শীর্ষ ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। দেশের বাজারের পাশাপাশি উন্নয়নশীল ও উন্নত বিভিন্ন দেশে তাদের ওষুধ রফতানি করছে। ওষুধ শিল্পে ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬, ২০১৬-১৭ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ইনসেপ্টা পেয়েছে জাতীয় রফতানি ট্রফি।

বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে প্রতিষ্ঠিত এ প্রতিষ্ঠান এবার পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য পেয়েছে জাতীয় পরিবেশ পদক। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ওষুধের অবস্থান, বিপণন ব্যবস্থা, সীমাবদ্ধতা ও রফতানি বৃদ্ধির সম্ভাবনাসহ নানা বিষয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন ইনসেপ্টার নির্বাহী পরিচালক (মার্কেটিং) ডা. ই এইচ আরফিন আহমেদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত বছর রফতানি হয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার ওষুধ। বাংলাদেশের ওষুধের ওপর বৈশ্বিক আস্থা কেমন?

বৈশ্বিক আস্থা তৈরি হচ্ছে বলেই রফতানির আকার দিন দিন বাড়ছে। একটা সময় খুব কম দেশে আমরা রফতানি শুরু করেছিলাম। এখন ১৫২ দেশে যাচ্ছে। সারা বিশ্বে আমাদের ওষুধের আস্থা বেড়েছে এমনকি ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশেও আস্থা বাড়ছে। সে কারণেই রফতানির বাজার বড় হচ্ছে। একই সঙ্গে আরো দেশে আমাদের ওষুধ নিয়ে যেতে পারছি।

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের অন্যতম নেতৃস্থানীয় প্রতিষ্ঠান ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। ১৯৯৯ সালে যাত্রা করা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে দেশের ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে ক্রমাগত তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে। ইনসেপ্টা দেশের একমাত্র ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি; যার জেনেরিক ওষুধ ছাড়াও রয়েছে স্বয়ংসম্পূর্ণ বায়োটেক, ভ্যাকসিন, হরমোনাল ওষুধ, ভেষজ ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা। প্রতিষ্ঠানটি সব ধরনের ডোজেজ ফর্ম তৈরি করে, যার মধ্যে রয়েছে ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, ওরাল লিকুইড, অ্যাম্পুলস, ড্রাই পাউডার ইনহেলার, সাসপেনশনের জন্য পাউডার, নাকের স্প্রে, চোখের ড্রপ, ক্রিম, মলম, লোশন, জেল, প্রিফিলড সিরিঞ্জ, তরলভর্তি হার্ড জেলটিন ক্যাপসুল, লাইওফিলাইজড ইনজেকশন, ভ্যাকসিন ইত্যাদি। ওষুধ গবেষণাও ইনসেপ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যার ওপর নির্ভর করে নতুন ও মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা। ইনসেপ্টা ভ্যাকসিন লিমিটেড বাংলাদেশের প্রথম স্থানীয়ভাবে তৈরি ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। ২০১১ সালের জুনে যাত্রা করার পর থেকে দেশের চাহিদা মেটাতে এটি নয়টি ভ্যাকসিন ও পাঁচটি ইমিউনোগ্লোবিউলিন বাজারজাত করেছে। বায়োটেক পণ্যের উন্নয়নেও অগ্রণী ভূমিকায় ইনসেপ্টা। সাশ্রয়ী মূল্যে অনেক জীবনরক্ষাকারী জৈবিক পণ্য উৎপাদন করছে। ইনসেপ্টা হাইজিন ও হসপিকেয়ারের কার্যক্রম শুরু করে ২০১৩ সালে। এরই মধ্যে তারা প্রিমিয়াম মানের ইনফিউশন সেট ও অস্ত্রোপচারে সেলাইয়ের সুতা তৈরি করছে। এছাড়া শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উৎপাদন করছে ডায়াপার। স্বাস্থ্যসেবায় ভেষজ পণ্য তৈরি করে ঐতিহ্যগত ওষুধ ও আধুনিক বিজ্ঞানকে একীভূত করেছে ইনসেপ্টা হারবাল ও নিউট্রিকেয়ার। 
দেশের চাহিদা মিটিয়ে ইনসেপ্ট ২০০৬ থেকে শুরু করে বর্তমানে ১৫২টি দেশ ও অঞ্চলে সফলভাবে পণ্য নিবন্ধনের মাধ্যমে ৩০০-এর ওপর জেনেরিক রফতানি করছে। বিভিন্ন দেশে আরো পণ্যের নিবন্ধন চলছে। উন্নত দেশের বিধিবিধান মেনে উচ্চমানের পণ্য তৈরি করায় ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে ইনসেপ্টা ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে জিএমপি সার্টিফিকেট পেয়েছে, যা তাদের জন্য ইউরোপীয় বাজারের দরজা খুলে দেয়। পাশাপাশি ইনসেপ্টা ইংল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ইউকে এমএইচআরএ স্বীকৃতি পায় ২০১১ সালে। এছাড়া ২০১৭ সালে হেলথ কানাডা ও ২০১৮ সালে ফেডারেল ইনস্টিটিউট ফর ড্রাগস অ্যান্ড মেডিকেল ডিভাইস জার্মানির স্বীকৃতি পায়। ওষুধ শিল্পে ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬, ২০১৬-১৭ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ইনসেপ্টা পেয়েছে জাতীয় রফতানি ট্রফি।
ইনসেপ্টা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে জনগণ ও সামগ্রিকভাবে সমাজের প্রতি প্রতিশ্রুতি ব্যবসায়িক লক্ষ্যে ইতিবাচক অবদান রাখে। তারা সরকারকে নিয়মিত ট্যাক্স ও ভ্যাট দিয়ে আসছে। সময়মতো ব্যাংক ও অন্যান্য স্টেকহোল্ডার দায় নিষ্পত্তির পাশাপাশি কর্মচারীদেরও সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। ইনসেপ্টা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও সরকারি ত্রাণ তহবিলে ওষুধ দান করে। ক্যান্সারের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসার জন্য দেয় আর্থিক সহায়তা। একই সঙ্গে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি এবং বাংলাদেশ বৈজ্ঞানিক ও শিল্প গবেষণা কাউন্সিলে (বিসিএসআইআর) একটি গবেষণা ল্যাব তৈরিতে সহায়তা করেছে।

