জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা। তার সম্মোহনী নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতায় এ দেশের মানুষ সংগঠিত হয় এবং তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে স্বাধিকার-সংগ্রাম থেকে ক্রমে স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে রক্তের বিনিময়ে অর্জন করে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। এটা একদিনে সম্ভব হয়নি। সেই চল্লিশের দশকে যৌবনের উদ্দীপনাভরা দিনগুলোয় তিনি বাংলার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়ানো শুরু করেন। সাতচল্লিশের দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেও মানুষের দুঃখ-দুর্ভোগের সঙ্গী হতে এবং তাদের সংগঠিত করতে ও সমস্যা-সংকট সমাধানে জেলা, মহকুমা, থানা এমনকি নিভৃত পল্লীতে সফর করতেন। প্রথমে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের নেতা এবং পরে আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হিসেবে সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের কাছে ছুটে গেছেন। বাংলাদেশের এমন কোনো জেলা নেই, যেখানে তিনি ২০-৫০টি বা তার অধিক জনসভা, পথসভা, কর্মিসভা কিংবা শোকসভা করেননি।

  বারবার মানুষের কাছে যাওয়া এবং তাদের সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়ায় তারা তাকে আপন করে নিয়েছিল। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদন, নেতাকর্মীদের ডায়েরি, চিঠিপত্র ও স্মৃতিচারণমূলক লেখার পাতায় পাতায় মফস্বলবাসীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আত্মিক বন্ধনের পরিচয় মেলে। তিনি মফস্বলবাসীর মনে কতটা স্থান পেয়েছিলেন তার অসংখ্য উদাহরণ থেকে একটি উদাহরণ এখানে উল্লেখ করা যায়। সেটা ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের সময়কার কথা। একবার বঙ্গবন্ধু জনসংযোগে যাচ্ছিলেন। তার আগমনের কথা শুনে এক দরিদ্র বৃদ্ধা পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছেন তাকে দেখার জন্য। তিনি সেখানে আসতেই ওই বৃদ্ধা তার হাত ধরে বললেন, বাবা আমার কুঁড়েঘরে তোমাকে একটু বসতে হবে। বঙ্গবন্ধু বৃদ্ধার কথামতো তার বাড়িতে যান। সেখানে গেলে বৃদ্ধা মেঝেতে পাটি বিছিয়ে তাকে বসতে দেন এবং এক বাটি দুধ, একটি পান ও চার আনা পয়সা দেন। এরপর বলেন, বাবা আমি গরিব মানুষ, আমি তোমাকে তেমন সমাদর করতে পারব না, বাটির এই দুধটুকু খাও এবং পয়সা কয়টা নাও। বঙ্গবন্ধু বৃদ্ধার ভালোবাসায় চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি দুধটুকু খেলেন এবং পয়সাগুলোর সঙ্গে আরো কিছু পয়সা যোগ করে বৃদ্ধার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, আপনার দোয়াই আমার জন্য যথেষ্ট। এমনই ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রতি মফস্বলবাসীর ভালোবাসা।

  বঙ্গবন্ধু অল্প বয়স থেকেই সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশার ভাগী হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে তিনি নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল প্রভৃতি স্থানে পথসভা ও জনসভা করেন। রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে জনমত গঠন করতেই মফস্বলের জেলায় জেলায় সফর করেন। এরপর খাদ্য সংকট সমাধানে, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় জনগণকে সংগঠিত করতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে দুর্ভিক্ষপীড়িত ও মুক্তিকামী মানুষের কাছে ছুটে গেছেন। আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি মফস্বলে দলের কমিটি গঠনের কাজ পুরোদমে শুরু করেন। তখনকার দিনে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো ছিল না। এছাড়া মুসলিম লীগের দোর্দণ্ডপ্রতাপে জনসভা ও কর্মিসভা করাও ছিল দুঃসাধ্য ব্যাপার। কঠিন সাহস, দৃঢ় মনোবল ও জনগণের দুঃখ-কষ্ট লাঘবের বাসনা থেকে নানা কর্মসূচি নিয়ে জনগণের কাতারে শামিল হয়েছেন। মুসলিম লীগের শোষণ ও সামরিক শাসক আইয়ুব খানের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি জেল-জুলুম মাথায় নিয়ে মফস্বলবাসীর পাশে দাঁড়িয়েছেন।

