বাংলাদেশে একসময় বন্ধ্যাত্ব সমস্যার আধুনিক সমাধান সহজলভ্য ছিল না। এক্ষেত্রে বিশ্বের আধুনিক বিভিন্ন চিকিৎসা চালু হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশেও বিভিন্ন আধুনিক পদ্ধতির মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান পাওয়া যাচ্ছে। এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এনাম আইভিএফ অ্যান্ড ইনফার্টিলিটি সেন্টার চালু করা হয়েছে। এ কেন্দ্রে আইভিএফসহ নানা আধুনিক পদ্ধতির মাধ্যমে বন্ধ্যা দম্পতি সন্তান গ্রহণ করতে পারছে। এ বিষয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন এনাম আইভিএফ অ্যান্ড ইনফার্টিলিটি সেন্টারের কনসালট্যান্ট ডা. মাকসুদা আশরাফ ও ক্লিনিক্যাল এমব্রায়োলজিস্ট ডা. বিপাশা আহমেদ

বাংলাদেশে আপানারা আইভিএফ সেবা শুরু করেছেন কবে? আপনাদের সফলতার হার কেমন?

ডা. মাকসুদা আশরাফ: এটা বাংলাদেশে শুরু হয়েছে অনেকদিন। প্রায় ১৯৯৮ বা ২০০০ সাল থেকে শুরু হয়েছে। এনাম মেডিকেলে আমরা সম্প্রতি শুরু করেছি। ২০২২ সাল থেকে আমরা আমাদের প্রথম আইভিএফ (ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) শুরু করেছি। এছাড়া সাধারণ চিকিৎসাসেবাগুলো এখানে অনেক দিন ধরে চলছে। আইইউআই, ইকসি, টেসা-পেসা, এফইটি, পিআরপি ও অন্য সব ধরনের বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা করা হচ্ছে।

আইভিএফ পদ্ধতি যদি পাঠকদের জন্য সহজ করে ব্যাখ্যা করেন...

ডা. বিপাশা আহমেদ: আইভিএফ আসলে ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন। বাইরে স্পার্ম আর ওভাম নিয়ে ফার্টিলাইজ করে তা নারীর জরায়ুতে দিয়ে দেয়া হয়। রোগীর কাছ থেকে সম্মতি নেয়ার পর আমাদের প্রক্রিয়াটা শুরু হয়। এটার স্টিমুলেশনটা মাসিকের দ্বিতীয় দিন থেকে শুরু করা হয় ও ১-১২ দিন পর্যন্ত স্টিমুলেশন দেয়া হয়। এই সময়টায় টিভিএস বা ট্রান্সভ্যাজাইনাল সনোগ্রাফি করে ডিমটা দেখা হয়। ফলিকুল কেমন আছে, সাইজ কেমন তা এর মাধ্যমে দেখা হয়। এরপর একটা ট্রিগার দিয়ে ১৪ বা ১৫ দিনে ওটিতে নিয়ে ওভামটা কালেক্ট করা হয়। 

ডা. মাকসুদা আশরাফ: আমরা যখন আইভিএফ করি তখন রোগীর পরিস্থিতি অনুযায়ী আমরা তাদের ট্রিটমেন্ট দিই। সাধারণ মানুষকে আমরা যেভাবে বলি যে আমরা ১১ থেকে ১৫ দিনের একটা ট্রিটমেন্ট দেব। তখন তাদের ঘন ঘন আমাদের কাছে আসতে হবে। আমরা আলট্রাসনোগ্রাফি করে দেখব। যখন আমরা ডিমটা কালেক্ট করব। ডিএনসির মতো একটা জিএ দিয়ে অজ্ঞান করে ডিমটা আমরা সংগ্রহ করব। এটা মায়ের ওভাম বা ডিম্বকোষ থেকে সংগ্রহ করি। পাশাপাশি তার স্বামীর সিমেনটাও কালেক্ট করব। যদি ভালো সিমেন হয় তাহলে স্বাভাবিকভাবেই দেবে আর যদি সে না পারে বা পুরুষের যদি কোনো সমস্যা থাকে সেক্ষেত্রে সরাসরি অণ্ডকোষ থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে সংগ্রহ করি। এ পদ্ধতিকে আমরা বলি পেসা বা টেসা। এভাবে সংগ্রহ করে মায়ের ডিমটার সঙ্গে বাবার স্পার্ম মেলানো হয় এবং মেলানোর পর যখন ভ্রূণটা তৈরি হয়, সেই ভ্রূণটা তিনদিন কিংবা পাঁচদিনের মাথায় মায়ের জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করে দিই। এটাই মূলত আইভিএফ। বাইরে থেকে যে ভ্রূণটা তৈরি করে দেয়া হচ্ছে সেটাই আইভিএফ বা টেস্টটিউব বেবি। আমাদের মধ্যে যে ভুল ধারণা আছে যে এটা টেস্টটিউবের ভেতরে হচ্ছে ব্যাপারটা একেবারেই সে রকম না। আমরা ইনকিউবেটরে ভ্রূণটা তৈরি করছি, সেই তিন কিংবা পাঁচদিনের ভ্রূণটা মায়ের জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করে দিই।


পরীক্ষাগারের ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে কারো নমুনার সঙ্গে অন্য নমুনা মিলে যেতে পারে কি না?

