এক মাসের রোজা শেষে ঈদুল ফিতর মুসলমানদের কাছে আসে আনন্দের বার্তা নিয়ে। ঈদের নামাজ পরার পর মানুষ তখন প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের বাসাবাড়িতে বেড়াতে যায়। প্রত্যেকের ঘরে ঘরে তৈরি হয় প্রাত্যহিক সময়ের চেয়ে অধিকতর ভালো খাবার। মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার এ মেলবন্ধনকে আরো রাঙিয়ে তুলতে ভৌগোলিক কৃষ্টি ও খাদ্যাভ্যাস সামনে রেখে বাসাবাড়িতে প্রস্তুত করা হয় রসনাবিলাসী খাবার। আর এজন্যই প্রয়োজন পড়ে এসব খাবার তৈরির উপকরণ সংগ্রহের। ঈদের নতুন পোশাক ক্রয়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ মসলা, ড্রাই ফ্রুটসসহ বিভিন্ন খাবারের উপকরণও কিনে নেয় স্থানীয় বাজার থেকে।

মূলত ঈদুল ফিতর সামনে রেখে মজুদ থাকলেও নতুন মসলা ক্রয় করেন গৃহস্থ। এ সময়ে মসলা সংগ্রহের ক্ষেত্রে পরবর্তী ঈদুল আজহার বিষয়টিও মাথায় রাখে সাধারণ মানুষ। গ্রামবাংলায় আগেকার দিনে ঈদুল ফিতরের সময় মরিচ, হলুদ, গরম মসলার বিভিন্ন উপকরণ আস্ত কিনে মেশিনে ক্রাশিং করে রাখা হতো। এ মসলা গ্রামীণ পদ্ধতিতে সংরক্ষণের মাধ্যমে সেটি ঈদুল আজহা পর্যন্ত চালিয়ে নিতেন গৃহিণীরা। সময় পাল্টেছে, এখন প্রায় সবকিছুই বিভিন্ন কোম্পানির মোড়কে পাওয়া যায়। ফলে নগরজীবন কিংবা গ্রামীণ সমাজেও প্যাকেটজাত মসলা কিংবা ড্রাই ফ্রুটসের পণ্য সহজেই সংগ্রহ করে নিতে পারেন একজন ক্রেতা।

দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ। চাক্তাই, আছদগঞ্জ, বক্সিরহাটসহ খাতুনগঞ্জ বাজার মসলাসহ দেশের প্রায় সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের প্রধানতম বাজার। এখানকার বাজারে খুচরা-পাইকারি পর্যায়ে বিকিকিনি চলছে মসলাসহ ঈদের বিভিন্ন পণ্যের। এখান থেকেই মসলাসহ বিভিন্ন ঈদের পণ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ছে সারা দেশের পাইকারি বাজার হয়ে শহর, গ্রামে। মসলা পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় হলুদ, মরিচ, জিরা, দারুচিনি, লবঙ্গ, গোলমরিচ। এছাড়া হাজার রকমের মসলাসহ ড্রাই ফ্রুটস বিক্রি হয় এ সময়ে।

ঈদের বাজার সামনে রেখে বিক্রি হওয়া মসলা পণ্যের মধ্যে ভারতীয় জিরা কেজিপ্রতি ৪০০ টাকা, সিরিয়ান জিরা ৪২০-৪৫০, এলাচ মানভেদে কেজিপ্রতি ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার, গোলমরিচ ৬০০-৬৫০, দারুচিনি ৩২০-৩৫০, ধনিয়া ১২০-১৪০, সরিষা ১০০-১২০, মেথি ১২০-১৫০, তেজপাতা ১২০-১৫০, মিষ্টি জিরা ১৮০-২০০, কালিজিরা ৩২০-৩৫০, মরিচ কেজিপ্রতি ১৬০-২৫০ এবং হলুদ ১২০-১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। 

অধিক ব্যবহূত মসলা ছাড়াও ঈদের নানা পদের খাবার তৈরিতে প্রয়োজন হয় বিশেষায়িত, অর্থাৎ অপ্রচলিত ও দামি মসলার। এর মধ্যে রয়েছে জয়ত্রী। জয়ত্রী প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়, জায়ফল ৬০০ থেকে ৬৫০, রাঁধুনি ২০০-২৫০, শাহি জিরা ৮০০-৯০০ ও পোস্তদানা বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকায়। অন্যদিকে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি মসলা জাফরান বিক্রি হয় গ্রামপ্রতি ১০০ থেকে ৫০০ টাকায়। দাম বেশি হলেও এসব মসলা খাবার তৈরিতে পরিমাণে কম ব্যবহার হয়। 

ঈদ মৌসুমে মজাদার খাবার তৈরিতে মসলা ছাড়াও ড্রাই ফ্রুটসের ব্যবহার সমধিক। মিষ্টিজাতীয় খাবার প্রস্তুত, বিরিয়ানিসহ অঞ্চলভেদে খাবারের ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির কারণেও ড্রাই ফ্রুটস ব্যবহার হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় নারকেল, বাদাম ও কিশমিশ। বাদামের মধ্যে রয়েছে হরেক ভ্যারাইটি। অর্থাৎ সাধারণ চীনা বাদাম ছাড়াও বাজারে রয়েছে কাঠ বাদাম, কাজু বাদাম, পেস্তা বাদাম। মূলত ফিরনি, পায়েস, সেমাইসহ মিষ্টিজাতীয় খাবার তৈরিতে এসব বাদামের ব্যবহার হয়। এছাড়া পোলাও কিংবা কাচ্চি বিরিয়ানিজাতীয় খাবারেও বাদামের ব্যবহার বেশি। বাদাম ছাড়াও আলুবোখরা (মিষ্টি ও টক) ব্যবহার হয়। বাজারে ঈদের আগেই রমজানের শুরুতে ইফতারির জন্য খেজুরের ব্যবহার রয়েছে দেশে। রোজার সময়ে খেজুরের দামও বেড়ে যায়। তবে ঈদের আগে প্রায় সব প্রজাতির খেজুরের দাম সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসে। এ কারণে ঈদের খাবার তৈরি কিংবা খাবারের উপকরণ হিসেবেও খেজুরের ব্যবহার হয়।

দেশে খাদ্যপণ্যে ব্যবহারের জন্য সর্বাধিক প্রচলিত চীনাবাদাম। চীনাবাদাম সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য হওয়ায় এর ব্যবহার হয় বেশি। গ্রামে-গঞ্জে চীনাবাদামই ব্যবহার করে সেমাই, ফিন্নি, পায়েস রান্নার জন্য। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন ধরনের বাদামের ব্যবহার ক্রমে বাড়ছে। একসময় কাজুবাদাম বিদেশ থেকে আমদানি করা হলেও বর্তমানে দেশেই উৎপাদন হচ্ছে কাজুবাদাম। বর্তমান বাজারে খোসাযুক্ত চীনাবাদাম বিক্রি হচ্ছে ১২০-১৩০ টাকায়। তবে খোসাবিহীন বাদাম বিক্রি হচ্ছে ১৬০-১৭০ টাকা কেজি দরে। অন্যদিকে মিষ্টি আলুবোখারা কেজিপ্রতি ২৫০-৩০০ টাকায়, টক আলুবোখারা ৪০০-৪৫০, কিশমিশ ৩৩০-৩৫০, কালো কিশমিশ ৬৫০-৭০০, কাঠবাদাম ৬৮০-৭০০, পেস্তাবাদাম ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০, কাজুবাদাম মানভেদে ৮০০-৯০০, আখরোট ৯০০ থেকে ১ হাজার ও নারকেল জোড়া ১০০-১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এসব ছাড়াও ঈদের জন্য মানুষের ঘরে ঘরে থাকে বিভিন্ন ধরনের সেমাই, নুডলস, পেস্তা। এর জন্য লাগে ইস্ট, টেস্টিং সল্ট, সাগু, সুগন্ধি চাল, বিভিন্ন ধরনের সস, চিনি, গুঁড়ো দুধ, কনডেন্স মিল্ক।

মসলাজাতীয় পণ্যের মধ্যে হলুদ, মরিচ, জিরা, ধনিয়া, গরম মসলা গুঁড়ো বিভিন্ন আকারে মোড়কজাতকারী কোম্পানি বিক্রি করে। একসময় ৫০ গ্রাম ও ১০০ গ্রামের প্যাকেটে বিক্রি হলেও বর্তমানে ১০ থেকে ১৫ টাকার প্যাকেটেও বিক্রি হয় এসব মসলা গুঁড়ো। সুপারশপ ছাড়া আস্ত মসলা প্যাকেট আকারে তেমন একটা পাওয়া যায় না। বাজারের মুদি দোকান ছাড়াও বর্তমানে পাড়া-মহল্লার দোকানে খোলা আস্ত মসলা বিক্রি হয়। বছরের যেকোনো সময়ের তুলনায় ঈদের আগে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ মসলা ও ড্রাই ফ্রুটসের পণ্য কেনেন বিধায় ক্রেতারা পাড়া-মহল্লার চেয়ে বাজারের বড় দোকান কিংবা পাইকারি বাজার থেকেই এসব পণ্য কিনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।