  বঙ্গবন্ধুর সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব, দূরদর্শী নেতৃত্ব ও সুনিপুণ সাংগঠনিক দক্ষতায় মুসলিম লীগের প্রবল প্রতাপের কালে পূর্ববঙ্গের মানুষ বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার পতাকাতলে সমবেত হয়। ভাষা আন্দোলনের পর সাংগঠনিক কাজের অংশ হিসেবে তিনি পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন স্থানে সফরে বের হন। ১৯৫২ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকা থেকে যাত্রা করেন। ট্রেনযোগে প্রথমে রংপুরে পৌঁছান এবং পর্যায়ক্রমে দিনাজপুর, রাজশাহী, বগুড়া ও পাবনার জনসভা ও কর্মিসভায় ভাষণ দেন। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫২ সালের ২০ আগস্ট ভোর ৪টায় সদলবলে রাজশাহী থেকে পাবনা অভিমুখে রওনা হন এবং সকাল সাড়ে ৮টায় তিনি ঈশ্বরদী থেকে ট্যাক্সিযোগে পাবনায় পৌঁছান। পাবনায় পৌঁছে অবস্থান করেন শহরের শিবরামপুর মহল্লার মাজহারুল হকের বাসভবনে। এখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে এবং প্রাতরাশ সম্পন্ন করে সাংগঠনিক কাজে বের হন। প্রথমেই যান পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জামাতা অ্যাডভোকেট আবদুস সবুরের বাসভবনে। তারপর ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর বাসভবনে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওইদিন বিকাল ৫টা ৪০ মিনিটে পাবনা টাউন হলে আয়োজিত এক জনসভায় বক্তৃতা করেন। তিনি পাটের কম মূল্য, শিক্ষার প্রতি সরকারের উদাসীনতা, নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ ইত্যাদি বিষয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। এছাড়া মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, নূরুল আলম এবং অন্যান্য বাজবন্দির মুক্তির দাবি করেন। শেখ মুজিবুর রহমান উপস্থিত জনতাকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের পতাকাতলে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানান এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শামিল হতে বলেন। জনসভা শেষে রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে পাবনা টাউন হলে কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে প্রায় ৫০ জন ছাত্রের উপস্থিতিতে একটি সাংগঠনিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় শেখ মুজিবুর রহমান বক্তৃতা করেন। এরপর রাত ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় পাবনা শহরের শিবরামপুর মহল্লার মাজহারুল হকের বাসভবনে। এতে শেখ মুজিবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন এবং পাবনায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের কমিটি গঠনের বিষয়ে আলোচনা করা হয়। ২০ আগস্ট গভীর রাতে অর্থাৎ ২১ আগস্ট প্রথম প্রহরে তিনি সফরসঙ্গীদের নিয়ে পাবনা ত্যাগ করেন। রাত ২টা ৪৫ মিনেটে ট্যাক্সিযোগে ঢাকার পথে রওনা হতে ঈশ্বরদী অভিমুখে যাত্রা করেন। এ সফরে এসেই বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের পাবনা জেলা কমিটি গঠন করেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন: ‘আতাউর রহমান সাহেব ও আমি পাবনা, বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুরে প্রোগ্রাম করলাম। নাটোর ও নওগাঁয় কমিটি করতে পেরেছিলাম, কিন্তু রাজশাহীতে তখনো কিছু করতে পারিনি।...থাকার জায়গা পাওয়া কষ্টকর ছিল। পরে ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও আবদুর রব বগাকে দিয়ে একটা কমিটি করলাম। অন্য কোনো লোক পাওয়া গেল না বলে কয়েকজন ছাত্রের নাম দিয়ে দিলাম। পাবনায় ছাত্রলীগের কর্মীরা ২ ঘণ্টার নোটিসে এক সভা ডাকল টাউন হল মাঠে। মাইক্রোফোন ছিল না। আমি ও আতাউর রহমান সাহেব মাইক্রোফোন ছাড়াই সভা করলাম।’ এভাবেই বঙ্গবন্ধু মফস্বলে তার প্রিয় দল আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করেন।

