স্টার, বুটা, কদমফুল, মাকড়সা, ফ্যান ফুল, রাজু বুটা, নব্বই ফুল, আনারস, গাছ, ফুল, তালাচাবি, বিস্কুট, মৌচাক, তাহফিজ, পাঁচ পয়সা, মাছের কাঁটা, দশফুলসহ রয়েছে আরো হরেক নাম। এসবই টুপির ডিজাইনের নাম। বাহারি নামের এ ডিজাইন করা টুপি তৈরি হচ্ছে বগুড়ার ধুনট ও শেরপুর উপজেলার প্রায় দেড় শতাধিক গ্রামে। গ্রামের গৃহবধূদের গল্পের তালে তালে তৈরি হচ্ছে এসব টুপি। গ্রাম্য বধূদের নিপুণ হাতের ছোঁয়া আর সুতো ও ক্রুশকাঁটার মিলিত বন্ধনে তৈরীকৃত টুপি চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন এলাকাসহ ভারত, শ্রীলংকা, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে। দুই উপজেলার লক্ষাধিক নারী-পুরুষ বাণিজ্যিকভাবে টুপি তৈরি করে বাড়তি আয়ের লড়াই করে যাচ্ছেন। টুপি তৈরি করেই চলছে কারো কারো সংসার। তৈরীকৃত টুপি বিক্রি করে টাকা আয় করছেন টুপি শিল্পের কারিগররা। বর্তমানে বিদেশের বাজারে বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকা মূল্যের টুপি রফতানি হচ্ছে।
জানা যায়, ১২টি উপজেলা নিয়ে গঠিত বগুড়া জেলা। এ জেলা কৃষির জন্য বিখ্যাত। জেলায় শেরপুর ও ধুনট নামে দুটি উপজেলা রয়েছে। শেরপুর উপজেলা করতোয়া নদী ও ধুনট উপজেলা যমুনা নদী দিয়ে ঘেরা। দুটি উপজেলায় কৃষিক্ষেত্রে ধান, পাট, আলু ও সবজি উৎপাদনে রয়েছে বিশেষ অবদান। নদী এলাকা হওয়ায় নদীভাঙন আর বন্যার কারণে প্রতি বছর ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। একসময় বগুড়া জেলায় কলকারখানা সচল থাকলেও স্বাধীনতা যুদ্ধে সেসব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়ে। কর্মহীন মানুষই নিজেদের টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন পেশায় জড়িয়ে পড়ে। স্বাধীনতার আগে ও পরে কলকারখানা বা ইন্ডাস্ট্রি কমে গেলে কৃষির ওপর নির্ভর করেই জেলার অর্থনীতি এখনো সচল। অনিয়মিতভাবে স্থাপনা নির্মাণে দিনে দিনে কৃষিজমি কমতে থাকলে অনেকেই ভিন্ন পেশার সন্ধানে নামে। বগুড়ার শেরপুর ও ধুনট উপজেলার বেশকিছু বাসিন্দাও নতুন পেশার সন্ধান করতে থাকে। কথিত রয়েছে, ১৯৮৮ সালের বন্যায় কর্মহীন হয়ে জীবন বাঁচাতে ধুনট উপজেলার নারী-পুরুষ টুপি তৈরির কাজে লেগে যায়। পরবর্তী সময়ে যা দুই উপজেলা ছাড়াও সিরাজগঞ্জের কাজিপুর, তাড়াশ, চান্দাইকোনা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
বগুড়ার শেরপুর ও ধুনট উপজেলার বেশকিছু প্রবীণ ব্যক্তি বলছেন, শেরপুর উপজেলার সুঘাট ইউনিয়নে নারীরা একসময় তাদের ঘরের স্বামী ও ছেলেসন্তানদের জন্য হাতে টুপি তৈরি করত। বিশেষ করে দুই ঈদের আগে হাতে টুপি তৈরি করে পরিবারের স্বজনদের মাঝে উপহার হিসেবে দেয়ার রেওয়াজ ছিল। পরে ১৯৯০ সালের দিকে জালি টুপি তৈরি শুরু হয়। সে জালি টুপি তৈরির পর বগুড়া জেলা শহরের বিভিন্ন দোকানে বিক্রি হতো। ধীরে ধীরে আজকের বাণিজ্যিক আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে বিভিন্ন উপায়ে দেশ-বিদেশের বাজারে বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকা মূল্যের টুপি রফতানি হচ্ছে। আর দুই উপজেলার লাখ খানেক টুপির কারিগর