বাংলাদেশের বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় শীর্ষস্থানীয় গ্রুপের মধ্যে অন্যতম ল্যাবএইড গ্রুপ। দেশে আর্থিক, শিক্ষা, কৃষি খাতে বিনিয়োগ থাকলেও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধ শিল্পে অবস্থান দৃঢ়। ল্যাবএইড ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রস্তুতকৃত ওষুধ স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে বিশ্ববাজারে অবস্থান তৈরি করেছে। দেশীয় ওষুধ শিল্পের বর্তমান অবস্থা ও রফতানিতে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ওষুধের অবস্থান ও সম্ভাবনার বিষয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন ল্যাবএইডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এএম শামীম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ
দেশীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওষুধ রফতানির পরিমাণ বাড়ছে। গত বছরও ছয় হাজার কোটি টাকার বেশি ওষুধ রফতানি হয়েছে। বিশ্ববাজারে দেশীয় ওষুধের অবস্থান কি সুস্পষ্ট হচ্ছে?
আমাদের দেশে ওষুধের বাজার ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। ওষুধ রফতানির আকার ৬০০ কোটি টাকা থেকে বর্তমানে ৬ হাজার কোটিতে দাঁড়িয়েছে। পাঁচ বছর আগে রফতানির আকার ছিল ৮০০ কোটি টাকা। যে ওষুধ দেশে উৎপাদন করা হয় তার মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ রফতানি হয়। দেশীয় চাহিদার ২ থেকে ৫ শতাংশ ওষুধ আমদানি করতে হয়। একসময় বলা হতো, আমাদের দেশ থেকে কেউ ওষুধ নেবে না। বাংলাদেশের ওষুধ একসময় মিয়ানমার, ইরাক, ইয়েমেন, আফ্রিকায় রফতানি হতো। যেসব দেশে নন অ্যাক্রেডিটেড ওষুধগুলো যায় ওই সব দেশ খুব কম দামে ওষুধ কেনে। আগে রফতানি ছিল অলংকারের মতো। তাতে মুনাফাও ভালো আসত না। তবে কয়েক বছর ধরে উন্নত দেশের বাজারেও আমাদের ওষুধ যাচ্ছে। এতে আমরা অবশ্যই আশার আলো দেখছি যে ৬ হাজার কোটি টাকা থেকে একসময় ৬০ হাজার কোটি টাকার ওষুধ রফতানি হবে। আমি লন্ডনেও বাংলাদেশের ওষুধ দেখেছি। বাংলাদেশের ওষুধের ওপর তাদের আস্থা পার্শ্ববর্তী দেশের ওষুধের থেকে অনেক বেশি।
ওষুধ রফতানির ক্ষেত্রে উল্লেখ করার মতো কোনো সীমাবদ্ধতা রয়েছে কিনা।
ওষুধ জরুরি ও দামি পণ্য। ফাইজারের মতো বড় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের বিক্রি দেখা যাবে বাংলাদেশের বাজেটের সমান। আমরা ওদের দশ ভাগের এক ভাগ দামে একই ওষুধ বাজারে ছাড়ছি। বিশ্বে বড় বড় প্রতিষ্ঠান লবিস্ট নিয়োগ করে আমাদের ওষুধ অনেক জায়গায় প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে। উন্নত দেশের যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) মতো সংস্থা যারা বিশ্ববাজারে ওষুধ রফতানির স্বীকৃতি দেয় তাদের লবিস্টের মাধ্যমে প্রভাবিত করা হয়। ওষুধ শিল্প পোশাক শিল্পের মতো নয়। কেননা আমরা পোশাক শিল্পের পণ্য খুব কম দামে ভালো মানের দিয়ে থাকি। এত কম পয়সায় এখন চীন দিচ্ছে না, ভিয়েতনাম-ভারতও দিচ্ছে না। এখানে কেউ প্রতিযোগিতাও করতে আসছে না। কিন্তু কোনো ওষুধ আন্তর্জাতিক ভালো কোনো প্রতিষ্ঠান এক ডলারে বিক্রি করলে সেই ওষুধ দেখা যায় আমরা ১০ টাকায় বিক্রি করছি। এই চাপ সবসময়ই থাকবে। আমরা কখনো ফেয়ার কম্পিটিশনে যেতে পারব না। রফতানির ক্ষেত্রে এ বিষয়টি বড় একটি বাধা।
