বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করে আসছে বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান সামিট গ্ৰুপ। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতায় বেসরকারি খাত থেকে ২০ শতাংশ অংশগ্রহণ রয়েছে কোম্পানিটির। বিদ্যুতের পাশাপাশি জ্বালানি খাতে এলএনজি সরবরাহে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ রয়েছে সামিটের। এখন নবায়নযোগ্য খাতে বিনিয়োগের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতে কীভাবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাশ্রয়ী মূল্যে গ্রাহককে বিদ্যুৎ দেয়া যায়, সেই কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে সামিট গ্ৰুপ। এসব বিষয় নিয়ে বণিক বার্তার পক্ষ থেকে কথা হয় সামিট গ্রুপ অব কোম্পানিজের পরিচালক ও বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ফয়সাল খানের সঙ্গে
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সামিট গ্রুপের বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ রয়েছে। সরকার বিদ্যুৎ সক্ষমতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যাপকভাবে জোর দিয়েছে। বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে সামিট কী করছে?
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগে সামিটেরও বড় পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ খাতে বিনিয়োগের আগে অনেকগুলো ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপার রয়েছে। বর্তমানে আমরা সোলার ও উইন্ড দুটি উৎস নিয়ে কাজ করছি। আমরা অর্থনৈতিক মডেল তৈরি করছি। বুঝতে চেষ্টা করছি, কীভাবে এ জ্বালানিগুলো দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে আরো সুলভ মূল্যে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়া যায়।
আমাদের দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দাম অনান্য জীবাশ্ম জ্বালানির চেয়ে বেশি। এটার বড় কারণ হচ্ছে এ খাতের টেকনোলজি ও উপকরণগুলোর দাম অনেক বেশি ও আমদানিনির্ভর। ভবিষ্যতে এ খাতে কারিগরি সহায়তা ও দক্ষ প্রকৌশলী তৈরিতে বিনিয়োগ পরিকল্পনা রয়েছে কিনা?
নিশ্চয়ই। বাংলাদেশে এখন সোলার প্যানেল তৈরি করা যায়। এরই মধ্যে দেশে মোবাইল ফোন, হোয়াইট অ্যাপ্লায়েন্সেস (যেমন রেফ্রিজারেটর, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র)–সবই তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এখানে ম্যানুফ্যাকচারিং শুরুর জন্য ক্রিটিক্যাল মাস (ন্যূনতম চাহিদা) তৈরি করতে হবে। শুধু এক হাজার মেগাওয়াট সোলার প্লান্ট বানানোর জন্য ফ্যাক্টরি বানাব, এটা কমার্শিয়ালি ভায়াবল (বাণিজ্যিকভাবে টেকসই) হবে না। বরং সৌরবিদ্যুতের উৎসগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর জায়গা তৈরি হলে এ খাতে কারিগরি সক্ষমতা যেমন বাড়ানো যাবে, তেমনি ব্যবসাটাও লাভজনক হবে।
সামিট এখনই ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের দিকে যাচ্ছে না। তার কারণ সোলার প্যানেল ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের জন্য টেকনিক্যাল সাপোর্ট লাগবে, এক্সপার্টিজ লাগবে, যেটা আমাদের এখানে পর্যাপ্ত নেই। তবে আমরা আশা করি, বিদেশী রাষ্ট্র ও কোম্পানির সঙ্গে কোলাবরেশন করে বাংলাদেশে ধীরে ধীরে টেকনোলজি ট্রান্সফার হবে।
আপনারা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাত নিয়ে কাজ করছেন, বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য খাতে বিনিয়োগ ও সক্ষমতা না বাড়ার কারণ কী?
