গত কয়েক বছরে দেশে হাইব্রিড গাড়ির বাজার লক্ষণীয়ভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০১৭ সালে যেখানে মাত্র ৫০০ ইউনিট হাইব্রিড গাড়ি আমদানি হয়েছিল, বর্তমানে মোট আমদানির ৪০ শতাংশই এখন হাইব্রিড। সরকারের ইতিবাচক পলিসির কারণে হাইব্রিড গাড়ির শুল্কহার কিছুটা কমে এসেছে। বারভিডার সদস্যরা হাইব্রিড ও নন-হাইব্রিড গাড়ির ৭০-৭৫ শতাংশ আমদানি এবং বাজারজাত করে থাকেন। রিকন্ডিশন্ড গাড়ির বেশির ভাগ জাপান থেকে আমদানি করা হয়। বাংলাদেশে হাইব্রিড গাড়ির বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন বারভিডার সভাপতি হাবিব উল্লাহ ডন।

বর্তমানে জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয়টি বিশ্বজুড়ে আলোচনায়। এক্ষেত্রে দেশে জ্বালানি সাশ্রয়ী গাড়ির বিপণনে বারভিডা কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে?

আমরা দেশের রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারকরা দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব হাইব্রিড গাড়ি আমদানির অনুমতি চেয়ে আসছিলাম। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা ও অন্যান্য প্রচেষ্টার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত ২০১২ সালে আমরা হাইব্রিড গাড়ি আমদানির অনুমতি পাই। অথচ পরিবেশের কথা চিন্তা করে বিশ্বের অন্যান্য দেশে অনেক বছর আগে থেকেই হাইব্রিড ও বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি বাজারজাত হয়ে আসছে। 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখন হাইব্রিড গাড়ি কত শতাংশ আছে?

হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখন যত গাড়ি আমদানি হচ্ছে তার ৪০ শতাংশ হাইব্রিড গাড়ি। তাই হাইব্রিড ও বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি ব্যবহারে উৎসাহিত করার জন্য নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি বলে হাইব্রিড গাড়ির শুল্কহার কিছুটা কমে এসেছে। তা সত্ত্বেও অন্যান্য দেশের তুলনায় এখানে হাইব্রিড ও বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির শুল্ক অনেক বেশি।  

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত যত হাইব্রিড গাড়ি আসছে তার কত শতাংশ বারভিডা আনছে বলে আপনি মনে করেন?

বারভিডার সদস্যরা হাইব্রিড ও নন-হাইব্রিড গাড়ির ৭০-৭৫ শতাংশ আমদানি ও বাজারজাত করে থাকেন। রিকন্ডিশন্ড গাড়ির বেশির ভাগ জাপান থেকে আমদানি করা হয়। এগুলো জাপানের হোম মডেল। উন্নত প্রযুক্তির এ গাড়িগুলোর চাহিদা ও কদর বাংলাদেশের ক্রেতাদের কাছে অনেক বেশি। এসব গাড়িতে অ্যাডভান্স ইঞ্জিন থাকে; কেনার পর তিন-চার বছরের মধ্যে গ্যারেজে যেতে হয় না। 

অনেকে বলে, হাইব্রিড গাড়ির যন্ত্রপাতি এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

জীবাশ্ম জ্বালানি চালিত ও হাইব্রিড গাড়ি দুটো দুই প্রযুক্তির। হাইব্রিড গাড়িতে একটি ব্যাটারি থাকে ইঞ্জিনের সঙ্গে আর একটি ব্যাটারি থাকে হাইব্রিড ব্যাটারি। হাইব্রিড ব্যাটারি চার-পাঁচ লাখ কিলোমিটার পর্যন্ত সাপোর্ট দিয়ে থাকে। এ ব্যাটারি নষ্ট হলে ১ হাজার থেকে ৩ হাজার ডলারের মধ্যে কিনতে পাওয়া যায়। অন্যদিকে ইউরোপের হাইব্রিড বা প্লাগড-ইন গাড়িগুলোর যন্ত্রাংশ ও সার্ভিস অনেক ব্যয়বহুল। বাংলাদেশে বর্তমানে হাইব্রিড গাড়ির সাত-আটটি সার্ভিস সেন্টার চালু রয়েছে। 

