জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন এ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিকা মাহজাবিন
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দ্বিতীয় বিপ্লব বা বাকশাল ধারণাটি ঠিক কী ছিল? এর সঙ্গে অনেকে সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচির নৈকট্য দেখতে পান। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসেবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করবেন কি?
১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যেটাকে বঙ্গবন্ধু বলেছেন ‘সিস্টেম চেঞ্জ’। এ সিস্টেম চেঞ্জ কীভাবে হলো? কতগুলো বিষয়কে সামনে রেখে তিনি সিস্টেম চেঞ্জের কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু সে সময় প্রধানমন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপতি হলেন।
সিস্টেম চেঞ্জের পাঁচটি কর্মসূচি ছিল। এ কর্মসূচিগুলোকে বুঝতে পারলে বঙ্গবন্ধুকে বোঝা যাবে এবং তার লক্ষ্যগুলো বোঝা যাবে। এর একটি হলো জাতীয় ঐক্যের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠন (বাকশাল)। এটিকে প্লাটফর্ম বলা যায়। যেখানে প্রাধান্য পেয়েছিলেন কৃষক ও শ্রমিকরা।
দ্বিতীয় কর্মসূচি হলো, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। বঙ্গবন্ধু বারবার বলেছেন, ‘ভিক্ষুকের জাতির কোনো মর্যাদা নেই।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘জাপানের ভূমির চেয়ে আমাদের ভূমি অনেক বেশি উর্বর। তারা যদি দুবার তিনটা ফসল ফলাতে পারে তাহলে আমরা কেন পারব না।’ অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু চেয়েছেন দুইটা ফসল ফলাতে পারলে আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে যাব এবং অন্যের ওপর আমাদের নির্ভর করতে হবে না।
তৃতীয় লক্ষ্য হলো দুর্নীতির মূল উৎপাটন। দুর্নীতি প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু দুঃখ নিয়ে বলেছেন, ‘পাকিস্তানিরা আমাদের সব লুট করে নিয়ে গেছে, রেখে গেছে কতগুলো দুর্নীতিবাজ। এদের যদি নিয়ে যেত তাহলে আমি বাঁচতাম।’ অর্থাৎ দুর্নীতিমুক্ত সমাজ তিনি চেয়েছেন।
চতুর্থ কর্মসূচি হলো জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ। সে সময় ২ দশমিক ৮ শতাংশের মতো বাড়ছিল। একই হারে বাড়তে থাকলে মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকবে না। সেজন্য আমাদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে যেতে হবে।
পঞ্চমটি হলো প্রশাসন। তিনি প্রশাসন পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরণ চেয়েছেন। শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক প্রশাসন থাকলে হবে না।
তিনি এও বলেছেন, কৃষি ও শিল্পে উন্নয়ন করতে হবে। তারপর তিনি বলেছেন, মাল্টিপারপস কো-অপারেটিভস গড়ে তুলতে হবে। অর্থাৎ প্রতিটি গ্রামে একটি কো-অপারেটিভস হবে, যেখানে কেউ সেলাই করবে, কেউ হাঁস-মুরগি পালন করবে এমনইভাবে উৎপাদন করা হবে। তবে উৎপাদিত পণ্যের বণ্টন হবে তিন ভাগে। একটি অংশ পাবেন কৃষক, অন্য একটি পাবে মালিক এবং সরকারি কোষাগারে যাবে এক অংশ। কিন্তু মাল্টিপারপস কো-অপারেটিভ মানে জমি নিয়ে যাওয়া নয়। সম্পদের সুষম বণ্টনের কথা তিনি তার কর্মসূচিতে বলেছেন। এতে করে সম্পদ কুক্ষিগত হবে না।
অনেকে সমাজতন্ত্র আর বাকশালকে একই বিষয় মনে করে। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। বাকশাল তার দ্বিতীয় বিপ্লব কর্মসূচির একটি অংশ। তবে তিনি এও বলেছেন রাষ্ট্রের অবস্থা ভালো হলে জাতীয় দল থাকবে না। বঙ্গবন্ধুর জীবনের সংগ্রাম থেকে সে বিষয়টি খুব ভালোভাবে বোঝা যাবে। বঙ্গবন্ধু আজীবন সংগ্রাম করেছেন বাঙালি মানুষের মুক্তি, দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী। ‘আমার দেখা নয়া চীন’ বইটিতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘চীনের সবকিছু আমার ভালো লাগে। কিন্তু সেখানকার মানুষের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকাটায় আমি ব্যথিত হই।’ এগুলো থেকে বোঝা যায় বঙ্গবন্ধুর ছয় দফায় বহুদলীয় গণতন্ত্র আছে এবং যুক্তফ্রন্টেও ছয় দফার কথা বলা আছে। পাকিস্তানের শুরু থেকেই কিন্তু তিনি সংসদীয় গণতন্ত্রের কথা বলেছেন।
শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধু একটিমাত্র জাতীয় দল গঠন করলেও সেখানে নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখলেন। সে সময় বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি হয়ে গেলেও ৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতিও জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন। কাজেই নির্বাচন ব্যবস্থা তিনি বাদ দেননি।
তিনি বলেছিলেন, এটি হলো আমার একটি অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ। উদ্ভূত সহিংশ পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করে স্থিতিশীল পরিবেশ আসলে আমি আবার বহুদলীয় গণতন্ত্রে ফিরে যাবে। তবে, বঙ্গবন্ধু সবসময়ই দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সমাজতন্ত্র চেয়েছেন। তিনি মনে করতেন সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ছাড়া মানুষের মুক্তির কোনো পথ নেই।
ইতিহাসে দেখা যায় বিপ্লব বা স্বাধীনতা সংগ্রামের পর পরই সমধর্মী সংগঠন বা রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে একটি বিপ্লবী জাতীয় সরকার তৈরি হয় (যেমন কিউবা)। কিন্তু বঙ্গবন্ধু বাকশাল করলেন স্বাধীনতার কয়েক বছর পর। বাকশাল কি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরই হতে পারত?
বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর ১১ জানুয়ারি তিনি আর রাষ্ট্রপতি না থাকার জন্য অর্ডার দিলেন। পরের দিনই তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন। সে সময় রাষ্ট্রপতি হন আবু সাঈদ চৌধুরী। এটির মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু তার ছয় দফার সংসদীয় গণতন্ত্রের অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হননি। তিনি রাষ্ট্রের পিতা, স্রষ্টা হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে প্রটোকল অনুযায়ী এক ধাপ নিচে নামালেন। তিনি স্বেচ্ছায় ও স্বজ্ঞানে এক ধাপ নিচে গেলেন। তার বহুদলীয় গণতন্ত্রের অঙ্গীকার হিসেবে ১৯৭২ সালে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সৃষ্টি হয়েছে। রাজনীতির মাঠে সে সময় মওলানা ভাসানীর ন্যাপ, ন্যাপ (মোজাফফর), গণ আজাদী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি, আতাউর রহমানের জাতীয় লীগের মতো একাধিক দল ছিল। মানুষের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতামূলক রাখার জন্য তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের ব্যবস্থা রেখেছেন। তবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিই চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলেছেন, আমি সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি বিশ্বাস করি কিন্তু আমি কমিউনিস্ট নই।
বঙ্গবন্ধু তার অঙ্গীকার রক্ষা না করে তখনই যদি সিস্টেম চেঞ্জ করতেন তাহলে তিনি সেই অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হতেন। কিন্তু এখন আমি মনে করি যে সেই সময় করাটাই যথোপযুক্ত ছিল। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যারা আছেন সব দলকে নিয়ে সরকার গঠন করা। তাহলে তিনি বাংলাদেশ বিপ্লবের পক্ষেই করছেন, যা চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে তিনি করেছেন।
কিন্তু তিনি সংসদীয় গণতন্ত্র, বহুদলীয় গণতন্ত্র ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতায় চরমভাবে বিশ্বস্ত থাকায় তা করতে পারেননি। তার ভাবনা ছিল, বহুদলীয় গণতন্ত্রের মাধ্যমে তাকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে হবে। তিন বছর সাত মাস তিনি সময় পেয়েছিলেন। সে সময় তিনি গণতন্ত্রের পক্ষে লড়াই করেছেন। তার চ্যালেঞ্জ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, যেখানে রিজার্ভ ছিল শূন্য, সেটিকে গড়েছেন।
সে সময় আওয়ামী লীগের ছাত্রলীগ থেকে বেরিয়ে আসা একটি অংশ আ স ম আব্দুর রব, সিরাজুল আলম খান, মেজর জলিলরা বিপ্লবী স্লোগান নিয়ে ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জাসদ গঠন করল।
এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা আকাশচুম্বী হয়েছে। ফলে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মতো চমকপ্রদ স্লোগান নিয়ে জাসদের রাজনৈতিক আগমন তরুণদের একটি অংশকে আকৃষ্ট করেছিল। তারা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে তীব্রভাবে প্রচারণা শুরু করে। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় মওলানা ভাসানীর ন্যাপ। এছাড়া সে সময় ছিল সিরাজ সিকদারের সর্বহারা আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টি। এছাড়া আব্দুল হকের ইস্ট পাকিস্তান মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্টসহ আরো কিছু কট্টর চীনপন্থী দল ছিল। তারা সবাই মিলে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করে যাতে পাঁচজন সংসদ সদস্যকে হত্যা করা হয়। কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়। এছাড়া তারা জাসদের নেতৃত্বে ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও করতে গিয়েছিল।
এই সার্বিক অবস্থা থেকে দেখা চরম সন্ত্রাসী ও অঘোষিত যুদ্ধ সরকারের বিরুদ্ধে শুরু হলো। এমনই একটি নাশকতামূলক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমাদের সংবিধানের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার কোনো বিধান না থাকা সত্ত্বেও ১৯৭৩ সালে এসে তা করা হয়। দেশে তা প্রথম প্রয়োগ করা হয় ১৯৭৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু সবকিছু গণতান্ত্রিক উপায়ে করতে চেয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিকভাবে তখন স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল। ফলে যেভাবে সহযোগিতা পাওয়া দরকার সেভাবে পেলেন না। একই সঙ্গে আন্ডারগ্রাউন্ডের বামপন্থীরা একটি অঘোষিত যুদ্ধ করল।
এমনই এক অবস্থায় সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে রক্ষা করার জন্য এবং বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক স্বপ্ন যে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য তিনি সংবিধানের পরিবর্তন করে সিস্টেম চেঞ্জ করলেন। যেটাকে বঙ্গবন্ধু বললেন দ্বিতীয় বিপ্লব।
বাকশাল করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার সহকর্মী এবং দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির কাছে কতটা সহায়তা পেয়েছিলেন?
সে সময় অনেকের কাছ থেকেই বঙ্গবন্ধু সহযোগিতা পেয়েছিলেন। রাজনৈতিক দলগুলো ও তাদের প্রধানরা বঙ্গবন্ধুর বাকশালে যোগদান করে। শুধু তাই নয়, জাতীয় চার নেতার অবস্থা থেকে আমরা সে অবস্থাটি খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারি, যা আমৃত্যু বঙ্গবন্ধুর রাজনীতিতে বিশ্বস্ত ছিলেন। যদিও কিছু নেতা বঙ্গবন্ধুর কর্মকাণ্ডে ব্যাঘাত ঘটানোর চেষ্টা করেছিল।