উন্নত বিশ্বের চেয়ে বাংলাদেশে তৈরি ওষুধের মানের দিক থেকে কোনো ভিন্নতা আছে?

আমি মনে করি বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ওষুধ কোনো অংশেই এখন আর পিছিয়ে নেই। পিছিয়ে থাকলে ১৫২টি দেশে আর রফতানি হতো না, কোথাও না কোথাও আটকে যেত। কোনো একটি দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রফতানি হওয়া মানেই সেখানকার নিয়ম ও মান অনুযায়ী যাচ্ছে। ওইসব দেশে যে ওষুধ রয়েছে তার সঙ্গে একই মান বজায় রেখে আমাদের দেশের ওষুধও রফতানি হচ্ছে।

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ওষুধের দাম আর স্থানীয় বাজারে ওষুধের দাম কম-বেশি কেন? মানে কোনো তারতম্য রয়েছে কি?

দেশীয় ও বিশ্ববাজারের ওষুধে মানের কোনো ভিন্নতা নেই। স্থানীয় বাজারে যে ওষুধ দিচ্ছি সে ওষুধই বিদেশে রফতানি করে থাকি। যেমন ১০ বছর ধরে যুক্তরাজ্যের বাজারে আমরা হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন দিয়ে আসছি, যা আর্থ্রাইটিসে ব্যবহার করা হয়। দেশে এ ওষুধ রিকোনিল নামে পরিচিত। যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের বাজারে আমরা একই মানের ওষুধ বিক্রি করছি। তাই বলতে পারি যে দুই বাজারের ওষুধের মধ্যে মানের কোনো তারতম্য নেই। তবে দামে কিছুটা পার্থক্য থাকে। কোনো সময় আমাদের দেশে দাম কম হয়, আবার কখনো একটু বেশিও হতে পারে। এটা যদি পুরনো একটি জেনেরিকের হয়, তাহলে বাজারে প্রতিযোগিতা খুবই বেশি হয়। বিদেশের বিভিন্ন বাজারে বাল্ক অ্যামাউন্ট (নির্দিষ্ট পরিমাণ) বিক্রি করতে গেলে একটা প্রতিযোগিতামূলক দর নির্ধারণ করতে হয়। সে ক্ষেত্রে আমার দেশের তুলনায় দাম কিছুটা কম হতে পারে, আবার কিছু ওষুধ অনেক বেশি দামে রফতানি হতে পারে। যেমন হেপাটাইটিস সি-এর ওষুধ সফসবুভির একটি ট্যাবলেট বিশ্ববাজারে বিক্রি হতো এক হাজার ডলারে। আমরা প্রথমে দেশের বাজারে সেই ওষুধ ছাড়লাম মাত্র ১০ ডলারে আর বিশ্ববাজারে বিক্রি করেছি ৫০-৭০ ডলার পর্যন্ত। এ বিষয়টি জেনেরিকভেদে ভিন্ন হয়। 

