চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আর এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রফতানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন, যাতে উল্লেখ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি কোনো পণ্যে ট্রান্সশিপমেন্ট বা রুট পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সেসব পণ্যের ওপর ৪০ শতাংশ জরিমানাসহ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হবে। বৃহস্পতিবার থেকে এই নতুন শুল্ক কার্যকর হচ্ছে। যার সঙ্গে থাকছে নির্দিষ্ট দেশভিত্তিক ১০ থেকে ৪১ শতাংশ হারে আলাদা শুল্কও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ শুল্কের মূল লক্ষ্য চীন। তবে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়ার মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যারা চীনের সঙ্গে জটিল সরবরাহ চেইনে যুক্ত, তারা মারাত্মক অর্থনৈতিক চাপে পড়তে পারে।

ইউনিভার্সিটি কেবাংসান মালয়েশিয়ার বিজনেস স্কুলের সহযোগী অধ্যাপক পুয়ান ইয়াতিম বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র ট্রান্সশিপমেন্টকে শুধুমাত্র এমন পণ্য হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে, যেগুলো চীন থেকে এসে নগণ্যভাবে প্রক্রিয়াজাত হয়ে পুনরায় রফতানি করা হয়, তাহলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রভাব সীমিত থাকবে। কিন্তু যদি কোনো পণ্যে চীনা উপাদান থাকলেই শাস্তিযোগ্য ধরা হয়, তাহলে সেটা এই অঞ্চলের জন্য ধ্বংসাত্মক হবে।

চীনের চায়না প্লাস ওয়ান কৌশলের অংশ হিসেবে গত কয়েক বছরে বহু চীনা কোম্পানি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাদের কারখানা ও সরবরাহ চেইন গড়ে তুলেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০টি আসিয়ান দেশে চীনের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ৭ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে চীন থেকে এই অঞ্চলে রফতানি ৩৮৫ বিলিয়ন থেকে বেড়েছে দাঁড়িয়েছে ৫৮৭ বিলিয়ন ডলারে।

এই প্রবৃদ্ধির মধ্যে অনেক পণ্যের উৎপত্তি ভুলভাবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যার কারণে ট্রাম্প প্রশাসন এই অঞ্চলকে ‘অবৈধ ট্রান্সশিপমেন্টের কেন্দ্রস্থল’ হিসেবে বিবেচনা করছে।

এদিকে চীন ঘোষণা দিয়েছে, যদি কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন কোনো বাণিজ্য চুক্তি করে যা চীনের স্বার্থের পরিপন্থী হয়, তাহলে তারা কঠোর পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

চাপ সামাল দিতে মালয়েশিয়া ঘোষণা দিয়েছে, এখন থেকে দেশটির বেসরকারি সংস্থাগুলো আর রফতানির উৎস সংক্রান্ত সনদ দিতে পারবে না। ভিয়েতনামও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তিতে সম্মত হয়ে ৪০ শতাংশ ট্রান্সশিপমেন্ট শুল্ক গ্রহণ করেছে। ইন্দোনেশিয়া সরাসরি ট্রান্সশিপমেন্টের বিরোধিতা করেছে।

তবে এসব পদক্ষেপের পরও ট্রান্সশিপমেন্ট শুল্ক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেসরকারি খাতের জন্য বিশাল ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করেন এপ্যাক অ্যাডভাইজার্সের প্রধান নির্বাহী স্টিভ ওকুন। এই শুল্কনীতি ‘বাণিজ্যের সংজ্ঞা পুনর্নির্ধারণের সম্ভাবনা তৈরি করছে’ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের এশিয়াবিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ নিক মারো বলেন, এই মুহূর্তে ট্রান্সশিপমেন্ট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে অবস্থান নিচ্ছে, সেটা স্পষ্টভাবেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য নেতিবাচক। যারা ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশলের ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগ করেছে, তাদের এখন এই ঝুঁকি নতুন করে পর্যালোচনা করতে হবে।