দেশের অনেক মানুষ বিদেশে না গিয়ে ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের অনেকে আপনাদের সেবা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আপনাদের হাসপাতালে এ মুহূর্তে কী ধরনের ট্রিটমেন্ট চালু রয়েছে?

অক্টোবর ব্রেস্ট ক্যান্সারের মাস হিসেবে পরিচিত। চার বছর ধরে ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালাইজড সেন্টারে ক্যান্সার ও সাপোর্টিভ কেয়ারসহ ১৮টি বিভাগ নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছি। আমাদের এখানে সবচেয়ে গুণগত মানসম্পন্ন ও উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হয়।

আমরাই প্রথম প্রত্যেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জন্য পৃথক পৃথক ক্যান্সার ট্রিটমেন্ট ও বিভাগ চালু করেছি। যেমন আমাদের রয়েছে ব্রেস্ট ক্যান্সার বিভাগ, গাইনিকোলজি বিভাগ, পাকস্থলী ক্যান্সার বিভাগ, প্রোস্টেড ক্যান্সার বিভাগ প্রভৃতি।

আমরা ক্যান্সার রোগ নির্ণয়ের জন্য বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো পিএসএমএ-পিইটি প্রযুক্তি চালু করেছি। পাশাপাশি সার্জারি ও সার্জিক্যাল অনকোলজিতে আমাদের শক্ত অবস্থান রয়েছে। এ পর্যন্ত আমরা ৫ হাজার সার্জারি সফলভাবে করেছি। আমাদের সফলতার হার ৯৯ দশমিক ৫০ শতাংশ। শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ সার্জারির পর ইনফেকশন দেখা গেছে, যেটা উন্নত বিশ্বে ৩-৪ শতাংশ।

আমাদের প্রতিটি অপারেশন থিয়েটার হাইটেক মডিউলার। আমাদের হাসপাতালটি বাংলাদেশের একমাত্র হাসপাতাল, যা টেকসই পরিবেশের জন্য লিড গোল্ড সনদ পাওয়া। সম্প্রতি আমাদের হাসপাতালটি প্রথম ক্যান্সার ও সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল হিসেবে জয়েন্ট কমিশন ইন্টারন্যাশনালের (জেসিআই) অ্যাক্রেডিটেশন পেয়েছে।

নয়া রাজনৈতিক বাস্তবতায় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ভিসা দিচ্ছে না। এ কারণে কি আপনাদের হাসপাতালের মতো চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোর চাহিদা বাড়ছে?

আমাদের ওপর রোগীদের বিশ্বস্ততা ও নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য আমরা যাত্রা শুরু করেছি চার বছর আগে। এ সময়ে আমাদের ট্র্যাক রেকর্ড ও সার্ভাইভাল রেট ৫৫-৭০ শতাংশ; যা এক কথায় অসাধারণ, বিস্ময়কর ও অভূতপূর্ব। যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরের তুলনায় এ হার কোনো অংশেই কম নয়। চিকিৎসাসেবা প্রদানের পাশাপাশি রোগীদের অপরাজয়ী হসপিস কেয়ার নামে ভর্তুকি মূল্যে আবাসন সুবিধা দেয়া হচ্ছে। আমাদের হাসপাতালের পাশেই এ ভবন নিয়ে এ সেবা চালু করার ফলে রোগীদের খরচের বোঝা কমানো সম্ভব হয়েছে।

একটি কম্প্রিহেনসিভ ক্যান্সার কেয়ার বাংলাদেশ মিসিং ছিল; যা আমরা তৈরি করেছি। বাংলাদেশে আমরা আরো ৩০টি ক্যান্সার সেন্টার করব।

কোন কোন অঞ্চলে এ সেন্টার করবেন? এরই মধ্যে কোনো সেন্টারের কাজ শুরু করেছেন কিনা?