বাংলাদেশে সোলার ও উইন্ডের সক্ষমতা খুব বেশি তৈরি হয়নি। তবে প্রতিবেশী দেশ ভারতের চিত্র আলাদা। তাদের দিকে তাকালে দেখা যাবে, সেখানে বড় একটি অংশে সোলার দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। ওদের মরুভূমি অঞ্চল অর্থাৎ গুজরাট, রাজস্থান এসব এলাকায় বহু অনাবাদি জমি রয়েছে। সেখানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। ওইসব এলাকা থেকে তারা সোলার দিয়ে বিদ্যুৎটা সবচেয়ে বেশি পায়। আমাদের দেশে গ্রীষ্মকালে অনেক বেশি মৌসুমি বায়ুর প্রভাব থাকে। আবার শীতকালে অনেক কুয়াশা থাকে। ফলে ভারতের মতো আমাদের দেশে সূর্যের তাপ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন একটু কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে আমরা সোলার প্যানেলের সঙ্গে যদি ব্যাটারি ব্যবহার করতে পারতাম, তাহলে এটা আরো বেশি কার্যকর হতো। তবে ব্যাটারি স্টোরেজের সঙ্গে বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ার ব্যাপারটি জড়িত। এতে আবার যে পরিমাণ বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাবে, তা আমাদের দেশের জন্য সাশ্রয়ী হবে না।
বিদ্যুৎ খাতে সরকার আঞ্চলিক বাণিজ্য করার পরিকল্পনা নিয়েছে। বিশেষ করে ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বিদ্যুৎ বাণিজ্যের পরিকল্পনা করছে। এরই অংশ হিসেবে নেপাল থেকে জলবিদ্যুৎ আনার একটি চুক্তি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। রিজিওনাল ট্রেডে বিদ্যুৎ খাতে সফলতা কতটুকু?
আমি মনে করি, রিজিওনাল কানেক্টিভিটি আমাদের সামনে এগিয়ে চলার অন্যতম মাধ্যম। উপমহাদেশে যে কয়টি দেশ আছে, তাদের বিদ্যুৎ খাতে একেক ধরনের সক্ষমতা আছে। যেমন নেপালের জলবিদ্যুতের সক্ষমতা আছে। ভারতের আছে সৌরবিদ্যুৎ। তাদের নিজেদের যতটুকু চাহিদা আছে তার চেয়ে অনেক বেশি পটেনশিয়াল (সম্ভাবনা) আছে। সুতরাং আমরা এ সম্পদকে কেন নষ্ট হতে দেব? পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে আমরা কেন এ সম্পদ ব্যবহার করব না? আমরা আশা করি, রিজিওনাল কানেক্টিভিটি হওয়া দরকার, রিজিওনাল গ্রিড বানানো দরকার। যদিও সেটি এখন করার পরিকল্পনা করছে সরকার। ভারত থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানির যে অভিজ্ঞতা, তাতে আন্তঃবিদ্যুৎ বাণিজ্যের বিষয়টি আরো জোরালো হওয়া দরকার। কভিডের সময় জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশেও বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ভারত থেকে যে বিদ্যুৎ আমরা কিনেছি সেটি কিন্তু আগের দামেই কিনতে পেরেছি। ফলে আন্তঃবিদ্যুৎ, আন্তঃবাণিজ্য ও আন্তঃগ্রিড চালু হওয়াটা খুব জরুরি।
নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের জন্য সামিটের পক্ষ থেকে আমরাও ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) ও ভারতীয় একটি কোম্পানির সঙ্গে কাজ করেছি। নিরবচ্ছিন্নভাবে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব। এটা সম্ভব হবে, কারণ আমরা ওখানে সোলার, উইন্ড আর ব্যাটারি তিনটি মিলিয়ে একটা হাইব্রিড পাওয়ার প্লান্ট তৈরি করতে চাচ্ছি। যেখান থেকে আমরা খুবই ভালো মূল্যে বাংলাদেশে ২৪ ঘণ্টা ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারব। ভারতে সৌরবিদ্যুতের বাজারটা এতই বড় আর উন্নত হয়েছে যে সেখানে সোলার, উইন্ড ও ব্যাটারির সমন্বয়ে প্লান্ট তৈরি করা সম্ভব। তবে সেটা আমাদের দেশে এখনো সম্ভব হচ্ছে না।
প্রথমত, এখানে ফটোভোল্টিক পাওয়ারটা কম। তার ওপর দেশে ভূমির স্বল্পতা আছে। আবার আমরা বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশ। এজন্য আমরা মনে করি, বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার অন্যতম মাধ্যম রিজিওনাল ট্রেড। ওটা করলে সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য নবায়যোগ্য জ্বালানি আমরা পেতে পারি।
রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে জোর দিয়েছে। বিশেষ করে তারা এখন সৌরবিদ্যুতের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। একই সঙ্গে দেশে এখন অনেক বিদেশী কোম্পানি সরকারকে বায়ু, জলবিদ্যুৎ সহায়তা দিতে চাইছে। বিদেশী এসব কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশে এ খাতে বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা রয়েছে কিনা?