প্রতিদিন ১০ লাখের বেশি টুপি তৈরি করছেন। দুই উপজেলার মধ্যে শেরপুর উপজেলার জয়লা-জুয়ান, জয়লা-আলাদি, কল্যাণী, চক-কল্যাণী, গুয়াগাছী, বিনোদপুর, মির্জাপুর, খানপুর, খানপুর দহপাড়া, ভিমজানি ও ধুনট উপজেলার বহালগাছা, চৌকিবাড়ী, ফড়িংহাটা, কুড়াহাটা, বিশ্বহরিগাছা, চাঁনদার, ভূবনগাতি, চালাপাড়া, পাঁচথুপি, থেউকান্দি, বাটিকাবাড়ী, পেঁচিবাড়ী, জালশুকা, বেলকুচি, বিলকাজুলি, অলোয়া, শ্যামগাতী, পিরহাটি, খাদুলী, হিজুলী, সাগাটিয়া, কাশিয়াহাটা, শাঁকদহ, ধেরুয়াহাটি, মথুরাপুর, মাটিকোড়াসহ দেড়শতাধিক গ্রামের লক্ষাধিক নারী-পুরুষ এ পেশায় জড়িত। বর্তমানে বগুড়ার দুই উপজেলার পাশাপাশি বগুড়া সদর, শিবগঞ্জ, মাঝিড়া, নন্দীগ্রাম, সারিয়াকান্দি, মহাস্থান, নামুজা, সিরাজগঞ্জের কাজিপুর, রায়গঞ্জ, বেলকুচি এলাকায় টুপি তৈরির শিল্প গড়ে উঠেছে। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার হামছাপুর এলাকায় টুপির মান আরো আধুনিকায়নে জুয়েল আকন্দ অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে টুপি শিল্প গড়ে তুলেছেন। ওই শিল্পের মাধ্যমে উন্নত মানের সুতা রিফাইনিং করে তৈরীকৃত টুপি দেশের বিভিন্ন বাজারসহ বিদেশে রফতানি করছেন। দেশের চাহিদা মিটিয়ে ১০ লক্ষাধিক টুপি রফতানি হচ্ছে সৌদি আরব, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে। শেরপুর উপজেলার জুয়েল টুপি শিল্প ঘর বর্তমানে জুয়েল হ্যান্ডিক্রাফট নামে পরিচিতি লাভ করেছে। এ প্রতিষ্ঠান বছরে ২৫-২৬ কোটি টাকার টুপি কেনাবেচা করে। এছাড়া বগুড়ার আরো কিছু ব্যবসায়ী টুপি রফতানি করেন। তাদের মধ্যে ইলিয়াস ক্যাপ প্রডাক্টস, জুয়েল আকন্দের জুয়েল ক্যাপ ডিপো, হক ট্রেডার্স, জাহিদ ক্যাপ ডিপো, এসএস ক্যাপ, রিপন ক্যাপ প্রডাক্টস, মাহফুজ ক্যাপ ডিপো, আবদুল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্সের নাম উল্লেখযোগ্য।
বগুড়ার ধুনটের পেচিবাড়ী গ্রামের আসমা খাতুন জানান, তিনি জন্মের পর থেকে তার দাদি ও মাকে টুপি সেলাই করতে দেখেছেন। টুপি তৈরির সময় তার দাদি ও মা ক্রুশকাঁটা নিয়ে হাতের আঙুলে সুতা পেঁচিয়ে নেন। তারপর আঙুল আর ক্রুশকাঁটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে টুপি তৈরি করেন। প্রথম প্রথম তিনি পারতেন না। পরে শিখে নিয়ে এখন দ্রুত টুপি তৈরি করতে পারেন। তিনি দিনে ১২-১৪টি জালি টুপি তৈরি করতে পারেন। ৩০ টাকা করে এ টুপি বিক্রি হয়। প্রতিদিন ৩৫০-৪০০ টাকা আয় করেন তিনি।
ধুনটের পেচিবাড়ী গ্রামের টুপি তৈরির নারী শ্রমিকরা জানান, ঘরের কাজ শেষে দিনে যে সময় পান, সে সময়েই টুপি সেলাই করেন তারা। আর যারা বাড়ির কাজ করেন না, সেসব নারী সকাল থেকে বিকালের মধ্যে ১২-১৪টি টুপি তৈরি করতে পারে। টুপি বিক্রি করতে কোনো হাটবাজারে যেতে হয় না। বাড়ি থেকেই পাইকাররা এসে প্রতি সপ্তাহে কিনে নিয়ে যায়। সব খরচ বাদে তার প্রতি মাসে ৫-৬ হাজার টাকা বাড়তি আয় হয়। এ টাকা দিয়ে সংসার পরিচালনা করতে হয়।