চট্টগ্রাম দিয়ে শুরু করব। এরপর রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, বগুড়া, রংপুর, ময়মনসিংহ, খুলনাসহ আপাতত বড় শহরগুলোতে করার পরিকল্পনা রয়েছে। এভাবে ক্রমান্বয়ে আমরা দেশের ৩০টি জেলায় এ ধরনের সেন্টার করব।

আপাতত বেশ কয়েকটি সেন্টারের কাজ প্রস্তাবিত আছে। সেন্টারগুলো হাব অ্যান্ড স্কোপ মডেলে তৈরি করা হবে। হাব বা মাদার হাসপাতাল ১৮০ শয্যা নিয়ে এরই মধ্যে করে ফেলেছি; এবার এখন স্কোপগুলো হবে। ডেডিকেটেড রেডিয়েশন, কেমোসহ বিভিন্ন সাপোর্টিভ কেয়ার নিয়ে এটি তৈরি হবে। অনকোলজি সিস্টেমের মাধ্যমে আমরা সবগুলো ব্রাঞ্চ মেইনটেইন করব; যেন গুণগত মানে কোনো আপস না হয়। আঞ্চলিক সেন্টারে থাকা রোগীদের অবস্থা ঢাকা থেকেও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া বিভাগীয় পর্যায়ে আমরা দুই-চারজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রাখব।

দেশের বাইরে ক্যান্সারের ট্রিটমেন্ট এবং আমাদের দেশের অভ্যন্তরে বা আপনাদের হাসপাতালে ট্রিটমেন্টের মধ্যে কোনো তারতম্য আছে কিনা?

আমাদের দেশের অভ্যন্তরে থাকা অন্য হাসপাতালের কথা আমি বলতে পারব না। তবে আমাদের হাসপাতালে বিশ্বের যত গাইডলাইন রয়েছে। যেমন এনসিসি, এ্যাস্ট্রো, এসমো, এ্যাকমোর গাইডলাইন আমরা অনুসরণ করি। এ বছর এসমোতে আমাদের দুটো পেপার প্রেজেন্ট করা হবে। প্রতি বছরই আন্তর্জাতিক মানের পাবলিকেশন হয় ল্যাবএইড হসপিটাল থেকে। আমরা আসলে ধারাবাহিক ট্রিটমেন্ট নিয়ে আপডেটেড থাকি। কিছু বিষয় আছে যেমন পার্সোনালাইজড কেমো বা নিজস্ব ডিএনএ দিয়ে মেডিসিন তৈরি করার মতো উচ্চব্যয়ের চিকিৎসাসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে আমরা এখনো পিছিয়ে। যেহেতু এগুলোর খরচ অনেক বেশি সেহেতু আমরা চেষ্টা করছি এ খরচগুলো কীভাবে ৫০-৬০ শতাংশ কমানো যায়। এ প্রচেষ্টা সফল হলে আগামী দুই বছরের মধ্যে আমাদের এখানেও এ সেবা প্রদান করা সম্ভব বলে আশা করছি।

স্তন ক্যান্সার সচেতনতামূলক মাস চলছে। স্তন ক্যান্সারের সচেতনতার বিষয়ে আপনার পরামর্শ কী?

আমরা হিসাব করে দেখেছি বাংলাদেশে ক্যান্সারের চিকিৎসায় ৩৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা খরচ হয়, ভারতেও এ ধরনের চিকিৎসা ব্যয় প্রায় কাছাকাছি, ব্যাংককে এটা হয়তো ২ কোটি আর সিঙ্গাপুরে ৪-৫ কোটি। একটি বড় সমস্যা হলো আমাদের এখানে স্তন ক্যান্সারের বিষয়ে সচেতনতার খুবই অভাব রয়েছে। ত্রিশোর্ধ্ব প্রত্যেক নারীর উচিত বাধ্যতামূলকভাবে বছরে একবার উভয় স্তনের একটি ম্যামোগ্রাফি করা। প্রতি বছর একবার স্ক্রিনিং করলেই সে বুঝতে পারবে সুস্থ আছে কিনা। এটি খুব বেশি ব্যয়বহুলও না। তিন-চার হাজার টাকা ব্যয় হয়। সর্বোপরি আমাদের দেশে ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার কভারেজ বা স্বাস্থ্যবীমা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এটা করা হলে রোগীর ওপর আর্থিক চাপ অনেকাংশে কমে যাবে।

সাকিফ শামীম

ব্যবস্থাপনা পরিচালক

ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার