আধুনিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে ফ্রিজ। ছোটবড় সব পরিবারেই এখন ফ্রিজ একটি অতিপ্রয়োজনীয় যন্ত্র হয়ে উঠেছে। ফ্রিজই বর্তমানের শহুরে জীবনকে করে তুলেছে সহজ। যেখানে শহরগুলো ধীরে ধীরে বড় হয়ে যাচ্ছে এবং মানুষ খাবারের উৎস থেকে দূরে সরে যাচ্ছে সেখানে ফ্রিজের কোনো বিকল্প নেই। কারণ এসব খাবার পথে বহনের সময়ে এবং বাসায় নেয়ার পর ঠিক রাখতে হলে অবশ্যই সেগুলো ঠাণ্ডায় রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। সেই কাজটাই করছে ফ্রিজ।

একটা সময় ছিল যখন দেশে ব্যবহূত ফ্রিজগুলো আমদানি করা হতো। এখন সেই জায়গায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে দেশীয় বিভিন্ন ব্র্যান্ড। ফলে যেমন ফ্রিজ অনেক বেশি সহজলভ্য হয়েছে জনসাধারণের কাছে তেমনি বিস্তৃত হয়েছে এর বাজারও। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে প্রতি বছর ৩০-৪০ লাখ ফ্রিজ বিক্রি হচ্ছে। ফলে এ খাতে কর্মক্ষেত্রও বেড়েছে ব্যাপক হারে।

দেশে ফ্রিজের বাজার সম্প্রসারণে প্রথম পদক্ষেপটি নেয় ওয়ালটন গ্রুপ। দেড় দশক আগে দেশে ফ্রিজ উৎপাদন শুরু করে তারা। এর আগ পর্যন্ত পণ্যটি ছিল মূলত আমদানিনির্ভর। ফলে তা কিনতে দামও বেশি দিতে হতো। ওয়ালটন সেই হিসেবে তুলনামূলক কম দামে পণ্যটি সরবরাহ করায় তা অনেকের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে চলে আসে।

পরে ধীরে ধীরে দেশে ফ্রিজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ে। অনেকেই এগিয়ে আসায় সরকারও যথাযথ নীতিসহায়তা দেয়ার চেষ্টা করে। ধীরে ধীরে ফ্রিজের আমদানিনির্ভরতা কমে। তাতেই পণ্যটির বর্তমান বাজারে দেশীয় কোম্পানিগুলোর রাজত্ব বাড়ে। বেশকিছুটা পথ পেরিয়ে এখন দেশের চাহিদা মিটিয়ে পণ্যটি রফতানিও করছে একাধিক প্রতিষ্ঠান। তাছাড়া জনসাধারণের জন্য ইএমআই বা কিস্তিতে নেয়ার সুবিধা নিয়ে আসায় এখন ঘরে ঘরে অনেক সহজলভ্য হয়ে উঠেছে ফ্রিজ ।

২০২১ সালে প্রকাশিত মার্কেটিং ওয়াচ বাংলাদেশের (এমডব্লিউবি) এক গবেষণা বলছে, দেশের ফ্রিজের বাজারের বেশিরভাগই দেশীয় ব্র্যান্ডের দখলে। এর মধ্যে এককভাবে দেশী ব্র্যান্ড ওয়ালটনের দখলে অনেকখানি অংশ। বাকিগুলো যমুনা, মার্সেল, ভিশন, মিনিস্টারসহ অন্যদের দখলে। আর বিদেশী ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে কনকা, সিঙ্গার, শার্প, স্যামসাং, এলজি উল্লেখযোগ্য।

বাংলাদেশে প্রায় দুই দশক ধরে ফ্রিজের বাজার দ্রুতগতিতে বাড়ছে। পণ্যটি ব্যবহারের হার শহরের চেয়ে গ্রাম ও উপশহরগুলোয় এখন অনেক বেশি হারে বাড়ছে। মধ্য ও উচ্চবিত্তের দ্রুত বিকাশ, ছোট পরিবার ও নারী কর্মজীবীর সংখ্যা বেশি পরিমাণে বেড়ে যাওয়া, গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে উপশহরীকরণ প্রক্রিয়া, কম খরচে দেশীয় ফ্রিজ কেনার সক্ষমতা এবং ফ্রিজ বিক্রেতাদের ক্রেতাবান্ধব শর্তাবলি (যেমন কিস্তিতে ক্রয়, ওয়ারেন্টি ইত্যাদি) ফ্রিজ মার্কেট প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা পালন করছে।

