২০১৫ সালের কথা।

সবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা থেকে অবসর নিয়েছি। হাতে থাকা একটা পুরনো গবেষণা কাজের জন্য সপ্তাহে দুদিন মহাখালী ব্র্যাক সেন্টারে যেতে হতো। পনের তলায় গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগে আমার কাজ। প্রয়াত মাহবুব হোসেনের সঙ্গে একটা বই লিখছিলাম, নাম ‘বিশ গেরামের গল্প’ যা গ্রামের মানুষের ভাষায় রূপান্তরের কিসসা।

তখনো ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপারসন স্যার ফাজলে হাসান আবেদের সঙ্গে আমার তেমন পরিচয় ছিল না। অনুমান করি, তিনি আমাকে চিনতেন পত্রিকায় আমার লেখার মাধ্যমে। তাছাড়া হয়তো মাহবুব হোসেন ও আমার লেখা দু-একটা বইয়ে হাত বুলিয়ে থাকবেন; ১৯ তলায় মাহবুব হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েও মুখোমুখি হয়েছি আমরা দুজন। এ পর্যন্তই। কিন্তু এ যাত্রায় প্রায়ই তাঁর সঙ্গে লিফটে দেখা হতেই জিজ্ঞেস করতেন, ‘কোথায় যাচ্ছেন, মাহবুবের কাছে? আপনি তো একজন প্রলিফিক রাইটার।’ শুনে ভালো লাগত।

দুই. হঠাৎ একদিন মাহবুব হোসেন জানালেন, দু-এক বছর যদি ব্র্যাকের গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগটি দেখভাল করতেন, আবেদ ভাই খুব খুশি হতেন। আমি আমতা-আমতা শুরু করলে তিনি ধরে নেন, মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ।

পরিচালকের দায়িত্ব পাওয়ার অব্যবহিত পর গেলাম চেয়ারপারসন স্যার আবেদের সঙ্গে দেখা করতে। বললাম, আমি এখন অবসরপ্রাপ্ত, ভেবেছিলাম... বলতেই তিনি কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, ‘অধ্যাপকদের আবার অবসর নেয়া আছে নাকি? বিদেশে হচ্ছে যতদিন আপনি কর্মক্ষম থাকবেন, ততদিন কাজ করবেন। থাকুন না ক’টা বছর আমাদের সঙ্গে।’ সেই থেকে আমি ব্র্যাকের সোনার খাঁচায় বন্দি ছিলাম তিন বছর।

 নুন আনতে পান্তা না ফুরালেও অধ্যাপকরা সাধারণত অভাবী গোত্রের মানুষ হয়। তবে শত অভাব থাকার পরও ‘স্যার’ ডাকটি তাদের কাছে কাঠফাটা রোদে এক পশলা বৃষ্টির মতো। অভাব-অনটন আর সাংসারিক ঝক্কিঝামেলার মধ্যে স্যার সম্বোধন তাঁদের সম্পদের মতোই বাঁচিয়ে রাখে। ব্র্যাকে চাকরি হওয়ার পর প্রথম ধাক্কায় আমার সেই সম্পদটি হাতছাড়া হতে দেখে কষ্ট পেলাম। এখানে কেউ কারো স্যার না, একে অন্যের ভাই। আর ভাই সংস্কৃতির মধ্যেই আমি সন্দেহাতীতভাবে ব্র্যাক কাঠামোতে সাম্যের সন্ধান পাই। অবশ্য ব্র্যাক কর্মী আমার প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা স্যার ডেকে আফসোস কিছুটা হলেও মিটিয়ে দিতেন।

তিন. খুব সম্ভবত ২০১৬ সালে স্যার আবেদ আশিতে পা ফেলেন। তাঁর জন্মদিন তথা আশিতে পা রাখার উত্সব পালন করার জন্য ব্র্যাক প্রস্তুতি নিল। আমি ভাবলাম, প্যারিসে গিয়ে আইফেল টাওয়ার না দেখা যেমন একটা আফসোসের বিষয়, ব্র্যাকে চাকরি করে স্যার আবেদ সম্পর্কে কিছু না জানাও সেই রকম। তাছাড়া এটাও গবেষণার কাজ যে কোত্থেকে, কীভাবে এবং কী করে ব্র্যাক বর্তমান জগতে এক নম্বর এনজিও হিসেবে দাঁড়াল, তা খতিয়ে দেখা। শূন্য থেকে শূন্যে ওঠার গল্প না জানলেই যে নয়!

সুতরাং শুরুর দিকে তিনি যেসব এলাকায় কাজ করেছেন, সেসব এলাকায় তাঁর কমরেডদের সঙ্গে কথা