যেসব দেশ ও প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে ওষুধ কিনছে তারা কাঁচামালের মান, ধরন ও পরিমাণ নির্ধারণ করে দেয়। এসব ক্ষেত্রে দামের বিষয়টি কীভাবে ব্যবস্থাপনার আওতায় আনছেন? 

ওষুধের বৈশ্বিক বাজার দুই ভাগে বিভক্ত—একটি নিয়ন্ত্রণাধীন আরেকটি অনিয়ন্ত্রণাধীন। এশিয়ার বেশির ভাগ দেশ কিংবা কিছু লাতিন আমেরিকার দেশ অথবা কিছু আফ্রিকার দেশ কিন্তু কিছুটা নন রেগুলেটেডের (অনিয়ন্ত্রণাধীন) মধ্যেই পড়ে। এসব দেশ সাধারণত বলে দেয় না যে কোন কাঁচামাল ব্যবহার করতে হবে। নির্দিষ্ট কোনো কাঁচামাল বা পরিমাণ বলে দিলে তখন দামের কিছুটা তারতম্য হয়। বেশির ভাগ দেশের ক্ষেত্রে এমন বিষয়ের মুখোমুখি হতে হয় না। যখন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য অথবা ইউরোপের দেশগুলোতে রফতানি করা হয় তখন তারা কাঁচামালের বিষয়গুলো নির্ধারণ করে দেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাঁচামাল কোথা থেকে নিতে হবে, তাও নির্ধারণ করে দেয়। তখন ওষুধের দাম কিছুটা বেশি আসবেই। 

বাংলাদেশ ১৫২টি দেশে ওষুধ রফতানি করছে। তবে ইউরোপ, আমেরিকার ও অস্ট্রেলিয়ার বাজারে কেন এখনো পরিপূর্ণভাবে অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হয়নি?

এসব বাজারে এখনো শক্ত অবস্থান তৈরি হয়নি, এটা সত্য কিন্তু আমরা সে লক্ষ্যে কাজ করছি। ইউরোপ, আমেরিকার মতো অতিনিয়ন্ত্রণাধীন দেশগুলোতে যদিও রাতারাতি অবস্থান তৈরি করা যাবে না। কেননা সেখানে একটি ওষুধ নিবন্ধন করতে আমাদের বহু তথ্য সংযুক্ত করতে হয়। অত্যন্ত কঠিন প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তবেই নিবন্ধন দেয়া হয়। এতে আমাদের কিছুটা সময় লেগে যায়। যেমন ভারতের হাজার হাজার ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাদের মধ্যে কয়টি প্রতিষ্ঠান কেবল ওই বাজারে রফতানি করতে পারছে। কারণ হচ্ছে ইউরোপ, আমেরিকার নিয়ম ও প্রদ্ধতি মেনে ওষুধের নিবন্ধন পেতে বেশ সময় লাগে। সে তুলনায় বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। বাংলাদেশের বহু ফার্মাসিউটিক্যালস প্রতিষ্ঠান রয়েছে যাদের যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ), যুক্তরাজ্যের মেডিসিনস অ্যান্ড হেলথ কেয়ার প্রডাক্ট রেগুলেটরি এজেন্সি (এমএইচআরএ), ইউরোপীয় ইউনিয়ন গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস (জিএমপি), অস্ট্রেলিয়ার থেরাপিউটিক গুডস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (টিজিএ), হেলথ কানাডার অনুমোদন রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো এর পরই নিবন্ধন প্রক্রিয়ার জন্য এগিয়ে যাবে। বেশকিছু প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে আমেরিকা, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায় তাদের ওষুধ নিবন্ধন করে ফেলেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো আরো এগিয়ে যাবে। 

উন্নত বিশ্বের ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন প্রক্রিয়া ও গবেষণার কোনো পার্থক্য রয়েছে কি?

ওইসব দেশে প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ওষুধ মলিকুল পর্যায়ে গিয়ে উৎপাদন করছে। আমরা সে পর্যায়ে এখনো কাজ করতে পারিনি। এটা অনেক ব্যয়সাপেক্ষ বিষয়। একটা মলিকুল নিয়ে কাজ করতে বিলিয়ন ডলার পর্যন্তও খরচ হয়। ফাইজার, অ্যাস্ট্রাজেনেকা, নোভার্টিসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইনোভেশন (সৃষ্টি) পর্যায়ে মলিকুল নিয়ে কাজ করে। আমরা রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতিতে তাদের উদ্ভাবিত ওষুধ নিয়ে কাজ করি। সে ক্ষেত্রে তারা ওষুধ উৎপাদনে যে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে আমরাও তা অনুসরণ করি। পার্থক্য শুধু আমরা মৌলিক মলিকুল সৃষ্টি করতে পারছি না, তারা করছে।

দেশের ওষুধে বৈশ্বিক অ্যাক্রেডিটেশন যেমন এফডিএ, এমএইচআরএর মতো সংস্থার অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের কী ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে মনে করেন?

আমাদের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। দেশের প্রথম সারির ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের উন্নত দেশের কোনো না কোনো কর্তৃপক্ষের অনুমোদন রয়েছে। ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান হয়তো এখনো ওইসব অনুমোদন নিয়ে রফতানিতে যেতে পারছে না। সেখানে তাদের বিনিয়োগ হয়তো সে পর্যায়ে নেই। ফলে বিশ্বমানের কারখানা প্রস্তুত ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে তাদের হয়তো সময় লাগছে। 

ওষুধের জন্য উল্লেখযোগ্য কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। বিষয়টি রফতানিতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে কি?

কাঁচামাল আমদানির বিষয়টি অবশ্যই রফতানিতে প্রভাব ফেলছে। যখন আমরা কাঁচামাল আমদানি করব তখন অবশ্যই ওষুধের দাম বেশি পড়বে। একটা প্রতিষ্ঠান নিজে যখন কাঁচামাল তৈরি করছে সে অবশ্যই কিছু মুনাফা রেখে তা বিক্রি করবে। সেটা যদি নিজেরা তৈরি করতে পারতাম তাহলে ওষুধের দাম কম পড়ত। তখন বৈশ্বিক বাজারে আরো প্রতিযোগিতামূলক দাম নির্ধারণ করতে পারতাম। বেশির ভাগ দেশে দেখা যায়, তারা দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে ওষুধ কেনে। তখন ভারত বা চীন যে দামে শিডিউল জমা দেয়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমরা সে দামে দিতে পারি না। এর কারণ একটাই, তারা নিজেরা কাঁচামাল তৈরি করে। সেটা আমরা করতে পারছি না। আমরা কেবল কিছু হাইটেক প্রডাক্টের কাঁচামাল তৈরি করছি। যেমন কিছু টিকা, বায়োসিমিলার প্রডাক্টের কাঁচামাল তৈরি করছি। 

হজযাত্রীদের মেনিনগোকক্কালের যে টিকা দেয়া হয়, তার কাঁচামাল আমদানি করা হতো। এতে ভোক্তার চাহিদা অনুযায়ী দামে টিকা দিতে পারতাম না। তবে এর কাঁচামাল তৈরি করতে পারায় কয়েক বছর ধরে যে দামে এ টিকা আমরা দিতে পারছি অন্যরা কিন্তু পারছে না। এ টিকার জন্য বিশ্বের যে দেশেই দরপত্র আহ্বান করা হোক না কেন আমাদের দামে অনেকেই তা দিতে পারছে না। যখন সব কাঁচামাল আমরা তৈরি করতে সক্ষম হব তখন নিশ্চিতভাবে অনেক প্রতিযোগিতামূলক দাম নির্ধারণ করতে পারব। তখন অনেক বেশি রফতানিও করতে পারব ও বৈশ্বিক বাজারে আমাদের অবস্থান আরো বাড়বে। 

মেধাস্বত্বের সুবিধা বাতিল হওয়ার পর বিশ্ববাজারে দেশের ওষুধের অবস্থান ধরে রাখতে ও বাজার প্রসারে এখনই পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে মনে করেন না?