এমডব্লিউবির ওই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, ২০১৯ সালে দেশে প্রায় ৩২ লাখ ফ্রিজ বিক্রি হয়েছে। ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশের ফ্রিজের বাজার বিদেশী ব্র্যান্ডগুলো নিয়ন্ত্রণ করত। তথ্য বলছে, বর্তমানে ফ্রিজের বাজারের আকার প্রায় ৬৮ কোটি ডলারের। চলতি বছর তা বেড়ে ৮৮ কোটি ডলার বা সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে বলে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে।

সাধারণত ক্রেতারা ফ্রিজ কেনার সময় দাম, স্থায়িত্ব, বিদ্যুৎ সাশ্রয়, কম্প্রেসর, বিক্রয়োত্তর সেবা, নকশা ও আধুনিক প্রযুক্তির বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন। অন্যদিকে ফ্রিজ থেকে পানি বের হওয়া, কম্প্রেসারের বাড়তি শব্দ, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ, বেশি বরফ জমা, নির্দিষ্ট সময় পরপর কম্প্রেসারের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া নিয়ে অভিযোগ করতেও দেখা যায় অনেককে। তবে এমডব্লিউবির গবেষণা বলছে, অপেক্ষাকৃত কম দামে মোটামুটি ভালো মানের ফ্রিজ তৈরিতে সক্ষম হওয়ার কারণেই দেশীয় ব্র্যান্ডের ফ্রিজগুলো জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

যদিও ফ্রিজের এ রমরমা বাজারে কিছুটা ভাটা দেখা গিয়েছিল নভেল করোনাভাইরাস পরিস্থিতির সময়ে। সে সময় ফ্রিজ বিক্রি কিছুটা কমে গেলেও প্রতি বছর গড়ে ১৫ শতাংশ হারে পণ্যটির বাজার বড় হচ্ছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

দেশীয় বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ডের মধ্যে এ খাতে সবচেয়ে আগে কাজ শুরু করে ওয়ালটন। তারাও আমদানির মাধ্যমেই তাদের যাত্রা করে। পরে ২০০৫ সালের শেষ দিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব কারখানা গড়ে তোলে। সেখানে ২০০৮ সালে ফ্রিজ উৎপাদন শুরু হয়। ২০১৭ সালে তারা সেখানে কম্প্রেসর উৎপাদন করা শুরু করে। দেশের বাজারে এখন ফ্রিজের চাহিদা মেটাতে বেশ ভালো ভূমিকা রেখে চলছে ওয়ালটন। শুধু তা-ই নয়, এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ওয়ালটনের তৈরি করা ফ্রিজ রফতানিও হচ্ছে।

২০১৪ সালে ফ্রিজের ব্যবসা শুরু করে প্রাণ-আরএফএল। দেশে তাদের বাজারজাত করা ফ্রিজের ব্র্যান্ডটির নাম ভিশন। এছাড়া ভারত ও নেপালে ফ্রিজ রফতানিও শুরু করেছে তারা। নরসিংদীর ডাঙ্গা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে আরএফএল ইলেকট্রনিকস লিমিটেডের ভিশন রেফ্রিজারেটরের কারখানা রয়েছে। সেখানে ইতালিয়ান প্রযুক্তির অত্যাধুনিক মেশিনে ভিশন ফ্রিজ উৎপাদন হয়। ভিশন ফ্রিজ তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছেন ১ হাজার ১০০ কর্মী। কারখানাটির দৈনিক দেড় হাজার ফ্রিজ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে।

দেশের বাজারে যেসব ফ্রিজের প্রবল চাহিদা রয়েছে সেই তালিকায় রয়েছে যমুনা ইলেকট্রনিকস। ২০১৪ সাল থেকে যমুনা ফ্রিজ বিক্রি করছে প্রতিষ্ঠানটি। ঈদ সামনে রেখে প্রতিষ্ঠানটির ৬০ হাজার ফ্রিজ বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

দেশীয় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পাশাপাশি বিদেশী ব্র্যান্ডের উৎপাদিত পণ্যও দেশের বাজারে ছড়িয়ে রয়েছে। সাধারণত দেশীয় ব্র্যান্ডের উৎপাদন করা পণ্যগুলোর চাহিদা বেশি দেখা যাচ্ছে গ্রামাঞ্চল ও উপশহরগুলোয়। অন্যদিকে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর প্রতি শহরের মানুষের আকর্ষণ বেশি দেখা যাচ্ছে।

দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে চীনা ব্র্যান্ডের কনকা ফ্রিজ। তাদের পণ্য দেশে উৎপাদন করছে ইলেক্ট্রো মার্ট। সোনারগাঁয়ে স্থাপিত কারখানায় কনকার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ড হাইকোর ফ্রিজও উৎপাদন করছে। বর্তমানে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বার্ষিক তিন লাখ। এই ফ্রিজে রয়েছে ব্লু জোন অ্যান্ড ভিটামিন ফ্রেশ টেকনোলজি। ফলে ফ্রিজের ভেতরেও ফলমূল এবং সবজিজাতীয় খাবার থাকবে ফ্রেশ ও ভিটামিনসমৃদ্ধ। ফলমূল ও সবজির গুণাগুণও ঠিক থাকবে দীর্ঘদিন। এছাড়া অ্যাক্টিভ কার্বন ডিওডোরাইজার থাকায় ফ্রিজের ভেতরে সংরক্ষণ করা খাবারের একটির গন্ধ অন্য খাবারে মিশ্রিত হয়ে যায় না। এছাড়া কনকা ফ্রিজের সবজি বক্সে হিউমিডিটি কন্ট্রোলার নামে একটি টেকনোলজি আছে, যার কারণে সবজি সতেজ রাখার জন্য যতটুকু হিউমিডিটি দরকার ততটুকুই প্রবেশ করে। এ ফ্রিজে রয়েছে ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ড মানের অ্যান্টিফাঙ্গাল ডোর গ্যাসকেট, যার কারণে বাইরের কোনো ফাঙ্গাল ও জীবাণু ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। এতে কুলিং লসও হয় না। ডিজিটাল ডিসপ্লে টেকনোলজি ও ইলেকট্রনিকস কন্ট্রোল সিস্টেমের মাধ্যমে বাইরে থেকে ফ্রিজের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ফ্রিজে থাকা ডিজিটাল ডিসপ্লে ইনভার্টার টেকনোলজির কারণে ৭১ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে। তাছাড়া কনকা ডিপ ফ্রিজারে থাকা অটো কনভার্সন টেকনোলজির মাধ্যমে ব্যবহারকারী যেকোনো সময় ডিপ ফ্রিজারকে নরমাল রেফ্রিজারেটরের মতো কনভার্সন করে ব্যবহার করতে পারবেন। এছাড়া সুপার কুল মোড ব্যবহার করে অনেক বেশি পরিমাণ খাবারকে মাত্র ১৫ মিনিটে আইস করে খাবারের গুণ ও মান সংরক্ষণ করাও যাবে।

বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড স্যামসাং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দেশে ফ্রিজ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করছে ফেয়ার ইলেকট্রনিকস। এছাড়া ট্রান্সকম, বাটারফ্লাই, র্যাংগস ও ইলেক্ট্রা ইন্টারন্যাশনালও স্যামসাংয়ের পণ্য বাজারজাতের সঙ্গে যুক্ত আছে। গত বছর স্যামসাং ৬৫ হাজার ফ্রিজ বিক্রি করেছে। তার আগের বছর তাদের বিক্রি ছিল ৩৫ হাজার। বর্তমানে স্যামসাং যে পরিমাণ ফ্রিজ বিক্রি করছে তার ৯০ শতাংশই দেশে উৎপাদিত। কিন্তু তার পরও তাতে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা হয় বলেই নিশ্চিত করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

সামনেই ঈদ। এ সময়ে গরমও তীব্র। তাই ফ্রিজ বিক্রি আরো বাড়বে বলেই প্রত্যাশা করা হচ্ছে। দেশে তিন ধরনের ফ্রিজ বিক্রি হয়। এমডব্লিউবির গবেষণার তথ্য বলছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় বাজার ফ্রস্ট ফ্রিজের। এর অংশ প্রায় ৮৫ শতাংশের কাছাকাছি। নন ফ্রস্ট ৮ দশমিক ৩৩ ও চেস্ট বা ডিপ ফ্রিজ ৬ দশমিক ৭ শতাংশের মতো বিক্রি হয়।

জেলা শহর থেকে শুরু করে একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এখন ফ্রিজের চাহিদা বাড়ছে। অন্যদিকে রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরের ক্রেতাদের মধ্যে তীব্র আকর্ষণ উপলব্ধি করা যাচ্ছে সর্বশেষ আধুনিক প্রযুক্তির প্রতি। পুরনো ফ্রিজ বদলে নতুন কেনার প্রবণতাও অনেক বেড়েছে। সব মিলিয়ে আরো বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে এ বাজারের। তবে দেশে এসব পণ্য উৎপাদনে উৎসাহিত করতে সরকার যেসব নীতিসহায়তা দিচ্ছে, সেটি আরো বেশ কয়েক বছর অব্যাহত রাখার আহ্বান খাতসংশ্লিষ্টদের। তাহলে যেমন বিদেশী বিনিয়োগকারীরা উৎসাহিত হবে, তেমনি দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের বিনিয়োগ তুলতে সক্ষম হবে।