মার্চ, ১৯৭১। ক্রমেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক উত্তেজনা গভীর হচ্ছিল। এর প্রথম চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ২৫ মার্চের গণহত্যা; পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক পূর্ব বাংলার আপামর জনসাধারণের ওপর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল। এ ঘটনার পর পর ব্রিটেন সরকার, গণমাধ্যম ও সে দেশের জনগণের মধ্যে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, যার নজির মেলে হাউজ অব কমন্স সভায় বিষয়টি ঘিরে আলোচনা হলে।
২৫ মার্চ রাতে পূর্ব বাংলায় সংঘটিত ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর পর ২৯ মার্চ হাউজ অব কমন্স সভায় ব্রিটিশ পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ বিষয়ক সচিব স্যার অ্যালেস ডগলাস হিউম সে ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন এবং পাকিস্তানকে সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধের জন্য আহ্বান জানান। পাশাপাশি তিনি পূর্ব বাংলায় বসবাসকারী ব্রিটিশ নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়েও জোর দিয়েছিলেন। জানা যায়, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় এক হাজার (বিভিন্ন তথ্যমতে ৯০৪ জন) ব্রিটিশ নাগরিকের বাস ছিল। তারা মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রাম এলাকা এবং চা বাগান অধ্যুষিত সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলে বাস করতেন। বিশেষ করে সেসময় শমশেরনগর, কুরমা, দলই ও সিলেটের চা বাগান মালিকরা মিলে একটি একক ব্রিটিশ কমিউনিটি গঠন করে। ফলে নানা ঘটনা পরিক্রমায় তৎকালীন পূর্ব বাংলার পরিবেশে অরাজকতা দানা বাঁধতে শুরু করলে এই কমিউনিটিসহ পুরো বাংলায় ছড়িয়ে থাকা ব্রিটিশ নাগরিকদের সুরক্ষা নিয়ে ব্রিটিশ সরকার ও কূটনীতিকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা বেড়ে যায়।
এর ধারাবাহিকতায় ৭ মার্চ ইসলামাবাদে পাঠানো এক টেলিগ্রামে পাকিস্তানে ব্রিটিশ উপহাইকমিশনার সার্জেন্ট উল্লেখ করেন যে পাকিস্তানের সামরিক অভিযানের লক্ষ্যবস্তু ব্রিটিশ নাগরিক বা সম্প্রদায় নয়। তবুও ক্রমেই নাজুক হয়ে ওঠা পূর্ব বাংলার পরিস্থিতিতে তিনি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বাধ্য হয়েছেন যে দ্রুত ব্রিটিশ নাগরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। এর নাম দিয়েছিলেন ‘স্টেজ ২ ইভাকুয়েশন’। এ পরিকল্পনায় নিয়মিত বাণিজ্যিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নারী ও শিশুদের সর্বাগ্রে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। অন্যদিকে এ টেলিগ্রামের দুইদিন পর তৎকালীন দিল্লিতে অবস্থিত ব্রিটিশ মিশনের হাইকমিশনার মরিস জেমসও জানিয়েছিলেন যে নিউজিল্যান্ডের হাইকমিশনার অনুরোধ করেছেন যেন ব্রিটেনের যেকোনো নিরাপদ স্থানান্তর পরিকল্পনায় নিউজিল্যান্ডের নাগরিকদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মরিস জেমস এও নিশ্চিত করেন যে নিউজিল্যান্ড সরকার এর পেছনের ব্যয়ভারও বহন করতে সম্মত হয়েছে। প্রতিউত্তরে ২২ এপ্রিল সার্জেন্ট উত্তর দেন এবং জানান যে নিউজিল্যান্ডের দুটি মিশনারি পরিবারকে এরই মধ্যে আরএএফ চার্টার্ড বিমানে ব্যাংককে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, নিউজিল্যান্ড ছিল কমনওয়েলথভুক্ত দেশ। যে কারণে পূর্ব বাংলায় বসবাসরত দেশটির নাগরিকদেরও ব্রিটিশের স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম থেকে যুগোস্লাভিয়ার নাগরিকদের সরিয়ে নেয়া সমীচীন কিনা তা নিয়ে পরে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