ল্যাবএইড দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান; যারা স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ, আর্থিক, শিক্ষা, কৃষি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তবে ল্যাবএইড গ্রুপের মূল পরিষেবার মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা। ২০-২৫ বছর আগেও দেশে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা ছিল না। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে একজন রোগীর রোগ নির্ণয় করা ছিল খুবই কঠিন। ছোট পরীক্ষার জন্য প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন রোগীকে কয়েকদিন ঢাকায় থাকতে হতো। মানসম্পন্ন চিকিৎসার অভাব এবং রোগীর দুর্ভোগ ডা. এএম শামীমকে এ খাতে একটি নতুন ধারা তৈরিতে অনুপ্রাণিত করেছে। ফলস্বরূপ সঠিক রোগ নির্ণয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক। একসময় প্রতিবেশী দেশে যাওয়া ছাড়া হৃদরোগের চিকিৎসার খুব একটা বিকল্প ছিল না। ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল বাংলাদেশী রোগীদের জন্য কার্ডিয়াক চিকিৎসার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছে ল্যাবএইড, যা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে আরেকটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। অভূতপূর্ব উন্নতি লাভ করে ল্যাবএইড তার ব্যবসাকে শিক্ষা, আর্থিক, কৃষি, রিয়েল এস্টেটসহ বিভিন্ন খাতেও বৈচিত্র্য এনেছে। সম্প্রতি সাশ্রয়ী মূল্যে অতুলনীয় মানের পণ্য সরবরাহের লক্ষ্যে ল্যাবএইড প্রবেশ করেছে ওষুধ শিল্পে। ল্যাবএইড ফার্মাসিউটিক্যালসের মিশন হলো দেশের রোগীদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে সর্বোচ্চ মানের ওষুধ সরবরাহ করা। অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্ববাজারে পৌঁছতে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার মাধ্যমে গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যাপক ফোকাস করা। এছাড়া বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত একটি গবেষণাভিত্তিক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি হয়ে ওঠা তাদের মিশন, যেখানে উদ্ভাবনের মাধ্যমে ওষুধ সরবরাহ করে মানুষকে সুস্থভাবে বাঁচতে সহায়তা করবে।
এখন ১৫২টি দেশে ওষুধ রফতানি হচ্ছে। বর্তমান অবস্থানে আসতে বস্তুত দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কতটুকু বেগ পেতে হয়েছিল?
দেশের যেসব প্রতিষ্ঠান রফতানিতে এগিয়ে তারা কিন্তু ৩০ বা ৪০ বছর ধরে কাজ করছে। আপনি যদি কোনো ওষুধ যুক্তরাজ্যে পাঠান সেখানের ইউকেএমএইচআরএ (মেডিসিনস অ্যান্ড হেলথকেয়ার প্রডাক্টস রেগুলেটরি এজেন্সি) এবং যুক্তরাষ্ট্রে এফডিএর অনুমোদন লাগবে। এসব দেশে ওষুধ পাঠাতে হলে তার কাঁচামালও কিন্তু আলাদা। এসব দেশে রফতানীকৃত ওষুধ উৎপাদনের স্থান আলাদা, লোকবলও আলাদা করা হয়। এসব মেনে বিশ্ববাজারে রফতানি করতে হয়েছে। বিষয়টি অসাধ্য সাধনের মতো। এখন আমরা স্বপ্ন দেখি আরো ভালোভাবে রফতানি করা যাবে।
বিশ্ববাজারে অন্যান্য দেশের ফার্মাসিউটিক্যালসের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতা কেমন? কোথাও সীমাবদ্ধতা রয়েছে কিনা।
সারা বিশ্বে ওষুধের জেনেরিকের দেশ বলা হয় ভারতকে। যেমন চীনকে বলা হয় সারা বিশ্বের ইন্ডাস্ট্রি। ভারত এত সস্তায় ওষুধ দেয় যা আমাদের জন্য প্রতিযোগিতার বড় এক কারণ।
ওষুধ ও কাঁচামাল রফতানির ক্ষেত্রে সরকারি কার্যক্রম সম্পন্ন করতে কোনো প্রতিবন্ধকতা রয়েছে কিনা।