  চুয়ান্নর নির্বাচনে গণজোয়ার সৃষ্টির লক্ষ্যে ২১ দফা কর্মসূচি নিয়ে ছুটে গেছেন জনগণের কাছে ভোট চাইতে। পরবর্তীকালে আইয়ুব খানের সেনা শাসনের কবল থেকে গণতন্ত্রকে মুক্ত করতে মফস্বলে বহু জনসভা করেছেন। বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা কর্মসূচি প্রচারে জনগণের দ্বারে দ্বারে হাজির হয়েছেন। এসব কর্মসূচিতে মফস্বলবাসীর কাছে পান অভাবনীয় সাড়া। ছয় দফায় বৃহত্তর গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলে মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের নিশ্চয়তা বিধানের কথা বলা হয়। এ কর্মসূচির পক্ষে জনমত গঠনের লক্ষ্যে শেখ মুজিবুর রহমান দেশের বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ করেন। ছয় দফা সম্পর্কিত প্রথম প্রকাশ্য জনসভা করেন চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে। এরপর নোয়াখালী, ময়মনসিংহ, সিলেট অঞ্চলে জনসভা করে ১৯৬৬ সালের এপ্রিলে উত্তরবঙ্গে সফর শুরু করেন। ওই বছর ৭ এপ্রিল তিনি নগরবাড়ী ঘাটে জনসভা করেন। তার আসার খবর পেয়েই সকাল থেকে হাজার হাজার মানুষ জমায়েত হতে থাকে। কলাগাছ আর কাগজের ফুল দিয়ে তোরণ নির্মাণ করা হয়। ঘাটের শ্রমিকেরা তো ছিলই, আশপাশের গ্রাম থেকে এল সাধারণ মানুষ। সফরসঙ্গীদের নিয়ে বঙ্গবন্ধু ‘গোমতী’ ফেরি থেকে নামতেই উপস্থিত নেতারা তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। জনতার করতালিতে আনন্দ উছলে পড়ে। স্লোগানে স্লোগানে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়। ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘ছয় দফা মানতে হবে, নইলে গদি ছাড়তে হবে’, ‘শেখ মুজিবের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’ প্রভৃতি স্লোগান যেন যমুনার উত্তাল তরঙ্গের সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু হাত নেড়ে উচ্ছ্বসিত জনতার অভ্যর্থনার জবাব দেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে জমায়েত হয় নগরবাড়ী ঘাটের দু-তিন হাজার শ্রমিক। নেপাল সর্দার নামের এক বয়স্ক শ্রমিক শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে স্লোগান দেন। স্লোগান দিয়ে তিনি মাতিয়ে দেন। এক নেতার সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে নেপাল সর্দার বলেন, ‘ওই ব্যাটা (শেখ মুজিবুর রহমান) পারবে। দেখতে একেবারে রাজার লাহান। মোচটাও মানানসই। আইয়ুব খান হঠাতে এই ব্যাটাই পারবে।’ এমনই আস্থা অর্জন করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। বাস্তবেই তিনি সবার বিশ্বাস ও আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। তাকে ঘিরেই জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়। সেই ঐক্যের সুর লহরি বেজে ওঠে নগরবাড়ী ঘাটের শ্রমিক জনতার মুহুর্মুহু স্লোগানে।

১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে আসাদ, মতিউর ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহার হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সমস্ত পূর্ব বাংলা রুষে ফেটে পড়লে আইয়ুব শাহির পতন ঘটে এবং বঙ্গবন্ধু বন্দিশালা থেকে মুক্তি লাভ করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নৌকা ও স্বাধীনতার পক্ষে ভোট চাইতে বঙ্গবন্ধু বারবার ছুটে গেছেন গণমানুষের কাছে। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে সর্বস্তরের মানুষ আওয়ামী লীগকে নিরঙ্কুশভাবে বিজয়ী করেছে। সর্বোপরি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তার নেতৃত্বকে শিরোধার্য করেই। দেশ স্বাধীন হলে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের উন্নয়নে তিনি বিশেষ উদ্যোগ নেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় বোমাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্রিজ ও রাস্তাঘাট পুনঃসংস্কারে ত্বরিত ব্যবস্থা নেন। বন্যার কবল থেকে দেশবাসীকে রক্ষার জন্য স্বহস্তে মাটি কেটে উদ্বোধন করেন বাঁধ নির্মাণের কাজ। নদীপাড়ের মানুষদের রক্ষা করতেও একই ব্যবস্থা নেন। সময় সময় দাঁড়িয়েছেন বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে। স্বাধীনতার আগে, ১৯৭০ সালের ৬ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সিরাজগঞ্জ মহকুমার কাজিপুরে গিয়ে বন্যাদুর্গত মানুষদের সমবেদনা জানান এবং ত্রাণসামগ্রী প্রদান করেন। দৈনিক আজাদ পত্রিকায় বলা হয়: ‘পূর্ব পাকিস্তানকে বন্যার করাল গ্রাস হইতে রক্ষার ব্যাপারে অবিলম্বে বন্যা নিয়ন্ত্রণের যথাযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান তাহার দাবীর পুনরাবৃত্তি করেন। সিরাজগঞ্জ মহকুমার বন্যাকবলিত এলাকায় সফরকালে আওয়ামী লীগপ্রধান গতকাল এখানকার কাজিপুরে এক গণসমাবেশে উপরোক্ত দাবী জানান। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতার জন্য তিনি পূর্ববর্ত্তী সরকারগুলিকে দায়ী করেন। এ ব্যাপারে বিগত দিনের সরকারগুলির উপর দোষারোপ করিয়া শেখ মুজিবুর রহমান উপর্যুপরি বন্যার আক্রমণ হইতে প্রদেশকে রক্ষা করিবার ব্যাপারে