কিছুদিন আগে ডেনমার্কের একটি প্রতিষ্ঠান ‘কোপেনহেগেন পার্টনার্স’ উইন্ড পাওয়ার প্লান্ট করার একটি প্রস্তাব দিয়েছে। আমরা তাদের সঙ্গে কাজ করতে চাচ্ছি। আমরা কয়েকটি এলাকায় সম্ভাব্যতা যাচাই করছি। ভালো খবর হচ্ছে, মাত্র ৫-৬ মিটার পার সেকেন্ড গতিবেগেও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। আমরা যেহেতু একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, সেজন্য আমরা দেখছি যে এটা ইকোনমিক্যালি ভায়াবল (অর্থনৈতিকভাবে টেকসই) হয় কিনা।
নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে সরকারের এখনো ১০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা এখন সে লক্ষ্য অর্জনে বেসরকারি খাত ও বিনিয়োগে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের নবায়নযোগ্য নীতিমালা বিনিয়োগবান্ধব নয়। বেসরকারি খাতও সেটিই মনে করে কিনা?
আমরা চাই গ্রিন এনার্জি খাতটি খুব বড়ভাবে বাংলাদেশে গড়ে উঠুক। আর তা করতে হলে অবশ্যই বিনিয়োগকারীদের এ খাতে প্রণোদনা দিয়ে উৎসাহ দিতে হবে। শুধু কাস্টমসে সোলার প্যানেল এবং এর যন্ত্রপাতির শুল্ক কমিয়ে দিলেই দেখা যাবে আরো কম মূল্যে সোলার পাওয়ার মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া যাবে। অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে করহারও অনেক বেশি। এখানে করপোরেট কর, লভ্যাংশ কর, ব্যক্তিগত কর–অনেক স্তরেই করারোপ হয়। যেসব খাতকে দ্রুত উন্নয়নের আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন সেসব খাতে করছাড়, আর্থিক প্রণোদনাগুলো আরো আকর্ষণীয় করতে হবে। আমি আশাবাদী বিনিয়োগটা অবশ্যই বাড়বে।
বাংলাদেশের মতো দেশে ১০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বেশ কঠিন। কারণ প্রকৃতিগতভাবে বলা হয়, আমাদের দেশে সোলারের সম্ভাব্যতা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এখানে যে ধরনের সূর্যের তাপ দরকার, সেটি সবসময় সঠিকভাবে পাওয়া যায় না। আমরা নন-ফুয়েলঅ্যাবল না দেখে যদি রিনিউয়েবল বা গ্রিন এনার্জির বিষয়টি বিবেচনা করি, তাহলে খুব দ্রুত আমরা ১০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে ফেলব। এখন আমাদের নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট হচ্ছে। এটি ক্লিন ফুয়েল-গ্রিন এনার্জি। এভাবেই নবায়নযোগ্য খাতে সরকারের যে লক্ষ্যমাত্রা সেটি অর্জন হবে।