সে সময় ব্রিটিশ নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার কৌশলটি ছিল ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধাকালীন নেয়া পরিকল্পনার অনুরূপ—সব নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা, তারা নিরাপত্তার খাতিরে অন্যত্র যেতে চায় কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া এবং জল ও আকাশপথে সরিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামে তাদের একত্রিত করা। এ লক্ষ্যে উপহাইকমিশনার সার্জেন্ট ঢাকার একজন স্টাফ সদস্যকে বরিশালে পাঠান এবং তিনি সেখানে বাকি ব্রিটিশ সম্প্রদায়ের সঙ্গে দেখা করে নারী ও শিশুদের নিয়ে ছোট ছোট দলভুক্ত করেন। পরে তাদেরকে জলপথে স্টিমারে করে সরিয়ে নেন।

২ এপ্রিল সিলেট থেকে ট্রেনে করে একদল ব্রিটিশ চা বাগান মালিকদের পরিবারের সদস্য এবং ব্রিটিশ ও নরওয়ের মিশনারি কর্মীরা ঢাকায় পৌঁছেন। তারা এই প্রথম নিশ্চিত তথ্য নিয়ে আসেন যে ব্রিটিশ বাগান মালিক এবং তাদের পরিবারগুলো নিরাপদ আছে। সার্জেন্ট ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসকে অনুরোধ করেন যেন তারা দুটি ব্যবস্থাপনা সংস্থা—জেমস ফিনলে অ্যান্ড কোম্পানি এবং ওয়াল্টার ডানকান অ্যান্ড গুডরিককে বিষয়টি অবহিত করে।
২৫ মার্চের ঘটনায় ঢাকার ব্রিটিশ কাউন্সিলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে এর কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিয়েও ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। বিশেষত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গুলশান এলাকায় বসবাসরত ব্রিটিশ ও আমেরিকানদের লুট করার প্রেক্ষাপটে ওই সার্জেন্ট ব্রিটিশ কাউন্সিল ভবন খালি করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এটি বলা যতটা সহজ ছিল, করা ততটা নয়। নথিপত্র ও দলিলগুলো হয় ঢাকা মিশনে সরিয়ে নিতে হতো অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হতো। এছাড়া ব্রিটিশ কাউন্সিলের ড্রাইভারদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ কোনো স্থানে চাকরির ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। এছাড়া বকেয়া বিল পরিশোধ এবং স্থানীয়ভাবে নিযুক্ত কর্মীদের চাকরিচ্যুত করার জন্য ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রয়োজন ছিল। এসব ছিল সামগ্রিক স্থানান্তর প্রক্রিয়ার ঊর্ধ্বে ‘অবশ্যই পূরণীয়’ কাজ।
ওয়াল্টার ডানকান অ্যান্ড গুডরিক লিমিটেডের একজন প্রতিনিধি চা বাগান অধ্যুষিত সিলেট অঞ্চলের কর্মীদের পরিস্থিতি নিয়ে চিঠি লেখেন। সার্জেন্ট এর আগেই দিল্লি হাইকমিশনের মাধ্যমে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিশ্চিত করেছিলেন যাতে জরুরি ভিত্তিতে ত্রিপুরার মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের সব কর্মী সরিয়ে নেয়া যায়। তবে এ আপৎকালীন ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়নি, কারণ বাগানগুলোর পরিবেশ তুলনামূলক শান্ত ছিল। ব্রিটিশ কর্মীদের কাছে পর্যাপ্ত খাদ্যের মজুদ ছিল। তবে একমাত্র সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল শ্রমিকদের মজুরি দেয়ার জন্য নগদ টাকার অভাব। সব মিলিয়ে এ অঞ্চলের ব্রিটিশ নাগরিকদের সুরক্ষা নিয়ে খুব একটা চিন্তা করতে হয়নি। তবে সার্জেন্ট চট্টগ্রামের ব্রিটিশ সম্প্রদায় নিয়ে বেশি চিন্তিত ছিলেন। আর তার চিন্তা আরো গভীর করে তুলেছিল জ্যাক লংয়ের একটি প্রতিবেদন।
লং তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন যে চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাসরত ব্রিটিশ পরিবারগুলোকে খুঁজে বের করা ছিল লোমহর্ষক কাজ। প্রায় ১০ দিন ধরে জল ও বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় থাকা জনশূন্য রাস্তার পেছনের ঘরের কোণ থেকে পরিবারগুলোকে খুঁজে বের করা হয়। তিনি আরো বলেন, ‘আমি যখন পৌঁছলাম, ব্রিটিশরা তখন বিপদসংকুল ১০টি দিন পার করেছে... তারা প্রথমে আওয়ামী লীগের হাতে এবং পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর শহরের মধ্যে অভিযান পরিচালনার সময় ভোগান্তির শিকার হয়েছে’। অর্থাৎ পাল্টাপাল্টিভাবে এ দুই পক্ষ চট্টগ্রামের ব্রিটিশ পরিবারগুলোকে বন্দুকের নলের সামনে রেখে তল্লাশি চালিয়েছে, যা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তৎকালীন আওয়ামী লীগের ধারণা ছিল যে ব্রিটিশ পরিবারগুলো পশ্চিম পাকিস্তানিদের অনেককে লুকিয়ে রেখেছিল, যাদের ধরা পড়লে তাৎক্ষণিক মেরে ফেলা হতো। অন্যদিকে ব্রিটিশদের পাকিস্তানি সেনাদের কাছে অনুনয় জানাতে হয়েছিল, যাতে ব্রিটিশদের অধীনে কাজ করা বাঙালিদের গুলি করা না হয়। সেই সময় পাকিস্তানি সেনারা পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন পরিবারের ওপর চালানো নৃশংসতার কারণে ক্ষিপ্ত ছিল।
