বহু দশকের হুমকি-ধমকির পর অবশেষে শুক্রবার (১৩ জুন) ইরানের ওপর নজিরবিহীন সামরিক হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, পরমাণু বিজ্ঞানী ও সামরিক নেতৃত্ব। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, এ অভিযানে ‘ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রায়ন কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে আঘাত হানা হয়েছে।’ তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিধ্বংসী হামলার পরও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির অনেকাংশই অক্ষত রয়ে গেছে। খবর ওয়াশিংটন পোস্ট।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় ইরানের নাতাঞ্জের বৃহত্তম ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের একটি ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্র ও বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে মজার ব্যাপার হলো, ইসরায়েল হামলার প্রথম ধাপে ইরানের বোমা তৈরিতে সক্ষম গ্রেডের (নিয়ার বম্ব গ্রেড ইউরেনিয়াম) পারমাণবিক জ্বালানির সবচেয়ে সম্ভাব্য মজুদস্থলে আঘাত হানেনি। এটি ইচ্ছাকৃতই হতে পারে বলে অভিমত তাদের।

আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের মতে, ইরানের বোমা তৈরিতে সক্ষম গ্রেডের মজুদ ইস্পাহানের সাবেক রাজধানী শহরের বাইরের এক বিশাল কমপ্লেক্সে সংরক্ষিত আছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, ইরানের গোপন অস্ত্র গবেষণা কর্মসূচির অন্যতম কেন্দ্র এটি। ইসরায়েলের ১০০টি যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রথম দফা ইস্পাহান থেকে বেশ দূরে ছিল।

শুক্রবার বিকালে ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানায়, দ্বিতীয় দফা হামলায় তারা ইস্পাহানে আঘাত হেনেছে, তবে জ্বালানি মজুদস্থলে নয়। এর পরিবর্তে তারা ইউরেনিয়াম গ্যাসকে ধাতুতে রূপান্তর করার ল্যাবরেটরিগুলোতে মনোযোগ দিয়েছে। এটি অস্ত্র তৈরির শেষ ধাপগুলোর একটি। কিন্তু জ্বালানি যেখানে মজুদ করা আছে, সেই এলাকায় আঘাত হানার বিষয়ে তারা কিছু জানায়নি।

ইসরায়েল কেন মজুদস্থল এড়িয়ে গেছে, তা একটি রহস্য। কারণ এটি ইরানকে দ্রুততম সময়ে একটি ছোট পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ দেবে। সম্ভবত ইস্পাহান কমপ্লেক্স ইসরায়েলের পরবর্তী ধাপের হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুক্রবার বলেছেন, ‘আরো অনেক কিছু আসছে’ এবং পরবর্তী হামলাগুলো হবে ‘নিষ্ঠুর’।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইসরায়েল ইচ্ছা করেই ইস্পাহান এড়িয়ে গেছে। ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টসের জন উলফস্টাল বলেন, ‘ইসরায়েল ইস্পাহানের পরিচিত ইউরেনিয়াম উৎপাদন কেন্দ্রে বোমা হামলা না করার বিষয়টি ইঙ্গিত করে যে হয় বিবি (নেতানিয়াহু) বোমা হামলা তেজস্ক্রিয়তার ঘটনা ঘটাতে পারে বলে চিন্তিত ছিলেন অথবা তারা মনে করেন, এটি ইরানকে স্বেচ্ছায় ইউরেনিয়াম মজুদ ত্যাগ করতে পরিচালিত করবে।’

তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়া নিয়ে উদ্বেগ বাস্তব। বর্তমান অবস্থায় জ্বালানি মজুদস্থলে বোমা হামলায় হয়তো পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটাবে না। তবে এটি জ্বালানি পরিবেশে ছড়িয়ে দিতে পারে, যা তেজস্ক্রিয় বিকিরণের বিপদ সৃষ্টি করবে।

ইতিহাস ইঙ্গিত করে যে ইসরায়েল তেজস্ক্রিয় পদার্থ অবমুক্তির ঝুঁকির প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ১৯৮১ সালে সাদ্দাম হোসেনের ওসিরাক পারমাণবিক চুল্লিতে বোমা হামলার সময় ইসরায়েল জ্বালানি চুল্লিতে প্রবেশ করানোর আগেই হামলা চালায়। সিরিয়ার একটি কেন্দ্রে উত্তর কোরিয়ানদের দ্বারা নির্মিত একটি প্লান্টে হামলা করার সময়ও তারা একই কাজ করেছিল, যদিও সে ক্ষেত্রে ইসরায়েল বোমা হামলার দায়ভার কয়েক মাস ধরে গোপন রাখার চেষ্টা করে। শুক্রবার সকালে ইরানে হামলায় তারা বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে।

আরেকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন যে তারা ইরানকে ইউরেনিয়ামের বোমা-গ্রেড স্তরে (৯০ শতাংশ) আরো সমৃদ্ধ করা থেকে আটকাতে পারবেন। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অনুমান অনুযায়ী, এ প্রক্রিয়াটি মাত্র কয়েক দিন বা সপ্তাহ সময় নেবে।

এদিকে ইসরায়েলি হামলার অন্যতম মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের বৃহত্তম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নাতাঞ্জ। এই কেন্দ্রের বিষয়ে গ্রসি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি এটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ যদি নাতাঞ্জ অচল হয় তবে ইরানের সেরা বিকল্প হবে পারমাণবিক জ্বালানি ফোরদোতে ছোট সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া। এ কেন্দ্রটি একটি পাহাড়ের গভীরে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কর্পসের ঘাঁটিতে অবস্থিত।