আমাদের এবার ডলার সংকট হয়েছে। ওষুধের কাঁচামালের ৯০ শতাংশ আমদানি করতে হয়। সেক্ষেত্রে ডলার সংগ্রহ করা, অগ্রাধিকারের মধ্যে আনা বেশ কঠিন। আগের চেয়ে ডলারের দামও বেড়েছে। ওষুধ তৈরির কাঁচামালে আমাদের প্রায় ৩৫ শতাংশ খরচ হয়। এ বিষয়গুলো বিবেচনা করার সময় এসেছে। মনে করা হয়, দেশে ওষুধের দাম অনেক বেশি। আসলে আমাদের দেশে ওষুধের দাম অন্যান্য দেশের তুলনায় এখনো কম। আমাদের ওষুধ শিল্প ৮০ বছরের। ওষুধের মান ভালো বলেই আমরা গর্ব করতে পারি। ওষুধে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। দেশীয় বাজারের চেয়ে বিশ্ববাজারে আমাদের ওষুধের দাম ভালো পাওয়া যায়। ওষুধের ওপর কর কমানো, ঋণ সুবিধা সহজ করা। মুন্সিগঞ্জে যে এপিআই পার্ক করা হয়েছে সেখানে কোনো প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদন শুরু করতে হলে ২-৩ হাজার কোটি টাকা লাগবে। সব প্রতিষ্ঠানের সমান সক্ষমতা নেই। এসব ক্ষেত্রে সরকারের উচিত বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসা।
বিশ্ববাজারে ওষুধ রফতানি বাড়লেও প্রতিষ্ঠানগুলো গবেষণা ও আবিষ্কারে পিছিয়ে। এতে টেকসই বাজার তৈরিতে বেগ পেতে হচ্ছে। গবেষণা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমাদের সীমাবদ্ধতা কোথায়?
আমাদের দেশে গবেষণার সংস্কৃতি নেই। প্রথম যে ওষুধটা বের হয় তা কিন্তু স্বাভাবিক দামের এক হাজার গুণ বেশি দামে বিক্রি হয়। ওই বাজার আমরা ধরতে পারিনি। অ্যাস্ট্রাজেনেকার মতো প্রতিষ্ঠান হার্ভার্ড বা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বিভিন্ন মলিকুল নিয়ে কাজ করছে। এ কাজের জন্য ওদের হয়তো ১ বিলিয়ন ডলারের মতো খরচ হবে। তবে যখন তারা ওষুধটি তৈরি করবে তখন থেকে প্রথম ১০ বছরে ৮ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার লাভ তারা নিয়ে নেবে। আমরা যারা শিল্প উদ্যোক্তা আমাদের মধ্যে গবেষণার সংস্কৃতি আসেনি। গবেষণার বিষয়টিতে সবারই গুরুত্ব দেয়া উচিত।’
রফতানি বাড়াতে হলে উৎপাদনের কোন বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
রফতানি বাড়াতে হলে ওষুধের মানকে গুরুত্ব দেয়া উচিত। যে কাঁচামাল দিয়ে ওষুধ তৈরি করা হচ্ছে সেখানে কোনো আপস করা চলবে না।
ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের ওষুধের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে কী কী করণীয় রয়েছে?
আমাদের প্রস্তুতকৃত ওষুধের মান ভালো হতে হবে। একই সঙ্গে ওই সব দেশের অ্যাক্রেডিটেশন লাগবে। তাদের বেশ কতগুলো অডিট কোম্পানি আছে যারা অনেক ফি নিয়ে কনসালট্যান্ট পাঠায়। এখানে আমাদের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ) তাদের কনসালট্যান্ট দিয়ে কাজগুলো করতে পারে। আমরা যদি ওই সব দেশে ওষুধ পাঠাতে চাই তখন আমাদের কনসালট্যান্ট হায়ার করতে হয়। তারা ওই দেশে কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে কয়েক বছরের প্রকল্প নেয়। কনসালটেশন ফি হয়তো ৮-১০ মিলিয়ন ডলার এসে পড়ে। এই টাকা একটা মাঝারি প্রতিষ্ঠান বহন করতে পারে না। ওই সব দেশের কনসালট্যান্টের মতো বিশেষায়িত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা আমাদের দেশের মানুষের রয়েছে। তাদের দিয়ে ডিজিডিএ শুধু রফতানির জন্য যদি একটি সেল করে তাহলে ভালো একটি পদক্ষেপ নেয়া হবে।
ওষুধ কূটনীতি বিশ্ববাজারে কতটুকু প্রভাব রাখছে?