হাইব্রিড গাড়ি কীভাবে কাজ করে যদি গ্রাহককে বুঝিয়ে বলতেন

হাইব্রিড গাড়ির একটা ব্যাটারি থাকে, যেটাতে এ গাড়ি চলে। অনেকে সন্দেহ করেন যে হাইব্রিড গাড়ির ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যায়। আমি তাদের উদ্দেশে বলব, হাইব্রিড গাড়ির ব্যাটারি সহজে নষ্ট হয় না। এ গাড়ির ব্যাটারি সহজলভ্য এবং খুব কমই ডিসটার্ব দেয়। ব্যাটারি নষ্ট হলে নতুন এবং রিকন্ডিশন্ড ব্যাটারি পাওয়া যায়। ২০০০-৪০০০ ডলারের মধ্যে এসব ব্যাটারি পাওয়া যায়। আর এ গাড়িগুলোর সার্ভিস চলার পথে পরিবর্তন হয়। কখনো জ্বালানি তেলে আবার কখনো হাইব্রিড মোডে চলে। জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত গাড়ি যেখানে প্রতি লিটারে সাত-আট কিলোমিটার চলে সেখানে হাইব্রিড গাড়ি প্রতি লিটারে চলে ১৫-১৬ কিলোমিটার। 

মধ্যবিত্তদের জন্য হাইব্রিড গাড়ি বা এসব ব্র্যান্ডের গাড়ির মূল্য কত থেকে শুরু হয়?

আমরা মধ্যবিত্ত এবং উচ্চ মধ্যবিত্তদের টার্গেট করেই গাড়ি আমদানি করি। একটা রিকন্ডিশন্ড হাইব্রিড গাড়ির দাম কমপক্ষে ১৫-১৬ লাখ টাকা থেকে শুরু হয়। ২০-২৫ লাখ টাকা দামের গাড়িও রয়েছে। বর্তমানে যেহেতু ডলারের মূল্য বেড়েছে। আবার সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ সংকটের কারণে শুধু জাপান নয়, ইউরোপেও নতুন গাড়ির উৎপাদন কমেছে। ফলে রিকন্ডিশন্ড গাড়িরও সরবরাহ কমে গিয়েছে। এ অবস্থায় ২০ হাজার ডলারের গাড়ি ২২-২৫ হাজার ডলারে কিনতে হচ্ছে। গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে অটোলোনের সুদের হার যদি ২-৩ শতাংশ হ্রাস করা হয় তবে ক্রেতারা হাইব্রিড গাড়ি কিনতে বেশি আগ্রহী হবেন।

আপনার কোম্পানির কথায় আসি। কোন কোন ব্র্যান্ডের গাড়ি আমদানি করছেন। মূল্য কেমন?

আমি প্রায় ৩১ বছর ধরে এ ব্যবসায় রয়েছি। পথচলা খুব সহজ ছিল না। মানসম্পন্ন গাড়ি আমদানি এবং বিক্রয়-পরবর্তী সার্ভিস প্রদানের কারণে ক্রেতাদের সাপোর্ট পেয়েছি। সঙ্গে সরকারের পলিসি সাপোর্টও পেয়েছি। আমি রিকন্ডিশন্ড ও ব্র্যান্ড নিউ দুই ধরনের গাড়িই আমদানি করে থাকি। আমদানি করা গাড়ির মধ্যে ৭৫ শতাংশ জাপানি হোম মডেলের গাড়ি; বাকি ২৫ শতাংশ ইউরোপের গাড়ি। আমার প্রতিষ্ঠান থেকে সব সময়ই উন্নত মানের গাড়ি আমদানির চেষ্টা করে গিয়েছি। বিলাসবহুল গাড়িও আমি আমদানি করেছি।

সারা দেশে অটো মিউজিয়ামের কতগুলো ব্রাঞ্চ আছে?

আমার তিনটা ব্রাঞ্চ ছিল (অটো মিউজিয়ামের)। কভিডের কারণে একটা ব্রাঞ্চ গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছি। এখন দুটি আছে—গুলশানে একটা ও বারিধারায় একটা। ইনশা আল্লাহ আমাদের ২০০-২৫০ গাড়ির একটা টোটাল সার্কেল থাকে। আমরা চেষ্টা করি সব ধরনের গাড়ি বিক্রি করতে। একেবারে যদি মনে করি—১৫ লাখ থেকে শুরু করে ৬ কোটি টাকার গাড়ি বিক্রি হয়েছে এই অটো মিউজিয়াম থেকে।

ভবিষ্যতে কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা?