ডা. বিপাশা আহমেদ: এখানে একজনেরটা আরেকজনে যাওয়ার কোনো আশংকা নেই। কারণ এখানে আইডি নম্বর থাকে। রোগীর নাম, স্বামীর নাম ও আইডি নম্বর সিমেন যে টিউবে প্রস্তুত করা হয় সেখানে উল্লেখ করা থাকে। এখানে একজনের সিমেনের সঙ্গে আরেকজনের সিমেন মিক্সিং হওয়ার কোনো আশংকাই নেই।

আপনাদের পরীক্ষাগারে এখন পর্যন্ত কতটি কাজ করা হয়েছে?

ডা. বিপাশা আহমেদ: শুরু করার পর থেকে অনেকগুলো কাজ হয়েছে। সিমেন অ্যানালাইসিস তো অনেক হয়েছে। প্রতিদিন ২০-২৫টি সিমেন অ্যানালাইসিস হচ্ছে। আইওআই কমপক্ষে ৪৫-৬০টি হয়ে গিয়েছে। আইভিএফ প্রথম সাইকেল আমরা করলাম। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমাদের প্রথম রোগীটাই পজিটিভ এসেছে। আমরা সম্প্রতি তার ডাটা ইসিজি এবং ইউপিটি টেস্টের রিপোর্টটা পেয়েছি। আমাদের প্রথম আইভিএফ প্যাশেন্ট কনসিভ করেছেন। নতুন সেন্টার হিসেবে আমাদের জন্য এটা বড় একটা অর্জন। প্রথম রোগী পজিটিভ—এ রকম রেকর্ড আর কোথাও আছে কিনা আমি জানি না, এটা এনাম মেডিকেল কলেজের জন্য অনেক বড় অর্জন।

বাংলাদেশে আইভিএফ পদ্ধতির সম্ভাবনা কেমন? এ বিষয়ে ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোই এগিয়ে আছে কি?

ডা. মাকসুদা আশরাফ: আসলে আইভিএফ বা টেস্টটিউব বেবির যে ট্রিটমেন্ট— এটা টারশিয়ারি কেয়ারেই পড়ে। এনাম মেডিকেল যেটা শুরু করেছে সেটা খুবই গর্বের সঙ্গে বলতে চাচ্ছি যে এক্ষেত্রে আমরা খুবই উন্নতমানের বা ওয়ার্ল্ড ক্লাস ল্যাব করতে পেরেছি। আর এখন রোগীরা যেভাবে সচেতন হচ্ছে এটা সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়বে। আস্তে আস্তে জেলা সদরগুলোতে হবে কিন্তু খুব প্রান্তিক পর্যায়ে সম্ভব না।


বাংলাদেশে আইভিএফের বড় সীমাবদ্ধতা কী?

ডা. মাকসুদা আশরাফ: আইভিএফ একটা ব্যয়বহুল পদ্ধতি। আমাদের আর্থসামাজিক যে অবস্থা সবার পক্ষে সেটা সম্ভব হয় না। এটাই প্রথম ও প্রধান সমস্যা। এটা আমাদের এখানে অনেক কমে করছি। দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে, আমাদের প্রিম্যাচিউর বা ওভারিয়ান ইনসাফিশিয়েন্সি যেখানে স্বামীর শুক্রাণুটা থাকে না। সেই ক্ষেত্রে আমাদের দেশে সেই আইনটা নেই এগ ডোনেশন বা স্পার্ম ডোনেশনের। আমাদের ধর্মেও এটা অনুমোদিত না। এদিকে একটা ব্যাপার আছে। সেই দিক থেকে ভারত বা বাইরের থেকে আমরা একটু পিছিয়ে আছি। যদিও মানুষ সচেতন হচ্ছে এখন, তবে অনেক ক্ষেত্রে এটার গ্রহণযোগ্যতা সবার কাছে সমান না।

আইভিএফ পদ্ধতির জন্য খরচ কেমন হবে?

ডা. মাকসুদা আশরাফ: যেহেতু আমাদের অনেক ধরনের ওষুধ দিতে হয়, মিডিয়া দিতে হয়। এগুলো একটু ব্যয়বহুল। প্রায় ১৫-২০ দিনের একটা ট্রিটমেন্ট থাকে। সেক্ষেত্রে খরচটা লাখের ওপরে চলে যায়, আড়াই থেকে তিন লাখের মতো চলে যায়।


এখানে আরো কি কোনো চিকিৎসা আপনাদের জানা আছে যেটা অন্যান্য দেশে চলছে, কিন্তু বাংলাদেশে এখনো আমরা শুরু করতে পারিনি?

