আমাদের সময়ের প্রবাদ পুরুষ স্যার আবেদ। খুব কাছ থেকে তাকে দেখার সুযোগ হয়েছে। অসামান্য মেধাবী এবং গোছানো একজন মানুষ ছিলেন তিনি। সিটিব্যাংক এনএ ছাড়ার পর অনেকটা ধরে নিয়ে গিয়ে দায়িত্ব দিয়েছিলেন ব্র্যাক বিজনেস স্কুল গড়ে তোলার। দূর থেকে অনেক বুদ্ধি পরামর্শও দিয়েছেন। এ ক্ষণজন্মা পুরুষের মৃত্যু নেই। আছে শুধু এপার থেকে ওপার চলে যাওয়া।
ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংক, সিআরপি, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রসহ বড় বড় জনহিতকর প্রতিষ্ঠান গড়তে যেমন সময় লেগেছে, মরতেও হয়তো লাগবে অনেক সময়, যদি না ভবিষ্যতের কাণ্ডারিরা সুযোগ বা সময়ের অপব্যবহার করেন। তিলে তিলে গড়ে তোলা কর্ম সংস্কৃতিকে পাশ কাটিয়ে যান। নিবেদিত প্রাণ কর্মীদের অবহেলা করেন কিংবা তাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চটা বের করে আনতে ব্যর্থ হন।
আমার জানামতে, এ অঞ্চলের মজদুর জনতার মুক্তির লড়াইয়ের অগ্রদূত ছিলেন কমরেড মণি সিংহ। কিন্তু তিনি গরিব ঘরের সন্তান ছিলেন না। গরিব ঘরের সন্তান ছিলেন না স্যার আবেদ, অধ্যাপক ইউনূস, আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ, অধ্যাপক রেহমান সোবহান; এমনকি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও। কিন্তু তারা প্রত্যেকেই অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে গরিব মানুষের দুঃখ উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন এবং তা লাঘবের জন্য কমবেশি কাজ করেছেন। অর্থাত্ গরিব মানুষের উপকার করার জন্য গরিব হওয়ার প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, অনেক সময় বাংলাদেশে গরিব ঘরের সন্তানরা যারাই ক্ষমতা বা নিয়ন্ত্রণের কাছাকাছি গেছেন, তাদের অধিকাংশই ঘুষ, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা লুটেরা পুঁজির তল্পিবাহকে পরিণত হয়েছেন। অতি গরিবদের মাঝে মধ্যে দেখেছি লোভী, প্রতিহিংসাপরায়ণ, হীনম্মন্য আর অবিশ্বাসী।
স্যার আবেদ আমাকে এবং সম্ভবত আরো অনেককে ইকোনমিস্ট পত্রিকার একটি প্রতিবেদনের কথা প্রায়ই বলতেন। সম্ভবত এটাই তাকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় প্রণোদিত করেছে। প্রতিবেদনটি কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষকের গবেষণার ভিত্তিতে করা। বিষয়টি ষোড়শ শতাব্দীর বেঁচে থাকা প্রতিষ্ঠান। গবেষক দেখিয়েছেন ৫০০ বছর আগের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৩৩টি এখনো টিকে আছে। তার মধ্যে ২৯টি ইউনিভার্সিটি, দুটি চার্চ, একটি পার্লামেন্ট আর একটি মাত্র বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বা সমাজই বেশি টিকে থাকে, আর জ্ঞান বিতরণেই জ্ঞান বাড়ে। মুনাফাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি দিন টেকে না। স্যার আবেদ প্রতিষ্ঠিত ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হোক জ্ঞানচর্চা ও উন্নততর গবেষণার এক তীর্থকেন্দ্রে।
ব্র্যাক প্রতিষ্ঠাতা এবং গরিবের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পের অন্যতম প্রধান রচয়িতা স্যার আবেদ। অনেকেই বলছেন, যতদিন ব্র্যাক বেঁচে থাকবে, গরিব মানুষ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে, ততদিন বেঁচে থাকবেন স্যার আবেদ। কেউ কেউ বলছেন, বাঙালি রবীন্দ্র-নজরুল ছাড়া কাউকে মনে রাখবে না। আমি মনে করি স্যার আবেদ, অধ্যাপক ইউনূস, ভেলেরি টেইলর এবং আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদসহ অনেকেই মৃত্যুর পরও অনেকদিন বেঁচে থাকবেন; কারণ তারা প্রতিষ্ঠান গড়েছেন, কোনোটাই মুনাফাভিত্তিক নয়। তাদের গড়া প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যত্ই বাতলে দেবে তাদের অমরত্ব।
মামুন রশীদ: অর্থনৈতিক