৩১ বছর আগে একটি ছোট্ট শোরুমে ছয়টি গাড়ি দিয়ে আমি ব্যবসা শুরু করেছিলাম। পরম করুণাময় আল্লাহর অশেষ রহমতে এখন আমার শোরুমগুলোয় ১৫০-২০০ গাড়ি থাকে। প্রথম থেকেই আমি উন্নত মানসম্পন্ন এবং আনকমন গাড়ি আমদানির ওপর জোর দিয়েছি। গাড়ির মানের বিষয়ে কখনো আপস করিনি। ক্রেতারাও আমার প্রতিষ্ঠানের ওপর আন্তরিক আস্থা রেখেছেন। তাদের সমর্থনেই আমার ব্যবসা সম্প্রসারিত হয়েছে।

আমরা যেসব গাড়ি বিক্রি করছি তার ৬০-৭০ শতাংশ ঢাকায় রেজিস্ট্রেশন হয়, ঢাকাতেই চলে। আমরা আশা করি, বিকেন্দ্রীকরণ হয়ে বিভাগীয় শহর ও ঢাকার বাইরের জেলাগুলোয় অবকাঠামো গড়ে উঠুক। সেখানেও গাড়ির ব্যবহার বাড়ুক। ১৭ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশে মাথাপিছু গাড়ির ব্যবহার হাজারে মাত্র তিনটি, যেখানে মালয়েশিয়ায় ২৫-৩০টি; অন্যান্য উন্নত দেশে ৩০-৪০টি।

বারভিডার সভাপতি হিসেবে সরকার বা নীতিনির্ধারণকারীদের উদ্দেশে যদি কিছু বলতে চান?

অটোমোবাইল একটি বড় খাত। আমরা বারভিডার সদস্যরা এ খাতে ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছি। সরকারকে বছরে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব দিই। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আমরা অবদান রাখছি। বছরে আমরা যে ২০-২৫ হাজার গাড়ি বিক্রি করছি সেখানেও ২০-২৫ হাজার গাড়িচালকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। গাড়ি বিপণনের সঙ্গে খুচরা সরঞ্জামাদি বিক্রি, ওয়ার্কশপ ইত্যাদি কর্মকাণ্ড জড়িত। এছাড়া সিএনজি ও এলপিজি বিক্রয় স্টেশন রয়েছে অর্থাৎ ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে ব্যাপক জনগণ যুক্ত রয়েছে। এ শিল্প সচল ও বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে সরকার অনেক নীতিগত সমর্থন দিয়েছে। তবে এখনো অনেক করণীয় রয়েছে। বিশেষ করে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে আরোপিত শুল্ক হার অত্যন্ত বেশি। কোনো কোনো গাড়িতে ৮০০ শতাংশেরও বেশি, যা বিশ্বের কোথাও নেই।

এ বিষয়টির অবশ্যই যৌক্তিকীকরণ প্রয়োজন। এছাড়া অটোলোন ৫০ শতাংশের ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ এবং টাকার অংকে ৭০ লাখ টাকা প্রদান করা দরকার। ইউএস ডলারের সাম্প্রতিক সংকটের কারণে সরকার গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে শতভাগ এলসি মার্জিন আরোপ করায় আমাদের প্রায় ৮০ শতাংশ আমদানিকারকই এক মাস ধরে গাড়ি আমদানি করতে পারছেন না। ডলারের মূল্য এবং জাপানেও গাড়ির উচ্চমূল্যের কারণে আমদানি করা গাড়িগুলোর দাম বেশি পড়ছে। ফলে ক্রেতা কমে গিয়েছে। যদি এভাবে চলতে থাকে, তাহলে অনেক ব্যবসায়ী আর গাড়ি আমদানি করতে পারবেন না। 

বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের জন্য অ্যাকুয়া গাড়িটা ভালো চলছে, এটার দাম কেমন?

অ্যাকুয়া গাড়ির দাম ১২-১৩ লাখ টাকা। এখন যেহেতু ডলারের দাম বেড়েছে, তাই অ্যাকুয়া গাড়িগুলোর দাম বেড়ে ১৪ থেকে সাড়ে ১৪ লাখ টাকা পড়ছে।

গাড়ি ক্রেতাদের ঋণ দেয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাই

গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো অটোলোন প্রদান করে। ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিরা গাড়ির বিভিন্ন শোরুমের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। শোরুম থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ব্যাংকগুলো সরাসরি ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করে। সব কমপ্লায়েন্স মিটিয়ে যৌথ নামে লোনের ব্যবস্থা করা হয়। আশার কথা যে, অটোলোনের ক্ষেত্রে রিকভারি অনেক সন্তোষজনক।