দীর্ঘদিনের অসচেতনতা ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে বিশ্বব্যাপী উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। উচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় নীরব ঘাতক। কারণ প্রাথমিক অবস্থায় রোগটির তেমন কোনো উপসর্গ না থাকলেও ধীরে ধীরে এটি হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকলসহ নানা মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। তাই এ রোগের কারণ ও লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
উচ্চ রক্তচাপ কী?
হৃৎপিণ্ড প্রতিনিয়ত রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে শরীরের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে। এই রক্ত চলাচলের সময় রক্তনালির দেয়ালে যে চাপ পড়ে, সেটিই রক্তচাপ নামে পরিচিত। যখন কোনো কারণে এ চাপ দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে, তখন তাকে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন বলা হয়। রক্তচাপ মিলিমিটার পারদ এককে পরিমাপ করা হয়। কারো রক্তচাপ যদি ১২০/৮০ মিলিমিটার পারদ হয়, তাহলে ওপরের সংখ্যা ১২০ হলো সিস্টোলিক চাপ, যা হৃৎপিণ্ড সংকুচিত অবস্থায় রক্ত পাম্প করার সময় হয় আর নিচের সংখ্যা ৮০ হলো ডায়াস্টোলিক চাপ, যেটি মূলত হৃৎপিণ্ড শিথিল বা প্রসারিত থাকার সময়ের চাপ। রক্তচাপ ৯০/৬০ থেকে ১২০/৮০ মিলিমিটার পারদের মধ্যে থাকলে তাকে স্বাভাবিক রক্তচাপ হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু কারো রক্তচাপ যদি নিয়মিতভাবে ১৪০/৯০ মিলিমিটার পারদ বা তার বেশি হয়, তাহলে তাকে উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাড প্রেশার হিসেবে ধরা হয়।
কারণ
বিভিন্ন কারণে রক্তচাপ বেশি হতে পারে। যেমন—
পরিবারে কারো উচ্চ রক্তচাপ থাকা
চল্লিশোর্ধ্ব বয়স
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম না করা
ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হওয়া
খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত শাকসবজি ও ফলমূল না রাখা
খাবারে অতিরিক্ত লবণ ব্যবহার
অতিরিক্ত চা-কফি ও কোমল পানীয় পানের অভ্যাস
ধূমপান ও মদ্যপান
পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব
অতিরিক্ত মানসিক চাপ
হরমোনজনিত সমস্যা
দীর্ঘদিন স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ সেবন।
লক্ষণ ও উপসর্গ
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উচ্চ রক্তচাপের তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তবে রক্তচাপ অত্যধিক বেড়ে গেলে কিংবা দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে কিছু লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে যেমন—
মাথাব্যথা
বুকে ব্যথা
বমি ভাব বা বমি
দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসা
বুক ধড়ফড় করা বা অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন
ঘাড় ও মাথার পেছনে এক ধরনের চাপ অনুভব করা
অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা
বিভ্রান্তি বা মনোযোগের অভাব
শ্বাসকষ্ট
জটিলতা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় এক কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতার কারণে প্রাণ হারান। এই নীরব ঘাতক একে একে শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে আক্রান্ত করতে পারে। উচ্চ রক্তচাপের কারণে স্ট্রোক হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। স্ট্রোক হলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ঘটে। এতে রোগী পক্ষাঘাতগ্রস্ত হতে পারেন, দৃষ্টিশক্তি হারাতে পারেন, এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। এছাড়া হার্ট অ্যাটাক ও হার্ট ফেইলিউরের অন্যতম কারণ উচ্চ রক্তচাপ। এটি কিডনির কার্যক্ষমতাও ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেয়, যার ফলে কিডনি বিকল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।
প্রতিরোধে করণীয়
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে দৈনন্দিন জীবনযাপনে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনা জরুরি। এজন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলো মেনে চলা প্রয়োজন।
সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খান। খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ফলমূল ও শাকসবজি রাখার চেষ্টা করুন। অতিরিক্ত তেল-মসলা ও চর্বিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলুন।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় রান্না করা খাবার ও অতিরিক্ত কাঁচা লবণ মিলিয়ে লবণের পরিমাণ যেন ছয় গ্রাম বা প্রায় এক চা-চামচের বেশি না হয়, সে বিষয়ে সচেতন থাকুন।
নিয়মিত ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস গড়ে তুলুন।
উচ্চতা অনুযায়ী ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
অতিরিক্ত চা-কফি ও ক্যাফেইনযুক্ত অন্যান্য কোমল পানীয় পান যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন।
ধূমপান ও মদ্যপানের অভ্যাস পরিহার করুন।
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ করুন।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এসিই ইনহিবিটর, অ্যানজিওটেনসিন ২ রিসেপ্টর ব্লকার বা ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকার গ্রুপের ওষুধ সেবন করতে পারেন।
লেখক: হৃদরোগ, বাতজ্বর, বক্ষব্যাধি ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
ল্যাবএইড আইকনিক, কলাবাগান










