১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের আগ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের হাসপাতালগুলো স্বাভাবিক ছিল, সচল ছিল। ২৫ মার্চের আগ থেকেই বেশকিছু গোলযোগের ঘটনা ঘটেছে। বাঙালি-অবাঙালিদের মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। সংঘাতে জড়িত বেশির ভাগই ছিল বিহারি জনগোষ্ঠী। এতে উভয় পক্ষেরই লোকজন আহত হয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে এসেছিল সার্জিক্যাল ও অর্থোপেডিক চিকিৎসার জন্য। কিন্তু ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিত হামলা চালালে মানুষের মধ্যে সাংঘাতিক ভীতি কাজ করে। সেই ভয়টা চিকিৎসক, সেবিকা এবং প্যারামেডিকসদের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছিল। ফলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী প্রভৃতি বড় শহরের হাসপাতালগুলো থেকে হামলার কারণে চিকিৎসক, সেবিকা ও প্যারামেডিকস চলে। ভয়ে তারা সরে গেছে। অনেকেই বাড়িতে চলে গেছে। কেউ কেউ ভারতে আশ্রয় নিয়েছে।

এ সময় সেবাকার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। আবার দেখা গেছে প্রাণভয়ে অনেক হাসপাতাল থেকে রোগীরাও পালিয়ে গেছে। এ রকম একটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তখন সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু যখন পাকিস্তানিরা সারা বাংলাদেশের দখল নেয়, তখন ধীরে ধীরে আবার হাসপাতালের সেবাকার্যক্রম চালু হয়। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়ে চিকিৎসা ব্যবস্থা খুব একটা ব্যাহত হয়নি। বিশেষ করে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় তেমন ব্যাঘাত ঘটেনি। তবে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছে বা স্বদেশের পক্ষে কাজ করেছে, এমন বাঙালি চিকিৎসকদের মধ্যে ভীতি ছিল। এটা চিকিৎসক, সেবিকা এবং প্যারামেডিকস সবার ক্ষেত্রেই সমানভাবে সত্য। অনেকেই গোপনে এসব কাজকর্ম করত। তখন পাকিস্তানি সেনাদের চেয়ে রাজাকার, আলবদর, আলশামস—এ রকম কিছু গোষ্ঠী বেশি সক্রিয় ছিল। তারা বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসা পেশাজীবীদের অপহরণ করেছে, অত্যাচার করেছে। যার ফলে চিকিৎসা পেশাজীবীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চিকিৎসাসেবায় অংশগ্রহণ করতে পারেনি।

এ ধরনের সহিংসতা ঘটেছে নির্দিষ্ট পেশাজীবীদের প্রতি। বিশেষ করে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে যে, তারা ভারত গেছে, সেখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছে বা যাদের বিরুদ্ধে প্রশিক্ষণ নেয়ার সন্দেহ করেছে বা সত্যিকার অর্থে নিয়েও এসেছে। কিংবা গোপনভাবে কাজ করছে বলে তাদের কাছে তথ্য ছিল। তাদের ব্যাপারে এ ধরনের ঘটনাগুলো ঘটেছে। অনেকেই পালিয়ে থেকেছে। অনেকে গ্রেফতার হয়েছে। অনেকেই খুনও হয়েছে রাজাকারদের হাতে।

তবে সাধারণত ওষুধ কিংবা মেডিকেল ইকুইপমেন্ট প্রাপ্তির দিক থেকে তেমন কোনো সমস্যা দেখা দেয়নি। এটা মূলত দেশের ভেতরের চিত্র।

এদিকে দেশের বাইরে, মুক্তাঞ্চল কিংবা শরণার্থী শিবিরগুলোয় প্রবাসী সরকার চিকিৎসা ব্যবস্থার বিষয়টি আন্তরিকভাবে দেখাশোনা করেছে এবং চিকিৎসকদের অনেকেই এসব জায়গায় সেবা দিয়েছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন হলেন গণস্বাস্থ্যের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। গণস্বাস্থ্য একটি ফিল্ড হাসপাতাল ছিল। এক্ষেত্রে ড. মবিন, ডা. জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী, ডা. কামরুজ্জামানের নাম উল্লেখযোগ্য। বিলেতে তারা সহপাঠী ছিলেন। প্রায়ই সমবয়সী। তারা এসেই ফিল্ড হাসপাতাল গড়ে তোলেন। এখানে বিদেশী নার্সরাও কাজ করেছেন। আবার মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়া নার্সদের অনেকেই কাজ করেছেন। শরণার্থী হিসেবে যারা গেছেন, তাদেরও অনেকেই কাজ করেছেন। এছাড়া আরো ফিল্ড হাসপাতাল ছিল।

অন্যদিকে আমাদের আর্মি যারা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, তারাও তাদের চিকিৎসা