গর্ভাবস্থার শুরুতে হালকা বমিভাব বা খাবারে অরুচি খুবই সাধারণ ঘটনা। তবে দিনে দশবারের বেশি বমি হওয়া স্বাভাবিক নয়। এটি বিরল কিন্তু ভয়াবহ গর্ভকালীন রোগ— নাম হাইপারইমেসিস গ্রাভিডারাম (এইচজি)।

এইচজি-কে অনেকে ‘মর্নিং সিকনেস’ ভেবে অবহেলা করেন। তবে এটি সম্পূর্ণ আলাদা একটি অবস্থা। এই রোগে বমি ও বমিভাব এত তীব্র হয় যে গর্ভবতী নারী খাবার বা পানি কিছুই শরীরে রাখতে পারেন না। ফলে দ্রুত পানিশূন্যতা দেখা দেয়, ওজন কমে যায় আর শরীর ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়ে।

এ বিষয়ে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, এইচজি কোনো সাধারণ বমিভাব নয়। এটি এমন এক শারীরিক অসুস্থতা, যেখানে শরীর নিজেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। চিকিৎসা না নিলে মা ও ভ্রূণ—উভয়ের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে।

pregnant_illo_mmuffin-089c

বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০০ জন গর্ভবতী নারীর মধ্যে প্রায় ১ থেকে ৩ জন এই রোগে আক্রান্ত হন। সাধারণত গর্ভাবস্থার পাঁচ থেকে বারো সপ্তাহের মধ্যে এর প্রকোপ দেখা দেয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে—

  • হরমোনের প্রভাব: গর্ভাবস্থায় হিউম্যান কোরিওনিক গোনাডোট্রপিন ও ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়।
  • বংশগত প্রভাব: এটি জিনগত শারীরবৃত্তীয় সমস্যা। তাই পারিবারিক কারো থাকলে ঝুঁকি বাড়ে।
  • মানসিক চাপ ও ঘ্রাণসংবেদনশীলতা: কিছু নারীর ক্ষেত্রে গন্ধ বা মানসিক চাপও ট্রিগার হিসেবে কাজ করে।
    যেসব নারী একবার এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের পরবর্তী গর্ভধারণেও একই সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে।

সমাজের অবহেলা ও ‘সহ্য করার সংস্কৃতি’

এইচজি-এর সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো সামাজিক অবহেলা। পরিবার, আত্মীয় বা এমনকি অনেক চিকিৎসকও একে ‘স্রেফ সকালের বমিভাব’ মর্নি সিকনেস বলে উড়িয়ে দেন। আক্রান্ত গর্ভবতী নারীদের শুনতে হয়—‘সব মায়েরই তো এমন হয়’, ‘মা হতে গেলে কষ্ট পেতেই হয়।’
এ ধরণের কথা কেবল মানসিক কষ্টই বাড়ায় না, বরং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বিলম্বিত করে। এভাবেই গড়ে ওঠে এক ‘যন্ত্রণা সহ্য করার সংস্কৃতি’। যেখানে মাতৃত্বের কষ্টকে স্বাভাবিক ও মহিমান্বিত হিসেবে দেখা হয়, অথচ মায়ের কষ্টকে বোঝার চেষ্টাই করা হয় না।

চিকিৎসা ও সহায়তা

এইচজি-এর চিকিৎসা ধাপে ধাপে করা হয়।

  • প্রথমে হাসপাতালে ভর্তি করে স্যালাইন দেয়া হয়, যাতে পানিশূন্যতা দূর হয়।
  • প্রয়োজনে বমি প্রতিরোধক ওষুধ দেয়া হয়।
  • কেউ খাবার রাখতে না পারলে নল দিয়ে পুষ্টি সরবরাহ করা হয়।
  • মানসিক অবসাদ বা উদ্বেগ থাকলে কাউন্সেলিং ও মানসিক সহায়তা দেয়া জরুরি।
    বিশেষজ্ঞরা বলেন, পরিবারের সমর্থন এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—রোগীকে মানসিকভাবে শক্ত রাখা অনেক সময় ওষুধের মতোই কার্যকর।

অতীতের ভুল ধারণা থেকে সচেতনতার যাত্রা

ঊনবিংশ শতকে এইচজি সম্পর্কে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নানা ভুল ধারণা ছিল। একসময় চিকিৎসায় পারদ, মরফিন এমনকি বিদ্যুৎ শক পর্যন্ত ব্যবহার করা হতো। অনেকে একে ‘হিস্টেরিয়া’ বলে মনে করতেন।
২০১২ সালে ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স উইলিয়ামের স্ত্রী ও প্রিন্সেস অব ওয়েলস ক্যাথরিন, এ রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তখন প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিষয়টি আলোচনায় আসে। সেই থেকে বিশ্বজুড়ে এইচজি নিয়ে সচেতনতা বাড়ে।

2442

২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে লন্ডনের হাসপাতালে হাইপারেমেসিস গ্রাভিডারাম রোগে চিকিৎসা নেয়ার পর হাসপাতাল ত্যাগ করছেন ক্যামব্রিজের ডিউক প্রিন্স উইলিয়াম ও ডাচেস কেট মিডলটন

এইচজি আক্রান্ত নারীরা বলেন, এই অভিজ্ঞতা শরীরের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো এক ভয়াবহ। মা হওয়ার স্বপ্নের সঙ্গে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইও করতে হয়। তবে সন্তান জন্মের পর সমাজ কেবল নবজাতককে দেখে, কিন্তু মা কী যন্ত্রণা সহ্য করেছেন, তা অদেখাই থেকে যায়।

চিকিৎসক ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন—‘হাইপারইমেসিস গ্রাভিডারাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মাতৃত্বকে মহিমান্বিত করার আগে মায়ের কষ্টকে বোঝা উচিত।’