সত্তরের নির্বাচন ছিল সন্ধিক্ষণের নির্বাচন। সময়টা ছিল ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর। ওইদিন পাঁচটি প্রদেশে পাকিস্তানের জনগণ জাতীয় পরিষদে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন। জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকার কর্তৃক ইস্যু করা লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্কে আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল যে জাতীয় পরিষদের কাজ হবে প্রথম অধিবেশন থেকে ১২০ দিনের মধ্যে পাকিস্তানের নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করা। তারপর ওই গঠনতন্ত্র বলবৎ করতে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ ইয়াহিয়া খানই চূড়ান্তভাবে গঠনতন্ত্রের অনুমোদন দেবে, যিনি ১৯৬৯ সালে ২৫ মার্চ ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খানের কাছ থেকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নিয়েছিলেন। 

সত্তরের সাধারণ নির্বাচনের তাত্পর্য অস্বীকার করা যাবে না। প্রথমত, ১৯৪৭ সালের আগস্টে নতুন দেশ তৈরির পর পাকিস্তানের ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথম নির্বাচন। দ্বিতীয়ত, একজনের এক ভোট ভিত্তিতে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এর অর্থ হলো মোট জনসংখ্যার ৫৬ ভাগ হওয়ার কারণে পূর্ব পাকিস্তানের আসন সংখ্যা হবে ১৬২, বিপরীতে পশ্চিম পাকিস্তানের (৪৪ ভাগ জনসংখ্যা) আসন সংখ্যা হবে ১৩৮। আবারো এ নির্বাচন, বিশেষ করে বাঙালি জনগোষ্ঠীর জন্য ছিল ভাগ্য নির্ধারণী মুহূর্ত। কেননা এটা ছিল বঙ্গবন্ধু ও তার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার নিরন্তর আন্দোলনের ফল। 

পাকিস্তানে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে ব্যাপকভাবে আশা করা হয়েছিল ১৯৫৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এজন্য সব ধরনের প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছিল। কিন্তু তার আগেই ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। ফলে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা বানচাল হয়। দ্রুতই আইয়ুব খান ইস্কান্দার মির্জাকে অপসারণ করে এবং এক দশক ধরে তিনি পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করে, যখন বাঙালি অধ্যুষিত পূর্ব পাকিস্তান অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে ব্যাপক বৈষম্যের শিকার হয়েছিল। ওই সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর অব্যাহত টার্গেটে পরিণত হয়েছিলেন এবং একটা বড় সময় তাকে জেলে বন্দি করে রাখা হয়েছিল।

পাকিস্তানে পুনরায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরুর অনুমতি দেয়া হয় ১৯৭০ সালের ১ জানুয়ারি এবং একটা নির্বাচনের আভাসও দেয়া হয়। মূলত তখন থেকেই রাজনৈতিক শ্রেণী, দলগুলো তাদের নির্বাচনী প্রচার শুরু করে দেয়। বঙ্গবন্ধুও তার বাইরে নয়। তিনি পরিষ্কারভাবে বুঝেছিলেন, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন-সংক্রান্ত তার দলের ছয় দফার পক্ষে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন গণভোট হিসেবে কাজ করবে। পরবর্তী মাসগুলোয় বঙ্গবন্ধু এবং তার দলের সহকর্মীরা পুরো প্রদেশে ছয় দফার বার্তা ছড়িয়ে দিতে কাজ করেছিল। সবখানে বঙ্গবন্ধু গিয়েছিলেন। গ্রাম, শহর, জেলা-উপজেলা সবখানে অন্য দল ও তাদের কর্মীরাও গিয়েছিলেন। নির্বাচনী প্রচারের সুবাদে সবাই বুঝেছিল, নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগের বিজয় অনিবার্য। 