অবিলম্বে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করিবার জন্য বর্তমান সরকারের প্রতি আবেদন জানান। জনাব সোহরাওয়ার্দীর আমলে আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক নিযুক্ত ক্রুগ মিশন প্রদত্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আওয়ামী লীগ প্রধান জোর দাবী জানান।’ যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে মফস্বলবাসীকে সম্পৃক্ত করতে তিনি অনেক জনসভা করেছেন। ১৯৭৩ সালের ২৬ জানুয়ারি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনি সিরাজগঞ্জ সফরে যান। সিরাজগঞ্জ কলেজ মাঠে একটিসহ মোট তিনটি জনসভায় ভাষণ দেন। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নিজের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে দেশের, দশের ও মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগের আহ্বান জানান। সিরাজগঞ্জ কলেজ মাঠের ওই জনসভায় তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ গড়ায় দেশবাসীর প্রতি নানা নির্দেশনা দেন। সাহায্যনির্ভর জাতি নয়, পরিশ্রমী ও স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে বলেন।

অনেক সময় বঙ্গবন্ধু ছুটে গেছেন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধার মৃত্যুতে শোক জানাতে। কখনো বিপদগ্রস্ত কর্মীর সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। ১৯৭০ সালে সিরাজগঞ্জের প্রত্যন্ত পল্লী চৌহালির দিঘলকান্দির জনসভা থেকে ফেরার পথে তিনি জনতার জটলা দেখে থামেন। কারণ জানতে চাইলে বাবলু নামে বঙ্গবন্ধুর এক কর্মী জানান, আব্দুল হাই নামক এক ব্যক্তিকে সাপে কামড় দিয়েছে। তখন সেই সাপে কাটা ব্যক্তিকে নিজের গাড়িতে তুলে কোলের ওপর শুইয়ে রাত সাড়ে ৩টায় সিরাজগঞ্জ হাসপাতালে পৌঁছান। হাসপাতালে ডাক্তার না পেয়ে তাকে বাড়ি থেকে ডেকে আনেন এবং নিজে গিয়ে ইনজেকশন কিনে এনে রোগীর শরীরের পুশ করার কর কিছুটা সুস্থ হলে আব্দুল মমিন তালুকদারের ভায়রা মফিজ তালুকদারের বাসভবনে গিয়ে বিশ্রাম নেন। বঙ্গবন্ধু কতটা পরিশ্রমী, কর্মিবান্ধব ও মানবদরদি ছিলেন চৌহালির এ ঘটনা থেকে তার কিঞ্চিৎ ধারণা পাওয়া যায়। ১৯৭৩ সালে তিনি পাবনায় গিয়েছিলেন প্রিয় বন্ধু আবদুর রব বগা মিয়াকে চিরবিদায় জানাতে। সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণকারী দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহচর বগা মিয়ার নিথর দেহ দেখে তিনি শিশুর মতো কেঁদেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ট্র্যাজেডির পর বাংলাদেশের মানুষ গভীর শোকে মুহ্যমান হয়, স্থানে স্থানে প্রতিবাদ করে। তার শোকার্ত অনেক ভক্ত বছরের পর বছর রোজা পর্যন্ত রেখেছেন। জাতির পিতা ও প্রাণপ্রিয় নেতাকে হারিয়ে তারা যেন দিশেহারা হয়ে পড়েন। তবে শত জুলুম-নির্যাতনের মধ্যেও মফস্বলবাসী বঙ্গবন্ধুকে ভুলতে পারেনি; তার আদর্শ বুকে লালন করে জাতীয় দুর্যোগের দিনেও অন্ধকারের আলোর সন্ধান করেছে। তারা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি হূদয়ের মণিকোঠায় অম্লান করে রেখেছে। ১৯৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক বৈরী পরিবেশে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মানুষ তার জীবন ও আদর্শ প্রচার করেছে।

  রাজনীতিবিদ ও সংগঠক হিসেবে ব্যাপক দক্ষতা, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এবং সম্মোহনী নেতৃত্ব দ্বারা হাজার বছরের একটি পরাধীন জাতিকে তিনি জাগিয়ে তুলেছিলেন। মুসলিম লীগ সরকারের প্রবল প্রতাপের কালে জেল-জুলুম-হুলিয়া মাথায় নিয়ে তিনি বারবার দেশের নানা প্রান্তে ছুটে গেছেন। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে মফস্বলের কৃষক-শ্রমিক, মেহনতি মানুষকে সংগঠিত করেছেন এবং আওয়ামী লীগের পতাকাতলে সমবেত করেছেন। প্রাণের আবেগ ও সীমাহীন ভালোবাসা উজাড় করে তাদের সুখ-দুঃখের ভাগী হয়েছেন। এমন জনদরদি নেতা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

 

ড. এম আবদুল আলীম: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়