মেধাস্বত্বের সুবিধা বাতিল হলে বড় সমস্যা হবে। এখন পৃথিবীতে নতুন যে মলিকুলই আসুক না কেন আমরা তাৎক্ষণিক সে ওষুধ তৈরি করতে পারি। মেধাস্বত্বের সুবিধা বাতিল হওয়ার পর সেটা আর পারব না। আবিষ্কারগুলো তখন পেটেন্টের (উদ্ভাবনের একচেটিয়া অধিকার) আওতায় থাকার কারণে আমরা চাইলেও অন্যের মলিকুল নিয়ে ওষুধ তৈরি করতে পারব না। আমাদের নিজেদের কাঁচামাল তৈরি করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। তাহলে হয়তো প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে পারব। 

রফতানি কার্যক্রমে এপিআই শিল্প পার্কের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত?

এপিআই পার্কের ভূমিকা অপরিসীম। দুইশ একর জমি নিয়ে এ পার্ক তৈরি হচ্ছে। আমরা যখন এপিআই তৈরির জন্য প্লট পাব, ধীরে ধীরে সব প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল তৈরি করতে পারবে। ১৯৮২ সালে ওষুধ অর্ডিন্যান্সের কারণে দেশে ওষুধ শিল্পের যেমন জাগরণ হয়েছিল, এপিআই পার্কও এ শিল্পে তেমনি একটি জাগরণ তৈরি করতে সক্ষম হবে। 

রফতানিতে কর সুবিধা ও প্রণোদনার হারের বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।

আমরা যখন ওষুধ রফতানি করি তখন কোনো ধরনের করের আওতায় পড়ি না। এটা সরকারের ভালো উদ্যোগ। আবার যে পরিমাণ রফতানি করছি তাতে সরকার আমাদের ১০ শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে। বিষয়টি রফতানির ক্ষেত্রে আমাদের অনেক উদ্দীপনা দিচ্ছে। ওষুধ উৎপাদনের কাঁচামাল এখনো আমদানিনির্ভর। ঠিকই সরকারকে এর ওপর কর দিতে হয়। পাশাপাশি ওষুধ রফতানির সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে বিদেশে বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা ও দেশে বায়োইকুইব্যালেন্স টেস্টিং ফ্যাসিলিটির অনুপস্থিতি। বিদেশে ওষুধ রেজিস্ট্রেশন, অফিস প্রতিষ্ঠা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, বিপণন ব্যয় ও অন্যান্য খরচ; বাংলাদেশ ব্যাংকের আরোপিত বিদেশে বিনিয়োগের আর্থিক সীমাবদ্ধতার তুলনায় অনেক বেশি। এসব প্রতিবন্ধকতা নিরসনে অবশ্য আমরা সরকারের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। বিদেশে বিনিয়োগ, নিবন্ধন ও বাজারজাতে পর্যাপ্ত তহবিলের জোগান দিতে পারলে ওষুধ রফতানি বাড়বে। নতুন বাজার সৃষ্টির বিষয়ে দূতাবাসগুলোর তৎপরতাও বাড়ানো প্রয়োজন।

ওষুধ শিল্পে আমাদের গবেষণা নেই বললেই চলে। এ অবস্থায় আগামীতে কি রফতানি সংকুচিত হয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে?

ওষুধের গবেষণা দুই ধরনের হয়ে থাকে। জেনেরিক ডেভেলপমেন্ট এবং নতুন ওষুধ উদ্ভাবন। জেনেরিক গবেষণা নিয়ে অনেক দিন ধরেই কাজ হচ্ছে। রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে আমরা এখন সব ধরনের ওষুধ উৎপাদন করতে পারি। কমপ্লেক্স মলিকুল উৎপাদন করাও এখন আমাদের সক্ষমতার মধ্যে পড়ে। তবে এটা ঠিক, নতুন ওষুধ উদ্ভাবন অত্যন্ত ব্যয়বহুল। উন্নত বিশ্বে একটি ওষুধ গবেষণা শুরু করে বাজারজাত পর্যন্ত বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়। যেখানে আমাদের ওষুধের বাজার হচ্ছে ৩-৪ বিলিয়ন ডলারের। আমাদের রফতানি নতুন মলিকুলের ওপর নির্ভরশীল না। আমরা জেনেরিক রফতানি করে থাকি। তাই রফতানি সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।