দেশে ক্যানসারের ওষুধ প্রস্তুতকারী যে কয়টি ফার্মাসিউটিক্যালস প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার মধ্যে শীর্ষে বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস। বিশ্ববাজারে ক্যানসারের ওষুধ রফতানিকারক প্রথম বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানও এটি। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৩০০ জেনেরিকের ওষুধ উৎপাদন করছে, যার মধ্যে প্রায় ৭০টি ক্যানসারের। বৈশ্বিক বাজারে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের এসব ওষুধের অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে দিন দিন। রফতানিতে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের নতুন সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. এবাদুল করিম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ।

দেশের ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো গত বছর ৬৬ হাজার মিলিয়ন টাকার ওষুধ রফতানি করেছে। আর ক্যানসারের ওষুধ রফতানিতে বাংলাদেশের প্রথম প্রতিষ্ঠান বীকন। এ দেশের ওষুধের ওপর বৈশ্বিক আস্থা কেমন?

জাতিগতভাবে ওষুধ রফতানিতে আমরা অনেক বেশি নির্ভরযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছি। আমাদের অনেক কিছুই এখন প্রযুক্তিগত উৎকর্ষে পৌঁছে গেছে। আমরা যখন ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধ তৈরি করছি, তখন অনেক কিছুই আমাদের পক্ষে করা সম্ভব। একটা সময় উন্নত দেশগুলোর অনুদাননির্ভর দেশ ছিলাম। আমাদের মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রপতি সেসব দেশ সফরে গেলে আমাদের জিজ্ঞাসা থাকত—সেখান থেকে কী নিয়ে এসেছেন? সব নাগরিকরই এ জিজ্ঞাসা ছিল। বিদেশী কোনো মেহমান এলে জিজ্ঞসা থাকত—কী দিয়ে গেল? এটা ছিল বাস্তবতা। আজকের বাংলাদেশে আমাদের প্রধানমন্ত্রী যখন আমেরিকা যান তখন আমরা বলি না—কী নিয়ে এল। বরং আমাদের প্রধানমন্ত্রী কী ধরনের ব্যবসায়িক সুবিধা সেখানে নিশ্চিত করে এসেছেন তা জানতে চাই। আমাদের ব্যবসায়িক সুবিধা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় আরো বেশি কার্যকর বিনিয়োগ নিশ্চিত করা, বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য কী কী করে এসেছেন তা জানতে চাই। এ পার্থক্যগুলো আমরা দেখছি ও দৃশ্যমান। 

সেই সূত্র ধরেই যদি বলি বাংলাদেশের তৈরি ওষুধ ওইসব দেশের প্রতিষ্ঠানের পণ্যের চেয়ে কি কোনো অংশে পিছিয়ে?

ওষুধপণ্য রফতানির জন্য রেজিস্ট্রেশনের প্রয়োজন। প্রতিটা দেশের নিজস্ব মানদণ্ড আছে, প্রক্রিয়াগত কিছু বিষয় আছে। নিজ নিজ দেশের সরকার সে মানদণ্ড ও প্রক্রিয়াগত বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠা করেছে। রফতানি বৃদ্ধি করতে নিজ নিজ দেশের জিএমপি (গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস বা ভালো উৎপাদন অনুশীলন) স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী গাইডলাইন মেনে চলতে হয়। এ প্রক্রিয়া অনেক ব্যয়বহুল ও কঠোর। সেই মাপকাঠিতে আমাদের উৎকর্ষের প্রয়োজন। অনেক কোম্পানি আছে যাদের এফডিএর (যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন) সনদপত্র আছে। আবার অনেক কোম্পানি আছে যারা নিজেদের সেভাবে গুছিয়ে নিতে পারেনি। আগামী পাঁচ বছরে ওষুধ শিল্পের এসব খাতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। উন্নত দেশগুলোয় ওষুধের ব্যবহার বেশি, তাদের সক্ষমতা আছে। ওষুধের দাম হিসেবে চিন্তা করলে অনেক বেশি, ভলিউমে হয়তো অতটা না। সেখানে মূল্য পাওয়া যাচ্ছে। ওষুধের এ মূল্য পেতে হলে তাদের মানদণ্ড অনুযায়ী আমাকে উৎপাদন সুবিধা বাড়াতে হবে। সেই মানদণ্ড পরিপূর্ণ করতে ওষুধ প্রস্তুতের প্রক্রিয়া, আরঅ্যান্ডডি (গবেষণা ও উন্নয়ন) থেকে শুরু করে তৈরি পণ্য জনগণের হাতের পৌঁছে দেয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটাই একটা গাইডলাইন। তাহলে আমাদের ওপর আরো বেশি আস্থা তৈরি হবে ও আমরা স্বাচ্ছন্দ্যে এগিয়ে যেতে পারব। আমি মনে করি, সব স্ট্যান্ডার্ডকে মেনে নিয়েও যে মানের সেবা দেয়া সম্ভব তাতে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা আমার পক্ষে কষ্টকর হবে না। 