নির্বাচনী প্রচারের সময় পুরো পাকিস্তানের উভয় অংশের কিছু ডানপন্থী রাজনীতিবিদ নিয়মিতভাবে ছয় দফা দিয়ে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান ভাঙার পরিকল্পনা করছে বলে অভিযোগ করেছিল। বঙ্গবন্ধু তাদের কর্মকাণ্ডে খুব একটা গা-করেননি। এক্ষেত্রে তিনি বেশ ধীর-স্থির ছিলেন। তার মনোযোগ ছিল পূর্ব পাকিস্তানে ভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন। সত্তরের জুনের শেষে তার দলের আরো কয়েকজন নেতাকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু পশ্চিম পাকিস্তান সফর করেছিলেন। ওই সফরে তিনি করাচি, কুয়েতা, পেশোয়ার, লাহোরসহ পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি জায়গায় জনসমাবেশ ও শোভাযাত্রা করেছিলেন। 

নির্বাচনটি অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সেপ্টেম্বর নাগাদ প্রবল বন্যায় পূর্ব পাকিস্তান ব্যাপকভাবে বিধ্বস্ত হয়। ফলে যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। নির্বাচন পেছানোর দাবি ওঠে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ডিসেম্বরে নির্বাচনের নতুন তারিখ ধার্য করা হয়। এর মধ্যে আবার ১২ নভেম্বর সংঘটিত জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ে পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় এলাকায় ১০ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সে সময় ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানি এবং ত্রাণ পাঠানোর বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। উপরন্তু ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য বিদেশ থেকে ত্রাণসামগ্রী এলেও সেসব দুর্গত এলাকায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন অনেক দেরিতে।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সে সময় চীনে রাষ্ট্রীয় সফরে ছিলেন এবং পূর্ব পাকিস্তানে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির কথা শুনেও তার সফর সংক্ষিপ্ত করেননি। কেবল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই আওয়ামী লীগ থেকে ত্রাণ কমিটি গঠন করেছিলেন এবং দুর্গত এলাকায় নিজেই গিয়েছিলেন। সংকটকালে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে ত্রাণ সহায়তা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে না আসার ব্যর্থতা মানুষের ক্ষুব্ধ হওয়ার পক্ষে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল পূর্ব পাকিস্তানকে অবহেলা করার আরেকটি নজির, পশ্চিম পাকিস্তান যা সবসময়ই বাঙালিদের প্রতি দেখিয়ে এসেছে। 

নির্বাচনের কিছুদিন আগে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং তার দল নির্বাচন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। আরো বিস্ময়ের পদক্ষেপ ছিল যে তিনি ৪ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের ‘স্বাধীনতা’ ঘোষণা করেছিলেন। 

৭ ডিসেম্বর যখন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তখন বঙ্গবন্ধু ও তার দল বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশে ১৬২টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ১৬০টি। আর বাকি দুটি আসন পেয়েছিল যথাক্রমে নুরুল আমিন ও চাকমা রাজা ত্রিদীপ রায়। সংরক্ষিত নারী আসনসহ যখন বিজয়ী প্রতিনিধিদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হয়েছিল, তখন স্পষ্ট হলো যে বঙ্গবন্ধু নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ভূমিধস বিজয় লাভ করেছে। জাতীয় পরিষদের মোট ৩১৩টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসন পেয়েছিল। পাকিস্তান পিপলস পার্টি পেয়েছিল ৮৮টি আসন, আর বাকি আসনগুলো ভাগ হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের বাকি দলগুলোর মধ্যে। 

এটা বঙ্গবন্ধুর জন্য ছিল ঐতিহাসিক বিজয়, যাকে এরই মধ্যে পাকিস্তানের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বলা হচ্ছিল। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি রমনা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আওয়ামী লীগ দলীয় সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন। তাদের শপথবাক্য পাঠ করান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নবনির্বাচিত আইনপ্রণেতারা ছয় দফার প্রতি বিশ্বস্ত থাকার শপথ নিয়েছিলেন এবং ছয় দফার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ গঠনতন্ত্র প্রণয়ন নিশ্চিতের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন। সেদিন বঙ্গবন্ধু বিপুল জনস্রোতের সামনে বলেছিলেন, ‘আমরা যদি আপনাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি না রাখি, তাহলে আমাদের জীবন্ত কবর দেবেন।’ বাকিটা ইতিহাস। 

সৈয়দ বদরুল আহসান: রাজনৈতিক বিশ্লেষক