শুরুর সাড়ে পাঁচশ দিন

১৯৭৭ সালের প্রথম দিক, সম্ভবত জানুয়ারির কোনো একদিন। বিয়ের এক অনুষ্ঠানে দ্বিতীয়বারের মতো দেখা হলো আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে। ছোট্ট তামারাকে নিয়ে হাঁটছিলেন। আমি এগিয়ে গেলাম। সাহস সঞ্চয় করে সালাম দিলাম। দেখেই চিনে ফেললেন। বললেন, কবে জয়েন করছ? বললাম, ১৭ মার্চ। সঙ্গে সঙ্গে আরো বললাম, এদিনটি আমার জন্য বিশেষ সৌভাগ্যসূচক। জিজ্ঞেস করলেন, কেন এটি বিশেষ দিন? তখন রোববার ছিল সাপ্তাহিক ছুটি, শনিবার অর্ধদিবস। ১৭ মার্চ ছিল বৃহস্পতিবার। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ঈযবরত্ড়’ং ইড়ড়শ ড়ভ ঘঁসনবত্ং ছিল আমার প্রিয় একটি বই। ভাবতাম সংখ্যা ‘৮’ আমার নিজস্ব সংখ্যা। ঘঁসবত্ড়ষড়মু-তে ৮, ১৭, ২৬ একই অর্থবহ; সবই আট। আবেদ ভাই হয়তো মনে মনে হাসলেন কিন্তু তার কোনো অভিব্যক্তি চোখে পড়ল না। বললেন ঠিক আছে।

ঠিকই নির্দিষ্ট দিনে ব্র্যাকে যোগদান করলাম, মগবাজারের সেই অফিসটিতে। পরিচয় হলো অনেকের সঙ্গে, যাঁদের কেউই এখন আর ব্র্যাকে নেই। পরের সপ্তাহেই আবেদ ভাই আমাকে পাঠিয়ে দিলেন শাল্লায়। বললেন, শাল্লায় আমরা সবজি চাষ বাড়ানোর চেষ্টা করছি কিন্তু বুঝতে পারছি না কতটুকু সফল হয়েছি। দেখো তো কিছু বের করা যায় কিনা। আমি তো মহাখুশি। গবেষণায় আমার বিপুল আগ্রহ আর প্রথমেই কিনা এ কাজ পেয়ে গেলাম। যথারীতি রওনা হলাম। ব্র্যাকের প্রকল্প সমন্বয়ক কায়সার জামান ভাই আমার সঙ্গী। বিমানে সিলেট এবং সেখান থেকে বেবিট্যাক্সিতে শেরপুর। সেখানে ব্র্যাকের স্পিডবোট অপেক্ষা করছিল। চড়ে বসলাম। স্পিডবোট রওনা হলো ভাটির টানে পশ্চিম দিকে। কুশিয়ারা নদী। কয়েক ঘণ্টা পরই আমাদের গন্তব্যস্থল মার্কুলিতে পৌঁছব। গত কয়েক দিনে ব্র্যাক সম্পর্কে কিছু পড়া হয়ে গেছে। পুলকিত বোধ করলাম এ কথা ভেবে যে, এ কুশিয়ারা নদী দিয়েই ১৯৭২ সালে ব্র্যাক ভারত থেকে লাখ লাখ বাঁশ নিয়ে এসেছিল মুক্তিযুদ্ধের শরণার্থীদের পুনর্বাসন করতে। কায়সার ভাইয়ের সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে আলাপ করতে করতে দেখছিলাম নদীর দুই তীর, ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রাম। ব্যক্তিগতভাবে শহরেই আমার বড় হয়ে ওঠা, তাই গ্রামের গন্ধ-সুবাস কোনোটাই খুব একটা ভাগ্যে জোটেনি। যদিও আবেদ ভাইয়ের দেয়া কাজটাই মুখ্য ছিল আমার জন্য, তবে এ সফরে আরো দুটি কাজ হয়েছিল। এক. বাংলার গ্রাম দেখা, বিশেষ করে শীতকালের ভাটি অঞ্চল। দুই. ব্র্যাকের বিস্তৃত কার্যক্রম দেখা এবং সম্যক উপলব্ধি করা।

ভাটি অঞ্চলের শীতকাল যাতায়াতের জন্য সুবিধাজনক ছিল না। রাস্তাঘাট নেই। মূলত হাঁটাই একমাত্র উপায়। ব্র্যাকের দশটা ক্যাম্প (অফিস) ছিল, একটি থেকে আরেকটিতে যেতে কোনো কোনো এলাকায় সারা দিন লেগে যেত। এর মধ্যে সম্ভবত আটগাঁও ছিল সবচেয়ে দূরে। এখন তো ঘুঙ্গেরগাঁও ছাড়া প্রায় সব জায়গাতেই গাড়িতে যাতায়াত করা যায়। শাল্লা তথা ভাটি অঞ্চলে ব্র্যাকের বিভিন্ন প্রকল্পে এর পরও অনেকবার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। বর্ষায় শাল্লা, সে তো আরেক রূপ। ‘