মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের বিস্তারের মধ্যে আকাশ হামলার পর গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন পাইপলাইন বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি আরব। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানিকারক দেশটি জানিয়েছে, সাময়িকভাবে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। খবর রয়টার্স।
বাগদাদ ও রিয়াদ জানিয়েছে, পাইপলাইনে ইরাক থেকে ড্রোন হামলাটি পরিচালিত হয়েছিল। ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা রয়েছে ইরাকে, এ হামলার পর দেশটি একজন সামরিক কমান্ডারকে বরখাস্ত করেছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল যুদ্ধের কারণে প্রায় স্থবির হয়ে পড়ায় জ্বালানি তেল পরিবহনের জট এড়াতে এই পাইপলাইন ব্যবহার করা হচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাইপলাইনটি বন্ধ করা হয়েছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ও বিশ্লেষকদের তথ্যানুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোয় পাইপলাইনটি দিয়ে প্রতিদিন ৪০-৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়েছে। এ পরিমাণ বৈশ্বিক সরবরাহের ৪-৫ শতাংশের সমান।
ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরো জোরদার করার মধ্যেই এ হামলা হলো। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের সঙ্গে এটি আরব উপদ্বীপের দুই পাশেই জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি করেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।
ইয়েমেন সরকারের চারটি সূত্র জানিয়েছে, লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব আল-মানদেব প্রণালিতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ গতকাল হুথিরা দখল করে নিয়েছে।
যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা থমকে থাকার মধ্যে পাইপলাইনে হামলা এবং পেরিম দ্বীপ দখল পরিস্থিতির বিপজ্জনক অবনতি ঘটার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা চেয়েছে সৌদি আরব। যুদ্ধের মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এমনিতেই নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় কংগ্রেস নির্বাচন সামনে রেখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান পার্টির ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে।
সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার সকালে সৌদি আরবের রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলা হয়। এরপর বিষয়টি উল্লেখ করে গতকাল পাইপলাইনটি বন্ধ করা হয়।
তাৎক্ষণিকভাবে হামলার জন্য কে দায়ী, তা স্পষ্ট হয়নি। স্যাটেলাইটের ছবিতে মদিনার দক্ষিণে পাইপলাইনের একটি এলাকা থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে রফতানির ওপর এর কী প্রভাব পড়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

আজ ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বরখাস্ত করা সামরিক কমান্ডার মায়সান প্রদেশে সামরিক অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। ইরানের সীমান্তবর্তী দক্ষিণ-পূর্ব ইরাকের এই প্রদেশটি দীর্ঘদিন ধরে ইরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়াদের তৎপরতা ও প্রভাবের এলাকা হিসেবে পরিচিত।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধের পর সৌদি আরব এখন পর্যন্ত হামলার জবাবে কোনো পাল্টা ব্যবস্থা নেয়নি বলে জানিয়েছে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ‘প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা’ নেয়ার অধিকার সৌদি আরব সংরক্ষণ করে বলেও জানানো হয়েছে। ইরাক সরকার হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) শুক্রবার জানিয়েছে, সৌদি আরবের জ্বালানি তেল সরবরাহ তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। বাব আল-মানদেব দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হুথিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর হামলা এর অন্যতম কারণ।
এদিকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে শালামচেহ সীমান্ত পারাপার বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে ইরাক। ইরান থেকে ইরাকে সবজি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য আমদানির অন্যতম প্রধান পথ এ সীমান্ত।
পাইপলাইনে হামলার জন্য দায়ীদের খুঁজে বের করতে ব্যাপক অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে দুই নিরাপত্তা সূত্র।
পাল্টা হামলার প্রস্তুতি
হুথিরা যদি বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেয়, তাহলে তাদের পৃষ্ঠপোষক ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে।
ইয়েমেন সরকারের বাহিনী জানিয়েছে, হুথিদের দখলে যাওয়া এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করবে তারা। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের সময় বছরের পর বছর আকাশ পথে সৌদি আরবের ভয়াবহ হামলা মোকাবেলা করে টিকে থাকা এ পাহাড়ি যোদ্ধারা চলতি সপ্তাহে লোহিত সাগর উপকূল ধরে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে।
ইরানের দুটি সূত্র জানিয়েছে, গত সপ্তাহে ইরান হুথিদের সৌদি আরবে হামলা আরো জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছে। একইসঙ্গে তাদের এ কাজে সহায়তার জন্য আরো অর্থ, অস্ত্র ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পাঠানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে ইরান।
ইরান হুথিদের মিত্র হিসেবে বর্ণনা করলেও প্রকাশ্যে তাদের সামরিক কর্মকাণ্ডে নির্দেশনা দেয়ার কথা অস্বীকার করে আসছে। তেহরান বলছে, হুথিরা ‘ইরানের প্রক্সি নয়’।
হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, সৌদি জাহাজ ছাড়া সব ধরনের জাহাজের জন্য সমুদ্রপথে চলাচল নিরাপদ রয়েছে। সৌদি জাহাজের ওপর আগে ঘোষণা করা নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে বলেও জানান তিনি।
সৌদি আরবের সহায়তার আবেদন
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গত বৃহস্পতিবার হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা চেয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অন্তত দুবার ফোন করেন বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র জানিয়েছে। এর আগে অ্যাক্সিওসও একই তথ্য জানিয়েছিল।
সূত্র দুটি জানায়, ওয়াশিংটন আপাতত রিয়াদের হয়ে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিতে রাজি হয়নি। তবে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা করার প্রস্তাব দিয়েছে।
দুই নেতার মধ্যে কোনো ফোনালাপ হয়েছে কিনা, রয়টার্সের প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেয়নি হোয়াইট হাউজ। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের নিয়মিত যোগাযোগ চলছে।