৩০ মার্চ সার্জেন্ট এবং মার্কিন কনসাল জেনারেল ঢাকায় সামরিক আইন প্রশাসনের মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর সঙ্গে দেখা করে ব্রিটিশ নাগরিকদের স্থানান্তরের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে ব্রিটিশদের সরিয়ে নেয়ার দায়িত্ব ছিল জ্যাক লংয়ের। তিনি ইউনাইটেড কিংডম পাকিস্তান অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিলেন। নৌপথে স্থানান্তরের জন্য যাত্রীরা ৪ এপ্রিল কারফিউ শুরু হওয়ার আগে ফিনলের কম্পাউন্ডে জড়ো হন। সে সময় ফিনলে কোম্পানি ছিল পাকিস্তানে অবস্থিত বৃহত্তম ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোর একটি। এ কোম্পানির দ্বারা পরিচালিত হতো ১০৭টি ফার্ম, যার মধ্যে ৮৭টি ছিল ব্রিটিশ। পরদিন সকালে ক্ল্যান ম্যাকনেয়ার ১৩০ জনেরও বেশি যাত্রী নিয়ে কলকাতার উদ্দেশে রওনা হন। এর মধ্যে ব্রিটিশদের পাশাপাশি জাতিসংঘের কর্মীরাও ছিলেন। তবে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে ১২ জন যুগোস্লাভীয়কে সে যাত্রায় নেয়া সম্ভব হয়নি।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার আলেক ডগলাস-হোম এ সহায়তার জন্য জাহাজ কোম্পানির চেয়ারম্যানকে ধন্যবাদ জানান। কিছু ব্রিটিশ নাগরিক নিজেদের যাতায়াতের ব্যবস্থা নিজেরাই করেছিলেন। একটি পরিবার ‘দ্য ডেল্টা পাইওনিয়ার’ নামের একটি স্টিমারে হংকং গিয়েছিল। এর ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন পাকিস্তান পাসপোর্টধারী ছয় চীনা নাগরিককেও সঙ্গে নিতে রাজি হয়েছিলেন। ক্ল্যান ম্যাকনেয়ার জাহাজ যাত্রা করার তিনদিন পর যুগোস্লাভীয়দের না নেয়া ঘিরে আবারো একটি বাদানুবাদের ঘটনা ঘটে। তাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনটি পিআইএ বিমান ভাড়া করা হয়েছিল, কিন্তু চট্টগ্রামে মাত্র দুটি বিমান অবতরণ করে।
জ্যাক লং শেষ ব্রিটিশ বাসিন্দাদের নিরাপদে বিদায় করার এক সপ্তাহ পর সার্জেন্ট চট্টগ্রাম সফর করেন। তিনি জানান যে সেখানে অবস্থানরত অবশিষ্ট ব্রিটিশ নাগরিকরা মোটামুটি মনোবল বজায় রেখেছেন, তবে তারা তখনো তাদের লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা থেকে বের হতে পারছিলেন না। ২ এপ্রিল থেকে আরএএফ হারকিউলিস বিমানগুলো ঢাকা থেকে সিঙ্গাপুরে ব্রিটিশদের নিয়ে যেতে শুরু করে। তিনদিনের মধ্যে ১২৭ জনকে বিমান ও নৌপথে সরিয়ে নেয়া হয়। ৪১ জন মানুষ বাণিজ্যিক পিআইএ ফ্লাইটে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান। এর ফলে ঢাকায় মাত্র কয়েকজন ব্রিটিশ অবশিষ্ট ছিলেন। সার্জেন্ট লক্ষ করেন যে অবশিষ্ট ছয়টি শিশুর মধ্যে তিনজনের মা পাকিস্তানি এবং তাদের চলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে স্থানান্তরের পর পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র ২৩০ জন ব্রিটিশ নাগরিকের বসবাসের কথা জানা যায়। অন্যদিকে লন্ডন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে ঢাকার ডেপুটি হাইকমিশনের কার্যক্রম চলমান থাকবে। কারণ ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের প্রস্থানকে পাকিস্তান ভিন্নভাবে বিচার করতে পারে। ভারতের হস্তক্ষেপ বা আওয়ামী লীগের পূর্বপরিকল্পনার কারণে তারা বিদায় নিয়েছেন বলে ভাবতে পারেন। তাই ডেপুটি হাইকমিশন সক্রিয় রাখা হয় এবং নিয়মিত আপডেট নেয়ার কাজে নিয়োজিত করা হয়। সর্বোপরি ধারাবাহিকভাবে টেলিগ্রামের মাধ্যমে সার্জেন্ট লন্ডনে ব্রিটিশ নাগরিকদের বিস্তারিত তথ্য প্রদান নিশ্চিত করেন।
(ইয়ান ট্যালবটের ‘দ্য হিস্ট্রি অব ব্রিটিশ ডিপ্লোম্যাসি ইন পাকিস্তান’ বই অবলম্বনে অনূদিত ও সম্পাদিত)
ভাষান্তর: সাবরিনা স্বর্ণা








