আমি খুবই কম মানুষের কথা বলতে পারব, যারা ফজলে হাসান আবেদের চেয়ে বেশি বঞ্চিত মানুষের জন্য কাজ করেছেন। শুধু দেশে নয়, বিশ্বে এমন ব্যক্তিত্ব খুবই বিরল। তার প্রচেষ্টায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক প্রসার লাভ করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭২ সালে স্যার ফজলে হাসান আবেদ এ সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেন। যার মাধ্যমে এরই মধ্যে দেশের সুবিধাবঞ্চিত এক কোটি পরিবারের কাছে সেবা পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয়েছে। ফজলে হাসান আবেদের প্রতিশ্রুতি ছিল, ব্র্যাকের মাধ্যমে বিশ্বের বঞ্চিতদের মাঝে সেবা পৌঁছে দেয়া।

সে স্বপ্ন এখন বাস্তব রূপ লাভ করেছে। ব্র্যাকের সেবা এখন বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত। শ্রীলংকায় প্রাকৃতিক দূর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এবং আফগানিস্তানের যুদ্ধবিধ্বস্ত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসনেও বিনিয়োগ করেছে সংস্থাটি। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজ করছে, যেখান অধিবাসীরা তালেবান দ্বারা জিম্মি ছিল। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে সুবিধাবঞ্চিত ও দুস্থ জনগোষ্ঠীর সেবা প্রদানের লক্ষ্যে কাজ করছে। সংস্থাটির কাজ পাকিস্তান, ফিলিপাইন, তাঞ্জানিয়া, উগান্ডা, দক্ষিণ সুদান, লাইবেরিয়া এবং সিয়েরা লিওনে সক্রিয়ভাবে শুরু হয়েছে। এমনকি ব্র্যাক সেবার মান বৃদ্ধি করে আটলান্টিক পেরিয়ে হাইতিতে পৌঁছেছে। ব্র্যাক অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়ে সুবিধাবঞ্চিতদের সঙ্গে নিয়ে এখন বিশ্বের বৃহত্তম এনজিওতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক টার্ণওভার ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং প্রায় ১ লাখের বেশি কর্মী এ প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে।

ব্র্যাক এককভাবে বিশ্বের বঞ্চিত সম্প্রদায়ের সেবা প্রদানে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করে গোটা সম্প্রদায়কে শিক্ষিত করে তোলা অন্যতম। ব্র্যাক শুধু এখন একটি এনজিও নয়, বঞ্চিতদের জন্য একটি করপোরেশন।

বর্তমানে ব্র্যাকের যে সাংগঠনিক ক্ষমতা এবং বাজার স্বীকৃতি, তা শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক এনজিও অক্সফামের সঙ্গে তুলনা করার মতো। বিশ্বের সেরা বিজনেস স্কুলগুলোতে ম্যানেজমেন্ট কেস স্টাডিজ হিসেবে ব্র্যাকের ইতিহাস পড়ানো হচ্ছে।

ব্র্যাক এখন বিশ্বের বৃহত্তম ক্ষুদ্রঋণদাতা সংস্থাও, যার বাজেটের ৮০ শতাংশেরও বেশি আন্ডাররাইট করার মতো অবস্থানে রয়েছে। বিভিন্ন সমাজভিত্তিক বাণিজ্যিক উদ্যোগে ব্র্যাক বিনিয়োগ করে থাকে। যেমন, ব্র্যাক ব্যাংক। এর মাধ্যমে ব্র্যাক অভ্যন্তরীণ আয় আরো বাড়িয়েছে। বঞ্চিত সম্প্রদায়ের কাছে আরো বেশি সেবা পৌঁছাতে ও গৃহীত প্রোগ্রামগুলো প্রসারে আলোচ্য উদ্যোগগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আর এসবই সম্ভব হয়েছে ফজলে হাসান আবেদের হারকিউলিয়ান প্রচেষ্টা ও অসাধারণ দক্ষতার ফলে। আবেদ ছিলেন অসাধারণ উদ্যোক্তা ও দক্ষ পরিচালক। তিনি জনসাধারণের সেবা প্রদানের লক্ষ্যে অকৃত্রিম আবেগ নিয়ে ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখন যেটি সারা বিশ্বে প্রসারিত হচ্ছে। আবেদ পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী হিসেবে, উচ্চ বেতনে। চাকরিকালীন ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে মারাত্মক এক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। এতে অনেক মানুষ মারা যায় এবং সম্পদের বিপুল ক্ষতি হয়। অনেক মানুষ সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। এ সময় আবেদ দুর্গত এলাকায় গিয়ে ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এরপর ১৯৭১ সালে বাঙালিদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিল পাক হানাদার বাহিনী। সেখানেও তিনি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। মানুষ সৃষ্টি সহিংসতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ধ্বংসযজ্ঞের শিকার ব্যক্তিদেরই শুধু নয়, যারা প্রাকৃতিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করছেন, তাদের জীবনমান পরিবর্তনের জন্য আবেদ নিজের জীবনকে উত্সর্গ করেছেন। আবেদ বঞ্চিত সম্প্রদায়ের ভাগ্য পরিবর্তনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে একটি ভিশন তৈরি করেছিলেন। তিনি বঞ্চিতদের জীবনমান পরিবর্তনে বহুপক্ষীয় কর্মসূচি গ্রহণ করেন।

এ কর্মসূচি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত, শিক্ষা ও দক্ষতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে; যার