মুক্তিযুদ্ধের লড়াকু বীর প্রতীক ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ত্যাগ আর সংগ্রামের এক সুবিশাল মহাকাব্য। এ মহাকাব্যের পাতায় পাতায় রয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষের প্রতিটি মানুষের নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশের জন্য করে যাওয়া নিজেদের মতো সংগ্রাম, নিজেদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ত্যাগ ও চেষ্টা। সেই স্বাধীনতাকামী জনগণের এক বিশাল অংশ ছিল আমাদের নারীরা। এদেশের আলো-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা অতি সাধারণ পল্লীবালা থেকে শহরের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়ে, এমনকি নৃগোষ্ঠির মেয়েরাও কখনো অস্ত্র হাতে, কখনো গুপ্তচর হয়ে, খাবার-রসদের জোগান দিয়ে, কখনো সেবা দিয়ে নয়টি মাস ধরে জিইয়ে রেখেছিল মুক্তির সেই যুদ্ধটিকে। আজ এমন এক নারীর কথা বলব, যার সেবা, যত্ন ও স্নেহে সেই প্রতিকূল সময়ে অসুস্থ আর আহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গড়ে উঠেছিল অসাধারণ এক সেবাকেন্দ্র আগরতলার বাংলাদেশ হাসপাতাল, মুক্তিযুদ্ধের সময় এ হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা বীর প্রতীক সিতারা বেগমের সংগ্রামী আর স্নেহপূর্ণ জীবনের গল্প।
বাংলাদেশ
স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রের নবম ও দশম খণ্ড থেকে জানা যায়, দুই নম্বর সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের পরিকল্পনা থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ হাসপাতাল। দুই নম্বর সেক্টরে আশ্রয় নেয়া মেডিকেলে অধ্যয়নরত কিছু শিক্ষার্থী নিয়ে অল্প কিছু শয্যার ব্যবস্থা নিয়ে শুরুতে এ হাসপাতাল গড়ে উঠলেও পরবর্তী সময়ে তা হয়ে ওঠে প্রায় ৪০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল। এ হাসপাতাল হয়ে ওঠে রণক্ষেত্রে আহত ও অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এক আশ্রয়ের ঠিকানা। প্রথম দিকে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা দেয়া কঠিন হলেও জুলাইয়ের শেষে যখন ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম সিও হিসেবে এ হাসপাতালের দায়িত্ব নেন, তখন থেকে তার আন্তরিক পরিশ্রম, আত্মনিবেদন ও পরিকল্পনা এ হাসপাতালকে এক অনন্য হাসপাতালের পর্যায়ে নিয়ে যায়।
মুক্তিযুদ্ধের
পুরো সময়টা ধরে দিনের পর দিন এ হাসপাতালে ডাক্তার সিতারার কাজ ছিল অসাধ্য সাধন করে যাওয়া। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা গুলিবিদ্ধ, স্প্লিন্টারের আঘাতে ঝাঁঝরা, গুরুতর জখম মুক্তিযোদ্ধাদের সারিয়ে তুলতে হতো খুব সামান্য আর সাধারণ ওষুধপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জাম দিয়ে। ওষুধপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব কেমন ছিল তা বোঝা যায় হাসপাতালের কাঠামোগত বর্ণনা থেকেই।
রোগীর
জন্য প্রতিটি বিছানা তৈরি হতো বাঁশের চারটি খুঁটির ওপর মাচা বেঁধে। প্লাস্টিক দিয়ে ঘেরা অপারেশনের ঘরে কেবল দিনের বেলাতেই অপারেশন করা হতো। কখনো কখনো রাতে কোনো জরুরি অপারেশনের দরকার হলে ব্যবহার করা হতো হারিকেন কিংবা টর্চলাইট। এমন কাঠামো আর ব্যবস্থা নিয়েও এ হাসপাতাল যুদ্ধের সময়কার সফলতম হাসপাতালগুলোর একটি হিসেবে গণ্য করা হয়।
সিতারা বেগমকে কেবল ওষুধ সংগ্রহের জন্য নিয়মিত আগরতলা যেতে হতো। তার রাতদিন অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিপুণ পরিচালনার ফলে বিপুলসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশের জন্য যুদ্ধরত ভারতীয় সেনাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ছিনিয়ে আনা সম্ভব হয়। এই সিতারা বেগম কিন্তু আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা বীর উত্তম এটিএম হায়দারের সহোদর। এ সাহসী ও ত্যাগী নারীর জন্ম দেশ বিভাগের প্রাক্কালে ১৯৪৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর, কিশোরগঞ্জ জেলায়। বাবা মোহাম্মদ ইসরাইল মিয়া ছিলেন পেশায় একজন উকিল। তার মায়ের নাম ছিল





