গ্রে কাপড়ে বিভিন্ন কালার ফুটিয়ে তুলতে ডায়িং শিল্প খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিট বা ওভেন যেকোনো পোশাক তৈরির আগে কাপড় ডায়িংয়ে পাঠিয়ে রঙ করে ফিনিশিং দিতে হয়। ডায়িং শিল্পের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বহু বছর ধরে পরিচিত। ষাটের দশকে নারায়ণগঞ্জের চাঁনমারী টিলার রেললাইন-সংলগ্ন জায়গায় ছিল হ্যান্ড ডায়িং। মাটির খাদা বা গামলায় রঙ গুলিয়ে কাপড়ে রঙ করা হতো। প্রায় এক দশক এভাবেই কাপড়ে রঙ যুক্ত করার কাজ চলে। স্বাধীনতার পর সত্তরের দশকে ফতুল্লার পোস্ট অফিস রোডে এক ব্যবসায়ী স্থাপন করেন কর্ণফুলি ডায়িং কারখানা। সেখানে মূলত পলিস্টার কাপড় ও ছাতার কাপড় রঙ করা হতো। পরবর্তী সময়ে ফতুল্লার পঞ্চবটী ডালডা মিলের পাশে আবুল হাসান প্রতিষ্ঠা করেন বেঙ্গল ডায়িং এবং দেওয়ান সাহেব প্রতিষ্ঠা করেন দেওয়ান ডায়িং কারখানা। বয়লারের মাধ্যমে যন্ত্রপাতি স্থাপন করে বাংলা ডায়িং নির্মাণ করা হয়, যা ধোপা ডায়িং হিসেবে মানুষের কাছে পরিচিত। ওই ডায়িং কারখানায় ব্লিচিং দিয়ে সাদা কাপড় ডায়িং করা হতো। মূলত হোসিয়ারি কারখানায় ব্যবহৃত গেঞ্জির কাপড় এখানে ডায়িং করা হতো।
বাংলাদেশ ডায়িং অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে ডায়িং ব্যবসায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটানোর স্বপ্ন নিয়ে কোরিয়া থেকে তিনটি আধুনিক মেশিন আমদানি করে নিয়ে আসেন সাহসী উদ্যোক্তা রেইনবো ডায়িংয়ের কর্ণধার আব্দুস সালাম। ফতুল্লার দাপা ইদ্রাকপুরে অবস্থিত রেইনবো ডায়িং কারখানায় ১৯৮৫ সালে তিনি তিনটি আধুনিক মেশিন আমদানি করে কারখানায় যুক্ত করেন। কিন্তু দক্ষ কারিগর, রঙ মাস্টার ও টেকনিশিয়ানের অভাবে এক বছর মেশিন বসিয়ে রাখতে হয়। পরবর্তী সময়ে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্তৃপক্ষের (বিসিক) সহায়তা শ্রীলংকার টেকনিশিয়ান অর্জুন রানাতুঙ্গা নামের এক ব্যক্তির সহায়তায় ১৯৮৬ সালে মেশিনগুলো চালু করে উৎপাদনে যান। সে সময় টেকনিশিয়ান অর্জুন রানাতুঙ্গা সপ্তাহে দুদিন কারখানায় এসে দিকনির্দেশনা দিতেন। কোন রঙ কোন কেমিক্যালের সঙ্গে কতটুকু মেশাতে হবে তা দেখিয়ে দিতেন। এভাবে চলতে থাকলে বাজারে প্রচুর সাড়া পাওয়া যায়। মূলত ওই ডায়িং কারখানা স্থাপনের পর পরই বিদেশে নিট পণ্যের রফতানি হু হু করে বাড়তে থাকে। কারণ বাংলা ডায়িং শিল্পে কাপড় রঙ করা হতো ব্লিচিং পাউডার দিয়ে। বিদেশে ওই কাপড় রফতানি করা যেত না। ব্লিচিং দিয়ে কাপড় ধুলে সেই কাপড়ে কিছুদিন পর হলদে একটা প্রলেপ দেখা যেত। আব্দুস সালাম সাহেবই প্রথম ডায়িং কারখানা স্থাপন করেন, যে ডায়িং কারখানায় কাপড় ধোয়া হতো হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড দিয়ে। ওই ডায়িং কারখানায় সাদা, কালো, লাল, হলুদসহ বিভিন্ন কালারের কাপড় রঙ করা হতো। ডায়িং কারখানা চালুর এক মাসের মধ্যে প্রচুর সাড়া পাওয়ায় মালিক আব্দুস সলাম এক মাস পর হংকং থেকে এক বায়ারের মাধ্যমে আরো ছয়টি মেশিন নিয়ে আসেন। যার মাধ্যমে মেশিনগুলো নিয়ে আসা হয় তিনি বাংলাদেশ থেকে ফ্যাব্রিক নিতেন। তার কয়েক মাসের মধ্যে তিনি আরো ছয়টি আধুনিক মেশিন কারখানায় যুক্ত করেন। এক বছরের মাথায় রেইনবো ডায়িং কারখানায় মেশিনের সংখ্যা হয় ২০টি।
নারায়ণগঞ্জ ডায়িং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ আমজাদ হুসাইন জানান, ১৯৮৬ সালে আব্দুস সালাম সাহেব রেইনবো ডায়িং কারখানায় আধুনিক ডায়িং স্থাপনের কারণেই আজ বাংলাদেশে নিট শিল্পের বিকাশ দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, বাংলা ডায়িংয়ে ব্লিচিং দিয়ে কাপড় ওয়াশ করা হতো, যা বিদেশীদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। রেইনবো ডায়িং প্রথম হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ওয়াশ শুরু করে। নানা রঙের কাপড় ডায়িং হয়। তিনি বলেন, ওই সময় ভারত, চায়নায় রঙ বা কেমিক্যাল পাওয়া যেত না। ইউরোপের রঙ-কেমিক্যাল ব্যবহার হতো। যেমন ওয়েস্ট, বিএসএফ, আইসিআই, সেন্ডোস, সিবাগেগিসহ নানা রঙ ব্যবহার হতো।