ডা. মাকসুদা আশরাফ: এখন বিশেষায়িত চিকিৎসার ভেতরে যেটা হচ্ছে পিজিডি (প্রি ইমপ্ল্যান্টেশন জেনেটিক টেস্টিং), এই ক্ষেত্রে আমরা একটু পিছিয়ে আছি। যদিও কয়েকজন ম্যাডাম এনেছেন কিন্তু আমরা এক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি। কিছু শুরু হয়েছে। যেটা ভারতে চলছে যে সন্তান অ্যাবনরমাল হবে কিনা, যাদের ফ্যামিলি হিস্ট্রিতে কিছু ডিজিজ থাকে সেটা কারো সন্তানের হবে কিনা এটা আগে থেকে জেনে সেল নিয়ে ব্লাস্টোসিস করা হয়। ওই সেল পরীক্ষা করে যদি দেখি যে বাচ্চার ভেতরে ডিজিজটা যাবে তখন সেই ভ্রূণটা প্রতিস্থাপন করা হয় না। এই ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে আছি। এছাড়া আরো কিছু চিকিৎসা আছে যেমন পিআরপি, এটা আমরা করছি। স্টেম সেল থেরাপিও শুরু হয়েছে সম্প্রতি বিএসএমএমইউতে।

পুরুষদের প্রজনন স্বাস্থ্যে সমস্যা হিসেবে কী দেখতে পাচ্ছেন?

ডা. মাকসুদা আশরাফ: বর্তমানে আমরা সিমেন কাউন্ট অনেক লো পাচ্ছি। যেটাকে আমরা বলি অলিগোসফাার্মিয়া কিংবা অ্যাস্থোনোসফার্মিয়া অথবা অ্যাজোসফার্মিয়া। অলিগোসফাার্মিয়া হচ্ছে কম কাউন্ট, অ্যাস্থোনোস মানে দুর্বল কাউন্ট, স্পাম আছে কিন্তু নড়াচড়া কম। প্রগ্রেসিভ মর্টিলিটিটা কম। আর অ্যাজোসফার্মিয়া হচ্ছে সিমেনের মধ্যে শুক্রাণু নেই। এসব সমস্যা আমরা পাচ্ছি।


পরীক্ষাগারে সঠিক নিরীক্ষা ও ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। এ বিষয়ে আপনাদের বক্তব্য জানতে চাই।

ডা. বিপাশা আহমেদ: এ রকম ভ্রান্ত ধারণা অনেক রোগীর মধ্যেই থাকে। তারা আমাদের কাছে আসে। তাদের আমরা আগের থেকে নিশ্চিত করি, আমরা তাদের বলে দিই যে তার ওভাম এবং তার স্বামীর স্পাম দিয়েই ভ্রূণ তৈরি করা হয়। এটা আমরা তাদের শতভাগ নিশ্চিত করে দিই। এখানে কোনো ডোনার নেয়া হবে না। এই সেন্টারে এ সুবিধাও নেই। আর একটা কথা বলতে চাই, এখানে আসলে তারা অনেক কম টাকায় অনেক ভালো চিকিৎসা পাবেন। এনাম মেডিকেলে সব ধরনের উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

কত বয়স পর্যন্ত আইভিএফসহ অন্যান্য আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণ করা সম্ভব?

ডা. মাকসুদা আশরাফ: আমরা সাধারণত বলি ত্রিশ থেকে প্রজননক্ষমতা কমতে থাকে। ত্রিশের ওপরে সাউথইস্ট এশিয়ান দেশগুলোতে বলা হয় এগ কোয়ালিটি ও কোয়ান্টিটি কমতে থাকে। সেক্ষেত্রে ত্রিশ বছর থেকে আমরা অ্যাক্টিভ ট্রিটমেন্টে চলে যেতে বলি। সেটা যদি আমরা টেস্টটিউব বেবি করতে চাই, এজন্য আমরা প্রত্যাশা করি ৩০ থেকে ৩৫-এ টেস্টটিউব বেবি করে ফেলা ভালো। ৪০-এর পর থেকে আমরা ট্রিটমেন্টটা করতে নিরুৎসাহিত করি।

ডা. বিপাশা আহমেদ: আমাদের এনাম মেডিকেলে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। যেমন আইভিএফ, ইকসি, ফ্রোজেন এম্ব্রবায়ো ট্রান্সফার, ক্রাইয়ো প্রিজারভেশন ও আইওআই। স্পার্ম ফ্রিজিংয়ের ব্যবস্থা আছে। এছাড়া স্পার্ম প্রিপারেশন, অ্যাজোসফার্মিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে আইইউআই, ইকসি, টেসা-পেসা, এফইটি, পিআরপি ও অন্য সব ধরনের বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা করা হচ্ছে। পিআরপি সুবিধা এনাম মেডিকেল কলেজে আছে।

 

সাক্ষাকার গ্রহণ: মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