স্বাস্থ্য খাতে আন্তর্জাতিক একটি কোম্পানি হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে ২০০৬ সালে। প্রতিষ্ঠানটি ক্যান্সার, হেপাটাইটিস, কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ ও চিকিৎসাসেবায় ব্যবহৃত অন্যান্য জীবন রক্ষাকারী ওষুধ প্রস্তুত করছে। বাংলাদেশে ক্যান্সারের ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বীকনের অবস্থান শীর্ষে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ থেকে ক্যান্সারের ওষুধ রফতানিও প্রথম করেছে বীকন। সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে ওষুধের আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখছে প্রতিষ্ঠানটি। বীকন অন্তত ৩০০ জেনেরিকের ওষুধ উৎপাদন করছে। যার মধ্যে প্রায় ৭০টি জেনেরিকের ক্যান্সারের ওষুধ রয়েছে। প্রতি বছর বীকন ১৫-২০টি হাই-টেক নতুন পণ্য নিয়ে আসছে। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জেনেরিক ওষুধের জন্য বিশ্বব্যাপী বীকনের সুনাম রয়েছে। বীকনের রয়েছে ক্যান্সার চিকিৎসায় বিশেষায়িত ব্যবস্থা। এছাড়া বায়ো-টেক এবং অন্য ওষুধপণ্য উৎপাদন করে থাকে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে বীকন এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশে ওষুধ রফতানি করছে। প্রায় দুই হাজার কর্মী এ কোম্পানিতে কাজ করছেন। ফার্মাসিউটিক্যালস প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক একচেঞ্জের তালিকাভুক্ত কোম্পানি।

ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্যানসারের ওষুধ উৎপাদনে বীকন শীর্ষ অবস্থানে। আপনার প্রতিষ্ঠান ২৬৫ জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন করছে। বিশ্ববাজারে বীকনের কোন ওষুধের চাহিদা ভালো কিংবা শক্তিশালী?

আমাদের পণ্যগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত ক্যানসার প্রতিরোধী পণ্যের চাহিদা বেশি। অ্যান্টিভাইরাল পণ্যেরও চাহিদা আছে। যেমন হেপাটাইটিস সি, বি-এর ওষুধ আছে। এ ওষুধগুলোর যথেষ্ট চাহিদা থাকলেও রেজিস্ট্রেশন না থাকায় আমরা সেভাবে রফতানি করতে পারছি না। পেশান্ট সাপোর্ট প্রোগ্রামের আওতায় অনেক রোগী ওষুধ দরকার বলে প্রেসক্রিপশন পাঠাচ্ছেন, অনুরোধ করছেন। আমরা কুরিয়ার সার্ভিসে পাঠাই, বৈধভাবে এ পথ খোলা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নিয়ম অনুযায়ী, পার্সোনাল চাহিদা পূরণের অনুমোদন রয়েছে। ইমোশনাল কিছু প্রতিক্রিয়াও আমরা দেখি। যুক্তরাজ্য এক নারী ও পুরুষ রোগী লাইভ ইন্টারভিউ দিয়েছেন বিবিসিতে। প্রতিবেদনে ওই নারী ও পুরুষ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বাংলাদেশকে নিয়ে। ওষুধ বিক্রির মধ্য দিয়ে মানুষকে যে এতটা সেবা দেয়া যায়, হৃদয়ে স্থান করে নেয়া যায়, ওই চিত্র দেখে মনে হয়েছে। শুধু তা নয়, ভদ্র মহিলা বলছিলেন—আমার ব্রিটেনে জন্ম না নিয়ে বাংলাদেশে নেয়াই উচিত ছিল। তাহলে আরো আগে আমি সুস্থ হয়ে উঠতাম। অরিজিনেটরের দেশে এ ওষুধগুলোর দাম যদি ১০ হাজার টাকা হয়, তাহলে আমরা ১ হাজার টাকায় তা সরবরাহ করতে পারি। এ প্রাইস গ্যাপ (দামের তারতম্য)—এটা দেখতে পাচ্ছি।

ব্রিটেনের কথা বলছি, সেখানে ওষুধ সরবরাহের একটা সিস্টেম আছে। সিরিয়ালি সে ওষুধ গ্রহণ করতে হয়। প্রতি বছর কতজনকে ওষুধ দেবে তা নির্দিষ্ট করা। আপনি আবেদন করলেই কালকে ওষুধ পাবেন, তার সুযোগ নেই। ওষুধ পেতে হলে অপেক্ষা করতে হবে। আপনার সিরিয়াল যখন আসবে তখন। ওই নারী বলছিলেন—আমার সিরিয়াল চার বছর পর। চার বছর অপেক্ষা করে আমি বাঁচব কী মরব তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তারপর ওই নারী বাংলাদেশের বীকনের ওষুধ ব্যবহার করেছেন।

বীকনের ওষুধ উৎপাদন কার্যক্রমে যুক্ত আছেন ইউরোপীয় কনসালট্যান্ট। এফডিএ, এমএইচআরএ, জিএমপি, টিজিএ, ডব্লিউএইচওর মতো বৈশ্বিক প্রভাবশালী সংস্থার মান বজায় রেখে ওষুধ তৈরি করছেন। ওইসব প্রতিষ্ঠানের অ্যাক্রেডিটেশন পাওয়ার ক্ষেত্রে আপনাদের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাই।

একটু দেরিতে আমরা চেষ্টা শুরু করেছি। উন্নত দেশগুলোয় ওষুধ রফতানির জন্য ওইসব দেশের মানদণ্ড বজায় রাখার মতো সুবিধাদি সৃষ্টি করতে হয়। ২০০৪ সালে আমরা আমাদের সুযোগ-সুবিধা উন্নয়নের দায়িত্ব দিয়েছিলাম স্পেনিশ একটি কোম্পানিকে। কোম্পানিটি ড্রয়িং-ডিজাইন করে দিয়েছে, সেভাবেই কারখানা উন্নয়ন করেছিলাম। এরপর অনেক দিন পার হয়ে গেল। ক্যানসার প্রতিরোধী পণ্য তৈরিতে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য আইসোলেশন অথবা এ ধরনের কন্টেমেন্ট মেশিন ছিল না। পৃথিবী এগোচ্ছে প্রতিনিয়ত। ক্যানসার প্রতিরোধী পণ্যগুলো সাইটোটক্সিক প্রডাক্ট। এগুলো অনেক সময় ঝুঁকি তৈরি করে; পরিবেশ, কন্টামিনেশনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। আইসোলেটর আবিষ্কার হওয়ায় উন্নত দেশগুলো শর্ত দিচ্ছে আইসোলেটর বাধ্যতামূলক করার। যদিও আমাদের দেশে আইসোলেটরের বাধ্যবাধকতা নেই। বাইরে, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোয় রফতানি করতে হলে আমাকে আইসোলেটর আনতে হবে। সেভাবে আমরা মেশিনাদি আপগ্রেডেন চেষ্টা করছি। এজন্য নতুন করে আলাদা ভবন নির্মাণ করব। এর মাধ্যমে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকায় রফতানি সহজ হবে। সেফালোস্পোরিন প্রডাক্টের জন্য নতুন সুযোগ-সুবিধা উন্নয়ন করছি। সেফালোস্পোরিন ভবনটিকে আমরা ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ডেই করেছি। আশা করছি আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে সার্টিফিকেট পেয়ে যাব। এতে অ্যান্টিবায়েটিক রফতানিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

বিশ্ববাজারে ওষুধ কূটনীতি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশে ও উন্নত বিশ্বের ওষুধ কূটনীতির মধ্যে পার্থক্য কী দেখছেন?

উন্নত দেশগুলো ব্যবসা নিশ্চিত করতে সবকিছু করতে পারে। যত কূটনীতি আছে সবকিছুর পেছনে রয়েছে তাদের স্বার্থ, তাদের ব্যবসা নিশ্চিত করতে হবে। বিজনেসের জন্য তারা যেকোনো কিছু করতে পারে।

ওষুধ রফতানিতে ইউরোপের বাজারে এখনো আমরা অবস্থান তৈরি করতে পারিনি। এর পেছনে উল্লেখযোগ্য কী কারণ দেখছেন?

স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা এবং প্রক্রিয়াকরণ বাড়ানো। ওখানে যেতে হলে আমাকে তার দেশের নিয়মকানুন মেনে যেতে হবে। পণ্য তৈরি থেকে শুরু করে গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত যে নিয়মকানুন রয়েছে, তার প্রত্যেকটি ধাপ অনুসরণ করতে হবে। তাহলে আর কোনো বাধা থাকবে না। এসব প্রক্রিয়া মেনে উৎপাদনে যাওয়ার প্রক্রিয়াটা অবশ্য অনেক দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল। তবে ব্যয়বহুল হলেও এর কোনো বিকল্প নেই। ইউরোপে যেতে হলে আমাকে এসব মেনে নিয়েই যেতে হবে।

ওষুধ শিল্পে গবেষণা খুবই অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। সে হিসেবে এ নিয়ে দেশে গবেষণা খুবই কম হয়। গবেষণা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

কোনো কোনো কোম্পানি এরই মধ্যে এফডিএ, এমএইচআরের (যুক্তরাজ্যের মেডিসিনস অ্যান্ড হেলথ কেয়ার প্রডাক্ট রেগুলেটরি এজেন্সি) অনুমোদন পেয়েছে। সব কোম্পানিই ধীরে ধীরে নিজেদের আপগ্রেড করার চেষ্টা করছে। এর জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কোনো নির্দেশনা নেই। আমরা আমাদের নিজস্ব জিএমপি গাইডলাইন অনুযায়ী চলছি। যারা বিশ্ববাজারে ভূমিকা রাখতে চায় তারা নিজ উদ্যোগেই এসব কার্যক্রম শুরু করেছে। আমরাও চেষ্টা করছি কীভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উত্তর আমেরিকার রেজিস্ট্রেশন পাওয়া যায়। রেজিস্ট্রেশন না হলে কোনোভাবে রফতানি করা সম্ভব হবে না। আর খুবই ছোট পরিসরে গবেষণা হচ্ছে। শুধু ফর্মুলেশনের ক্ষেত্রে গবেষণা হচ্ছে, তা সবাইকে করতে হয়। এপিআইয়ের ক্ষেত্রে বা নিয়মাবলি উন্নয়নের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত আমার জানামতে নিজস্ব মলিকিউল একটাও ডেভেলপড করতে পারিনি। এমনকি পণ্য তৈরির জন্য যেসব কাঁচামাল আমরা আমদানি করছি তারও কোনো বিকল্প তৈরি করতে পেরেছি বলে মনে হয় না। এজন্য আমাদের ব্যাপকভাবে কাজ করতে হবে, সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের কাছে আবেদন থাকবে, গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য প্রণোদনা, বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা, পরীক্ষাগার প্রস্তুত করে দেয়া।

চীনে দেখেছি, সরকারের পক্ষ থেকে ল্যাবরেটরি তৈরি করা আছে। কোনো কোম্পানি চাইলে সরকারের কাছ থেকে অনুমোদন নিয়ে ল্যাবরেটরিতে গবেষণা করতে পারে। ফলে কারো ল্যাবরেটরি না থাকলেও চাইলে সেখানে গবেষণা করতে পারছে। এটা অনেক বড় উৎসাহ। তাছাড়া গবেষণার কাজ অনেক বেশি ব্যয়বহুল। কতদিন কাজ করলে একটা মলিকিউল ডেভেলপড করা সম্ভব তার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। হয়তো কেউ ১০ বছর কাজ করেও কোনো কিছুই করতে পারেনি অথবা ছয় মাস কাজ করে নতুন মলিকিউল উন্নয়ন করেছে। এ অনিশ্চিত সম্ভাবনা নিয়েই কাজ করতে হয়। আরঅ্যান্ডডির প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি অনেক ব্যয়বহুল। সেজন্য আমাদের ব্যবসাটাও সেভাবে হচ্ছে না। আমাদের পণ্যের মূল্য খুবই কম। আর আমরা খুব দাম নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। সরকারের অনুমোদন ছাড়া কোনো পণ্যের দাম আমরা নির্ধারণ করতে পারি না। আরঅ্যান্ডডির জন্য বরাদ্দ রাখব কীভাবে? ১০০ কোটি টাকা যদি কেউ বিক্রি করি, সেখানে লাভ থাকে ১০-১৫ শতাংশ। তার মধ্যে থেকে ট্যাক্স, ভ্যাট বাদ দিয়ে ৫-৭ শতাংশ থাকে। এ অবস্থায় টিকে থাকাই মুশকিল। এ দিয়ে যদি আবার আরঅ্যান্ডডি করতে হয় তাহলে তো আরো মুশকিল। দু-তিনটা কোম্পানির বিক্রি কিছুটা বেশি। তবে গবেষণা ব্যয়বহুল হওয়ায় তারাও এগোচ্ছে না। সরকার এগিয়ে এলে কয়েক বছরের মধ্যে একটা পরিবর্তন আনতে পারব।

২০৩৪ সালের পর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মেধাস্বত্ব সুবিধা আর থাকছে না। যদিও বাংলাদেশের জন্য তার আগেই এ সুবিধা শেষ হয়ে যাবে। নতুন মলিকিউল উন্নয়ন করতে না পারলে সে সময় ওষুধের দাম বাড়বে। এ অবস্থায় দেশীয় ওষুধ শিল্পের বিকাশে কী নীতি বা পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে? এ বিষয়ে এপিআই পার্কের ভূমিকা কী হতে পারে?

ওষুধ শিল্পগুলো নিজস্ব উদ্যোগে কমবেশি চেষ্টা করছে, কিন্তু সেটা ব্যাপক না। সরকারের পক্ষ থেকেও গবেষণার জন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায় না। সব মিলিয়ে এ বিষয়ে সহযোগিতা আসা উচিত। এপিআই পার্কের দুই যুগ হয়ে গেলেও সব সুবিধা এখন পর্যন্ত আসেনি। বলা হয়েছিল ওয়ান স্টপ সাপোর্ট পাওয়া যাবে। আমার জানামতে, এখন পর্যন্ত গ্যাসই যায়নি সেখানে, পানির সরবরাহ নিশ্চিত হয়নি, ইকুইপমেন্ট ট্রিটমেন্ট, ওয়েস্ট ম্যাটেরিয়াল ট্রিটমেন্ট সম্পন্ন হয়নি। জায়গার পরিমাণ খুব কম হওয়ায় খুব বেশি কারখানাও সেখানে করা যাবে না। একেকটা প্লটের সাইজ ১০ বিঘা। দুটি প্লট বরাদ্দ পেলেও ২০ বিঘার বেশি হচ্ছে না। কিন্তু আমাদের সত্যিকারার্থে বাল্ক এপিআইয়ে যদি আমরা উৎপাদনে যাই, সেগুলোয় গেলে জায়গা লাগবে ৫০ বিঘা, ১০০ বিঘা। ২০০ একর জায়গা এখন পর্যন্ত ৪০ জনকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তবে এটা সরকারের ইতিবাচক ভাবনার বহিঃপ্রকাশ। আমাদেরও এগিয়ে আসা উচিত। না হলে সামনের দিনগুলো আমাদের জন্য কষ্টকর। 

বর্তমানে বাংলাদেশের বাজার ও বিশ্ববাজারে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছেন?

এটাকে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করি না। আমরা যেসব দেশে রফতানি করি, সুযোগ-সুবিধা তাদের স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী হওয়া দরকার। কাঁচামাল প্রক্রিয়াকরণ থেকে শুরু করে পুরো প্রক্রিয়া তাদের নিয়ম অনুযায়ী করতে হবে। এটা চ্যালেঞ্জ না, আমাদের দুর্বলতা নিঃসন্দেহে। আর আমরা যে মানদণ্ডে ওষুধ প্রস্তুত করছি প্রসেসের দিক থেকে ঠিক আছে। আমাদের পণ্যের কোয়ালিটি ‘প্রুভেন কোয়ালিটি’। চিকিৎসক ও রোগীরা লাভবান হচ্ছে। ওষুধ কাজ করছে বলেই তো তারা চিকিৎসা নিচ্ছে। ইউরোপে আমাদের পণ্য নিয়ে সেবাগ্রহণ করছে। মানুষ ব্যবহার করছে। আমাদের পণ্য নেয়ার জন্য কিছুদিন আগে একজন সুইজারল্যান্ডে জাতীয় সংসদে আপিল করেছে। এ নিয়ে সেখানে বিপুল তর্কবিতর্ক হয়েছে। স্থানীয় ওষুধ কোম্পানিগুলোর মূল্যনির্ধারণ নিয়ে নানা বিতর্ক হয়েছে। তারা সরকারের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডাও করেছে। এটা আমাদের অনুপ্রাণিত করে।