তিনি বলেন, রেইনবো ডায়িং কারখানায় কাপড় ডায়িংয়ের জন্য দীর্ঘ লাইন পড়ে থাকত। ফ্যাব্রিকসের স্তূপ জমে থাকত কারখানার ভেতরে ও মাঠের মধ্যে। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা মেশিন চলত। ওই সময় রেইনবো কাপড় ডায়িং করাতেন মিনার টেক্সটাইলের জার্জিস হোসেন, অ্যানারের মোকলেসুর রহমান, উইজডম অ্যাটায়ার্সের সেলিম ওসমান, ফকির নিট, বনানী গার্মেন্টসসহ বেশ কয়েকটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত টানা চার বছর একচেটিয়া ব্যবসা করে রেইনবো ডায়িং কারখানা। পরবর্তী সময়ে অনেকে রেইনবো ডায়িং থেকে কাজ শিখে অন্যান্য জায়গায় গিয়ে যোগ দেয়। ১৯৮৯ সালে আবুল হাসনাত বেঙ্গল ডায়িংয়ে নিট কাপড় ডায়িংয়ের জন্য মেশিন নিয়ে আসেন। ১৯৯০ সালে রহমান ডায়িং, সম্রাট ডায়িং, ১৯৯১ সালে শাওন ডায়িং স্থাপনের মাধ্যমে আধুনিক ডায়িং শিল্পের সম্প্রসারণ হতে থাকে। এভাবে ধীরে ধীরে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত তিন দশকে নারায়ণগঞ্জে ৪৬০টি ডায়িং কারখানা গড়ে উঠেছে। প্রথম দিকে ডায়িং কারখানার তরল বর্জ্য পরিশোধন করার জন্য ইটিপি স্থাপনের জন্য সরকারিভাবে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সরকার ১৯৯৭ সালে পরিবেশ আইন করে। কারখানা স্থাপনের জন্য বস্ত্র মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি নিতে হতো। মূলত ২০০০ সালে এসে বস্ত্র মন্ত্রণালয় থেকে কারখানা স্থাপনের অনুমতি নেয়ার সময় আমাদের বলা হতো পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে একটি ছাড়পত্র নেয়ার জন্য। সেই থেকে পরিবেশ ছাড়পত্র নেয়া শুরু হয়।
নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, নারায়ণগঞ্জ শহর ও শহরতলিতে তরল বর্জ্য নির্গমনকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৪৬০টি। তার মধ্যে বর্জ্য পরিশোধন প্ল্যান্ট (ইটিপি) স্থাপন করেছে ৩৪৫টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। বাকি ১১৫টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইটিপি নেই। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানে ইটিপি রয়েছে তাদের পরিশোধিত পানি এবং যেসব কারখানার ইটিপি নেই তাদের বর্জ্যমিশ্রিত পানি একই খাল বা নালায় ফেলা হচ্ছে। ফলে খাল বা নালায় পড়ে পানি দূষিত হয়ে নদীতে গিয়ে মিশছে। পরিবেশ রক্ষায় ইটিপি স্থাপন করেও কোনো প্রতিকার বা সুফল পাচ্ছে না নারায়ণগঞ্জবাসী।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা চান পরিবেশের বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পাক নারায়ণগঞ্জ। বর্জ্যমিশ্রিত পানি যেসব খাল বা নালা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নদীতে মিশছে সেসব স্থান চিহ্নিত করে সরকারিভাবে সেন্ট্রাল ইটিপি স্থাপনের দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে যারা ইটিপি স্থাপন করেছে তাদের প্ল্যান্ট পরিচালনার জন্য যে কেমিক্যাল ব্যবহার হয়, সেসব কেমিক্যাল বন্ড লাইসেন্সে আনার অনুমতি প্রদান অথবা ভ্যাট-ট্যাক্স মওকুফের দাবি জানান তিনি।’
বাংলাদেশ ডায়িং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ মো. আমজাদ হুসাইন জানান, ছোট-বড় অনেক ডায়িং কারখানা অর্থের অভাবে, আবার অনেকে জায়গার অভাবে ইটিপি স্থাপন করতে পারছেন না। সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা এবং ছোট ছোট কয়েকটি কারখানা মিলে একটি ইটিপি স্থাপন করতে পারলে এ দূষণ রোধ করা সম্ভব বলে দাবি করেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, গত এক বছরে তরল বর্জ্য ফেলে নদী দূষণকারী ২১টি প্রতিষ্ঠানে স্পেশাল মোবাইল কোর্ট চালায় পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট বিভাগ। কারখানাগুলোর গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ডায়িং কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে। বাকি ৮৪টি কারখানায় ইটিপি স্থাপনের জন্য চাপে রাখা হয়েছে।
লেখক: সাংবাদিক





