয় খাবার। সেইসঙ্গে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া জরুরি।
অতিরিক্ত কফি বা চা পানও আয়রন শোষণে বাধা দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মত, দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি, বা অজানা উদ্বেগে ভুগলে ফেরিটিন টেস্ট করানো উচিত। রিপোর্টে ফেরিটিনের পরিমাণ ৩০ মাইক্রোগ্রামের নিচে হলে চিকিৎসা শুরু করা দরকার, আর ট্যাবলেট সহ্য না হলে ইনফিউশন নিতে হবে।
দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে










