ভূরাজনীতির প্রভাবে ২০২২-এ পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজার পৃথিবীর অনেক দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। আবার অনেক দেশ সে ধাক্কা সামলে উঠলেও বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি। পর্যাপ্ত জ্বালানির সংকুলান করতে না পারায় গত জুনেও যথেষ্ট লোডশেডিং হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রায়ই ফুটে উঠছে গ্রাম বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে অসহনীয় মাত্রার লোডশেডিংয়ের ছবি। শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এমন কথা মিডিয়ায় যেমন প্রচারিত হচ্ছে, তেমনি বিভিন্ন অংশীজনও উল্লেখ করছেন। ব্যাংকগুলো আমদানি পত্র খুলতে চাচ্ছে না, আবার বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতিও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। অথচ এ বছরের শুরুতে গ্যাস এবং পরবর্তী সময়ে তিন দফায় বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় করাতে ধারণা করা হয়েছিল নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত হবে।
বাস্তবে কয়লা, গ্যাস ও তেলের বিল বকেয়া থাকায় বেশকিছু বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ রাখতে বা কম সক্ষমতায় চালাতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি আমাদের স্বল্প ও দীর্ঘ উভয় মেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা যে বেশ খানিকটা হুমকির মাঝে রয়েছে তার ইঙ্গিত দেয়। কেননা এক বছর পেরিয়ে গেলেও কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য স্বাভাবিক হলেও আমরা পরিস্থিতি পুরো নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যাহত হতে পারে মাত্রাতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতার কারণে। যেমন মে ২০২৩-এ বিদ্যুৎ খাতের জ্বালানিতে ব্যয় হওয়া ৩৫.৬৪ বিলিয়ন টাকার ৩০ বিলিয়নের বেশি ব্যয় হয়েছে আমদানিতে।
নতুন যে প্রকল্পগুলো থেকে গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হচ্ছে তার বেশি ভাগ আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক। গড় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়ার সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতের রাজস্ব ঘাটতিও যেন পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে।
দেরিতে হলেও সমুদ্রে গ্যাস উত্তোলনের প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে দেশীয় উৎপাদনের ৫০ শতাংশের বেশি সরবরাহ করা বিবিয়ানার গ্যাস কমে গেলে বড় সংকটে পড়তে হতে পারে।
এক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানি হতে পারত অনেক বড় সহায়। দুই হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ দিনের পিক ডিমান্ড মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। লোডশেডিং কমানোর সঙ্গে উচ্চমূল্যের জ্বালানির ব্যবহার কমানো যেত। এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, দুই হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ এবং ডিজেলচালিত সেচ ব্যবস্থাকে সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হলে বার্ষিক জ্বালানি সাশ্রয় এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের চেয়েও বেশি হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির উচ্চমূল্য বিবেচনায় নিলে এ সাশ্রয় আরো বাড়বে।
তবে অতীত নিয়ে পড়ে থাকার সুযোগ নেই। সম্প্রতি গ্রিডে যুক্ত হয়েছে ২০০ মেগাওয়াটের নতুন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র। কিছুদিন আগে নির্মাণাধীন বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের ২০ মেগাওয়াট সংযুক্ত হয়েছে গ্রিডে। এদিকে ডেনমার্কের দুটো প্রতিষ্ঠান ৫০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব জমা দিয়েছে।
কাজেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। একটি পূর্ণাঙ্গ ভূমি জরিপ করে ইউটিলিটি স্কেল সৌরবিদ্যুৎ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়ার সঙ্গে অফশোর বায়ুবিদ্যুতের দিকে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। আর কারখানা, বাণিজ্যিক ভবন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন ত্বরান্বিত করা উচিত। এতে দিন ও রাতের পিক ডিমান্ড নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে পূরণ করা যাবে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির আমদানি কমিয়ে আর্থিক সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।
এর সঙ্গে ডিজেলচালিত সেচ ব্যবস্থায় দ্রুত সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে হলে একটি বৃহৎ প্রোগ্রাম নিলে দ্রুত ফল পাওয়া যেতে পারে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অর্থায়নে ইডকলের অনেক অবদান থাকলেও পুরো সেচ ব্যবস্থা পরিবর্তনে এবং কারখানা বা বাণিজ্যিক ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে যে অর্থায়ন প্রয়োজন তা ইডকলের একার পক্ষে সম্ভব নয়। অন্যান্য ব্যাংককেও এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়নে ব্যাংকগুলোকে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিতে পারে।
অন্যদিকে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) নীতিমালা প্রণয়ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছে। ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশে যে আমদানি শুল্ক রয়েছে তা প্রত্যাহার করতে স্রেডা অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে। তবে স্রেডার লোকবল ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে।
ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অনেক প্রকল্পই আইপিপির মাধ্যমে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড কিছু ইউটিলিটি স্কেল প্রকল্প নিজে বাস্তবায়ন করলে খরচ কমতে পারে। সাশ্রয়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুফল পেতে হলে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।
পরিশেষে জ্বালানি খাতের নিরাপত্তায় বিভিন্ন জ্বালানির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে কিন্তু নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না। নবায়নযোগ্য জ্বালানি শুধু সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ দেবে তাই নয়, এটি অনেক বৈদেশিক মুদ্রারও সাশ্রয় করবে।
শফিকুল আলম: জ্বালানি বিশ্লেষক, ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস। প্রকৌশলী এবং পরিবেশ অর্থনীতিবিদ