টুপি তৈরির শ্রমিক জোবাইদা খাতুন জানান, আগে হাত খরচের জন্য ১০-২০ টাকা স্বামীর কাছ থেকে চেয়ে নিতেন। কিন্তু টুপি সেলাই শুরু করায় আর কারো কাছে টাকার জন্য হাত পাততে হয় না। হাতে সেলাই করা টুপি প্রতি মাসে বিক্রি করে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় করেন তিনি।
জোবাইদার মতো গ্রামের আরজিনা, মনোয়ারা, মর্জিনা, হাসিনা, জমিলা, রূপালী, জামিলা, নার্গিস, বিউটি, রমিছা, নাসিমাসহ আরো অনেকেই টুপি সেলাই ও বিক্রি করে এখন স্বাবলম্বী।
বগুড়ার শেরপুর ও ধুনট এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, স্কুলপড়ুয়া ছাত্রী থেকে শুরু করে গৃহবধূ, কোনো নারীই বসে নেই। সবাই টুপি তৈরিতে ব্যস্ত। সংসারের কাজ শেষে গৃহবধূদের কাজ টুপি বোনা। সংসারের কাজ করে ছুটছেন টুপি তৈরির কাজে। ছায়াঘেরা পরিবেশে বসে মেতে ওঠেন নানা সুখ-দুঃখের আলাপচারিতায় ও গল্পকথায়। জমানো গল্পের আসরে গল্পের তালে তালে চলে টুপি বুননের কাজ।
টুপি তৈরির নারী কারিগররা জানান, এ শিল্পে কোনো টাকা বিনিয়োগ করতে হয় না। যা করার সবই মহাজনের পক্ষ থেকে করা হয়। নারীদের কেবল শ্রম আর হাতের নিপুণ ছোঁয়া বিনিয়োগ করতে হয়। সুতা মহাজন দেয়। টুপি তৈরি হলে দাম দিয়ে সুতার দাম কেটে নেয়।
টুপি কারিগর কুলসুম বেগম জানান, তিনি বেশ কয়েক বছর ধরে টুপি বুনন করে সংসার পরিচালনা করছেন। তিনি মাসে ৪-৫ হাজার টাকা আয় করেন। ২০-১০০ টাকা দামের মধ্যে তিনি টুপি বুনেন। সে টুপি বাজারে খুচরা বিক্রি হয় ৫০-২৫০ টাকা পর্যন্ত।
জালি টুপি ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও মেসার্স জুয়েল ক্যাপ ডিপোর স্বত্বাধিকারী মো. জুয়েল আকন্দ জানান, বগুড়া সদর উপজেলা, শেরপুর, ধুনট, কাজীপুর, রায়গঞ্জ, সারিয়াকান্দি, শিবগঞ্জ, শাজাহানপুর উপজেলায় বাহারি ডিজাইনের জালি টুপি তৈরি হয়। তবে শেরপুর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি টুপি তৈরি হয়, যা আবার বিভিন্ন নামে পরিচিত। এর মধ্যে তাহফিজ, মাকড়সা, বিস্কুট, পাঁচ পয়সা, কদমফুল, মাছের কাঁটা, দশফুল, আনারস ডিজাইনের জালি টুপি উল্লেখযোগ্য। কিন্তু তাহফিজ নামে জালি টুপির কদর এবার সবচেয়ে বেশি। করোনার কারণে দুই বছর ব্যবসায় স্থবিরতা ছিল। তবে সেটি এরই মধ্যে কেটে যেতে শুরু করেছে। দেশীয় টুপি নিতে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ী অগ্রিম অর্ডার দেন। সে অনুযায়ী তিনি নারীদের পারিশ্রমিক দিয়ে টুপি তৈরি করে নেন। পরে এসব বাহারি ডিজাইনের টুপি সৌদি আরব, দুবাই, কাতার, মালয়েশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপালসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হয়। আবার আরব রাষ্ট্রের একাধিক ব্যবসায়ীর মাধ্যমে এসব টুপি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাষ্ট্রে রফতানি হয়। তিনি জানান, তিনি ছাড়াও বেশ কয়েকজন বড় ব্যবসায়ী প্রত্যেক বছর ঈদের কমপক্ষে দুই মাস আগ থেকে মোটা অংকের টাকা এ শিল্পে বিনিয়োগ করেন। লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করছেন। দুই উপজেলা মিলিয়ে বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার টুপি বিক্রি হয়। যার সিংহভাগ বিক্রি হয় দেশে আর বাকিটা বিদেশে।
লেখক: সাংবাদিক





