স্মৃতিচারণ করা বড় কঠিন, বড় কষ্টের তা যদি মধুর না হয়ে হয় এ রকম—১৯৭০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে আমাদের বিয়ে হয় যার পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৭১ সালের ১৫ নভেম্বর, এক হূদয়বিদারক-নিষ্ঠুরতা, বর্বরতার মধ্য দিয়ে। মাত্র এক বছর নয় মাস ছিল আমাদের বিবাহিত জীবন। কিন্তু ভাবলে অবাক লাগে এত স্বল্প সময়ের যে স্মৃতি ডা. আজহারুল হক আমার জীবনে রেখে গেছেন তা লিখে শেষ করার নয়। আজ বিশেষ করে মনে পড়ছে ’৭১ সালের ২৫ সার্চের সেই ভয়াল কালরাতের বিভীষিকার কথা। আমি ২৪ মার্চ হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩১ নম্বর কেবিনে ভর্তি হই। ওই একই সময়ে আমার শ্রদ্ধেয় শাশুড়ি ও আমার ভাইয়ের ফুফুশাশুড়িও রোগী হিসেবে আগে থেকেই হাসপাতালে ছিলেন। এক সাথে এ তিন রোগী দেখাশোনার দায়িত্ব নিলেন ডা. আজহারুল হক। ২৫ মার্চের রাতে তিনি বাসায় না ফিরে আমার কেবিনেই থেকে গেলেন। রাত ১০টার দিকে কর্তব্যরত সিসটার আমাকে পেথিডিন ইনজেকশন দিয়ে চলে যাওয়ার পর পরই আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম। ডা. আজহার কেবিনসংলগ্ন বারান্দায় ঘুমাতে গেলেন। ডা. আজহার তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগের শল্য বিভাগে সহকারী সার্জন হিসেবে চাকরিরত। তাই আমি ভর্তি হওয়ার দিন থেকে তার কাজের ফাঁকে ফাঁকে কেবিনে এসে আমাকে দেখে যেতেন। ২৫ মার্চ বেলা ১১টার দিকে ডা. আজহার হাসপাতাল ক্যান্টিন থেকে কাবাব ও শিঙাড়া কিনে আমার কেবিনে এলেন, ওই সময় আমার বড় বোন মিসেস শাহাবুদ্দিনও এসেছিলেন। খাবারগুলো বোনের হাতে দিয়ে এবং কিছু নিজেও নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেতে শুরু করলেন আজহার, তখন আমি শুয়ে চেয়ে তাকে দেখছিলাম, সাদা অ্যাপ্রোন ও কালো প্যান্টে ওকে সেদিন আমার চোখে কেন জানি খুব ভালো লাগছিল। খেতে খেতে তিনি আমার বোনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘আপা, আজকে কিছু একটা হতে পারে, দেশের পরিস্থিতি খুব খারাপের দিকে যাচ্ছে, যেকোনো মুহূর্তে কারফিউ হয়ে যেতে পারে। ১৯ ও ২০ নম্বর ওয়ার্ড খালি করার হুকুম হয়েছে।’ আমি সাথে সাথে আতঙ্কিত হয়ে কী হয়েছে জিজ্ঞাসা করাতে তিনি ও কিছু না, অফিসে অনেক কাজ আছে বলে তাড়াতাড়ি চলে গেলেন। বিয়ের পর থেকেই ডাক্তারকে দেখতাম এসব রাজনৈতিক ব্যাপারে খুব আগ্রহ দেখাতে, প্রায় সময়ই নানা বিষয়ে গভীর আলোচনা করতেন অন্যদের সাথে। নতুন নতুন খবর নিয়ে বাসায় ফিরে কী উৎসাহ নিয়েই না কথাগুলো আমাকে বলতেন। ছাত্রজীবনে তিনি কোনো ছাত্র সংগঠন করতেন কিনা জানি না। তবে প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন এবং তত্কালীন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভিপি হুমায়ুন কবীরের সাথে তার খুব অন্তরঙ্গতা দেখতাম। ২৫ মার্চের রাত ১২টার দিকে যখন আমি প্যাথেডিনে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তখন বিকট আওয়াজে হঠাৎ
স্মৃতিচারণ করা বড় কঠিন, বড় কষ্টের তা যদি মধুর না হয়ে হয় এ রকম—১৯৭০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে আমাদের বিয়ে হয় যার পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৭১ সালের ১৫ নভেম্বর, এক হূদয়বিদারক-নিষ্ঠুরতা, বর্বরতার মধ্য দিয়ে। মাত্র এক বছর নয় মাস ছিল আমাদের বিবাহিত জীবন। কিন্তু ভাবলে অবাক লাগে এত স্বল্প সময়ের যে স্মৃতি ডা. আজহারুল হক আমার জীবনে রেখে গেছেন তা লিখে শেষ করার নয়। আজ বিশেষ করে মনে পড়ছে ’৭১ সালের ২৫ সার্চের সেই ভয়াল কালরাতের বিভীষিকার কথা।