উন্নত বিশ্বের বড় কোম্পানির একটি ওষুধ ২-৩ লাখ কোটি টাকার মতো বিক্রি হয়। কোনো ওষুধ আমাদের দেশে আমরা ১০ টাকায় বিক্রি করছি আর তারা বিক্রি করছে ১০০ টাকায়। ওই সব প্রতিষ্ঠান যে কাঁচামাল দিয়ে ওষুধ বানাচ্ছে একই কাঁচামাল দিয়ে কম খরচে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো ওষুধ বানাতে পারবে। ফলে ওই সব প্রতিষ্ঠান একসময় বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে তারা লবিস্টের পেছনে প্রচুর পরিমাণে খরচ করে। এমনকি ওই সব দেশে প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী কাজ করে যেন তৃতীয় বিশ্বের ওষুধ তাদের বাজারে না যায়। রফতানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা এই কূটনীতিটা।
রফতানিযোগ্য পণ্য উৎপাদনে সরকারের পক্ষ থেকে আরো কী ধরনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছেন?
আমাদের এপিআইগুলোতে সরকার অর্থায়ন করে এগিয়ে আসুক। সরকারের কারিগরি সহায়তাও প্রয়োজন। কিছু বিশেষজ্ঞ কমিটি করা উচিত। এই বিশেষজ্ঞ দল অ্যাক্রেডিটেশনের ক্ষেত্রে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করবে। রফতানীকৃত ওষুধের ওপর প্রণোদনা বাড়ানো প্রয়োজন। প্রণোদনা বাড়ালে ডলারের সংকট অনেকটাই কেটে যাবে। বিভিন্ন পদক্ষেপ ও সহযোগিতা পেলে ওষুধ শিল্প থেকেও পোশাক খাতের মতো আয় বিশ্ববাজার থেকে করা যাবে। আমরা ওষুধের কাঁচামাল তৈরি করছি। ওষুধকে নিয়ে আলাদা মন্ত্রণালয় করা যেতে পারে।
রফতানির ওষুধ ও দেশীয় বাজারে বিপণনের ওষুধের মান ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কোনো পার্থক্য রয়েছে কি?
স্থানীয় বাজারে যে ওষুধ বিপণন করা হয় আর বিশ্ববাজারে যে ওষুধ পাঠানো হয় তার কাঁচামালে তারতম্য রয়েছে। বিশ্ববাজারে পাঠানো ওষুধের কাঁচামাল স্থানীয় বাজারে দেয়া ওষুধের কাঁচামালের চেয়ে দামি ও ভালো। দেশীয় বাজারের জন্য প্রস্তুত করা ওষুধের কাঁচামালের দাম যদি ৫০০ ডলার হয়, বিশ্ববাজারের জন্য প্রস্তুত করা ওষুধের কাঁচামালের দাম ১৫০০ ডলার। কেননা ওই সব দেশ বেশকিছু বিষয় নির্ধারণ করে দেয়। তারা আমাদের ওষুধ আমদানির ক্ষেত্রে শর্ত দিয়ে দেয় যে কাঁচামাল কেমন হবে, কী পরিমাণে হবে। তখন স্বাভাবিকভাবেই মান বেশ ভালো হয়ে যায়। ফলে স্থানীয় বাজারের ওষুধ ও বিশ্ববাজারে পাঠানো ওষুধের মধ্যে পার্থক্য থাকে।
বাণিজ্য সম্পর্কিত মেধাস্বত্ব অধিকার চুক্তি (ট্রিপস) পরিপালন বিষয়ে অব্যাহতির মেয়াদ ২০৩৪ সালের জুলাই পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এরপর ওষুধ শিল্পের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে? এপিআই পার্ক কতটুকু অবদান রাখতে পারবে?
গবেষণা করলে অনেক মলিকুল আমরাই তৈরি করতে পারব। তখন স্বত্ব আমাদের থাকবে। এই স্বত্বই আমরা বাইরে বিক্রি করব। বাংলাদেশে অনেক কম খরচে গবেষণা করা যাবে। কেননা আমাদের মৌলিক উপাদান প্রচুর রয়েছে। আমরা বছরে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার ওষুধের কাঁচামাল আমদানি করি। যখন এই কাঁচামাল নিজেরা তৈরি করব তখন দেশের বাইরেও ১০ হাজার কোটি টাকার কাঁচামাল রফতানি করা যাবে। যেমন চীন যে কাঁচামাল বানায় সেই কাঁচামাল আমরা অনেক কম খরচে বানাতে পারব। পাশাপাশি এপিআই পার্কে ওষুধের মৌলিক মলিকুল বানালে উপকৃত হব। মেধাস্বত্বের জন্য যে মলিকুল ১০ হাজার ডলার দিয়ে বাইরে থেকে কিনে আনতে হচ্ছে তা কম খরচে বানাতে পারব।
এপিআই পার্ক আমাদের জন্য বেশ প্রয়োজনীয়। সরকার এপিআই পার্কে ২০০টির মতো প্লট দিয়েছে। বেশি হলে ১০টিতে কাজ চলছে। ওখানেও একটা নীতি প্রয়োজন। যেমন ১০টি প্রতিষ্ঠান যদি একই এপিআই বানায় তাহলে দেখা যাবে বাজারে সমস্যা তৈরি হবে। তাই ভাগ করে দেয়া উচিত কে কোন এপিআই তৈরি করতে পারবে। একই এপিআই সব প্রতিষ্ঠান তৈরি করলে বাজার ধরা যাবে না। এক্ষেত্রে শিল্প মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বসে নির্ধারণ করে দেয়া উচিত। এক্ষেত্রে কারিগরি সহায়তাও দিতে হবে। এখানে সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। এমন না হলে দুই-একটির বেশি প্রতিষ্ঠান এপিআই পার্কে যেতে আগ্রহী হবে না। রফতানির ক্ষেত্রে সরকারের একটি সমর্থন লাগবে। ধরুন কোনো প্রতিষ্ঠান যদি ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে তবে যদি তার স্থানীয় বাজার ৩০ কোটি টাকার হয় তাতে লোকসান হবে। ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকায় যেমন হাসপাতাল করলে তিন বছরের জন্য সরকার আর্থিক সহযোগিতা করে। এরপর লোকসান হলে অডিট করে সরকার তা বহন করে। এমন নীতি এপিআইয়ের ক্ষেত্রে নেয়া উচিত। এতে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সুবিধা দেশ পাবে।
এপিআইয়ে কাঁচামাল উৎপাদন করা গেলেও কাঁচামালের উপাদান কি পুরোপুরিভাবে আমদানি করতে হবে?
ধরুন একটি ট্যাবলেটে তিন গ্রাম ওষুধ থাকে, বাকি ১৫ গ্রাম অন্য জিনিস থাকে। হয়তো কার্বোহাইড্রেড, সফট জিলাটিন না হয় ভেজিটেবল ক্যাপসুল, হাড়ের গুঁড়া ইত্যাদি। এই একসিপিয়েন্টের কাঁচামাল পুরোটাই আমাদের দেশে আছে। আর যে এপিআই বানানো হবে তা ধরুন একটি অ্যাসিড, একটি কেমিক্যাল। এগুলো এপিআইয়ের ২০ ভাগের এক ভাগ দাম। প্রক্রিয়াটাই মূলত ব্যয়বহুল। ধরুন একটি লোহা ১০ টাকা দাম। সেটা দিয়ে স্প্রিং তৈরি করলে ১০০ টাকা। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১ হাজার টাকাও হয়ে যাবে। তেমনি প্রক্রিয়া ব্যয়বহুল হওয়ায় ১০ টাকার এপিআইয়ের কারণে ওষুধ ১০ হাজার টাকা হয়ে যায়। কাঁচামাল দিয়ে ওষুধ তৈরিতে প্রক্রিয়া থাকে, তাতেই ব্যয় হয় বেশি। তবে কাঁচামালের যে উপাদানটি লাগবে তা হয়তো মোট কাঁচামালের ১০০ ভাগের এক ভাগ হবে। কাঁচামাল দিয়ে ওষুধ তৈরিতে যে প্রক্রিয়া থাকে, তা অনেক ব্যয়বহুল হওয়ায় মূলত দাম বেড়ে যায়।





