দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (এনবিএফআই) গ্রাহকদের আর্থিক চাহিদা পূরণে ফিনটেক এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) খাতে অর্থায়নে জোর দিচ্ছে। পাশাপাশি সবল ও দুর্বল প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহীরা। গতকাল বণিক বার্তা ও বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলএফসিএ) যৌথ প্রয়াস এনবিএফআই সংযোগ ২০২৩-এ মিট দ্য লিডারস অনুষ্ঠানে তারা এসব কথা বলেন।
মিট দ্য লিডারস অনুষ্ঠানের সূচনা করেন বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলএফসিএ) চেয়ারম্যান ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেডের (আইআইডিএফসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্স পিএলসির সিইও কান্তি কুমার সাহা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ফাইন্যান্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. কায়সার হামিদ, ডিবিএইচ ফাইন্যান্স পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও নাসিমুল বাতেন, আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের সিইও ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম জামাল উদ্দিন, আইপিডিসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মমিনুল ইসলাম, লংকাবাংলা ফাইন্যান্স পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও খাজা শাহরিয়ার, আভিভা ফাইন্যান্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল জব্বার, ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন, ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামসুল ইসলাম, মাইডাস ফাইন্যান্সিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান এবং উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মিনহাজ আহমেদ।
আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের সিইও ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম জামাল উদ্দিন তার বক্তব্যে বলেন, ‘শুধু যে দেশের এনবিএফআই খাত ভুগছে তা নয়। পুরো ব্যাংক খাত ভুগছে। ব্যাংক ও এনবিএফআইয়ের খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি নেতিবাচক। খেলাপি ঋণের এ অবস্থা হওয়ার পরও আমরা কি সেবা কমিয়ে দিয়েছি? না, বরং আমরা সেবা আরো বাড়িয়ে দিয়েছি। আমাদের গ্রাহকদের অর্থায়ন চাহিদা পূরণ করে যাচ্ছি। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ঋণ পরিশোধের বিষয়ে খুবই আগ্রহী। ঋণ পরিশোধের জন্য তাদের ব্যবসাকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা জরুরি। তারা সেটাও করছেন, ঋণও পরিশোধ করছেন। এসএমই খাতে আইডিএলসি যে পরিমাণ অর্থায়ন করেছে তা আরো বাড়াবে। শুধু একটি বিষয় নিশ্চিত করবেন, আপনার প্রতিষ্ঠান সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কিনা এবং আপনার সহকর্মীরা ভালোভাবে কাজ করছেন কিনা। তাহলে আপনারা ঋণও পরিশোধ করতে পারবেন, একই সঙ্গে আপনার ব্যবসাও চলমান থাকবে।’
লংকাবাংলা ফাইন্যান্স পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও খাজা শাহরিয়ার বলেন, ‘আমাদের উপস্থিতি শুধু এসএমইতে আছে তা নয়, এসএমইতে আমাদের ফোকাস সবচেয়ে বেশি। এর বাইরে রিটেইল, হোম লোন, পার্সোনাল লোনেও আমরা সর্বোচ্চ পরিমাণে কাজ করছি। এমনকি আমাদের ক্রেডিট কার্ডও আছে। করপোরেট খাতে অর্থায়নেও আমরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থাকায় নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আমরা আকর্ষণীয় হারে ঋণ দিতে পারছি। একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের যেখানে যেখানে উপস্থিতি থাকা দরকার, সেখানে সেখানে আমাদের উপস্থিতি রয়েছে। সব গ্রাহকের জন্যই কোনো না কোনো স্কিম আমরা তৈরি করেছি। শিগগিরই আমরা ডিজিটাল ন্যানো লোনে চলে যাব। এটা নিয়ে কাজ চলছে।’
আইপিডিসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘সামনের দিনগুলোয় বাংলাদেশের অর্থনীতি ও পরিবারের পাশে আমাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সবসময় থাকবে। পরিবারে, সমাজে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের জন্য যা করার দরকার আমরা করব। বিশ্বব্যাপী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো শিল্প, আবাসন, অবকাঠামো, পুঁজিবাজার, ক্ষুদ্র ও বৃহৎ শিল্পে বিনিয়োগ করেছে। একটা সময় বড় ধরনের বিভ্রান্তি ছিল যে এনবিএফআইগুলো লিজিং ফাইন্যান্স। লিজিং একটা পণ্য। এর বাইরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বৃহৎ শিল্প, এসএমই ও আরো ক্ষুদ্র পর্যায়ে ঋণসেবা দেয়। বর্তমান বিশ্বে এনবিএফআইগুলোর মধ্যে ফিনটেক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো করছে।৷ আমাদের দেশে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সেবা দিয়ে আসছে। তারাও তাদের ব্যবসা এখন বিস্তৃত করছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এনবিএফআইগুলো নতুন ধরনের রিটেইল ফাইন্যান্স নিয়ে কাজ করছে। বাংলাদেশে একটা সময় করপোরেট লোনে কাজ করতে। এখন সেখান থেকে বের হয়ে এ সেবা আরো বিস্তৃত করছে। সামনের দিনগুলোয় এটা আরো বিস্তৃত হবে। আপনারা নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় আসবেন। ব্যাংকে লোকজন অনেক ধরনের আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে পড়ে। কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আপনার বাড়িতে গিয়ে সে সেবা পৌঁছে দিয়ে আসবে। এনবিএফআই দ্রুততম সময়ে, স্বচ্ছতার সঙ্গে সেবা দেবে। আমাদের ব্যাংকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান যেমন আছে, তেমনি দুর্বল প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এনবিএফআইগুলোর মধ্যেও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান যেমন আছে তেমনি দুর্বল প্রতিষ্ঠানও আছে। সেজন্য আপনারা যাচাই-বাছাই করে প্রতিষ্ঠানগুলোয় যাবেন।’
বাংলাদেশ ফাইন্যান্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. কায়সার হামিদ বলেন, ‘ঢাকার বাইরে জনসংখ্যার একটি বড় অংশ শরিয়াহভিত্তিক লেনদেন পছন্দ করেন। তাদের এ বিশ্বাসকে সমুন্নত রেখে তাদের জন্য ইসলামী অর্থায়ন নিয়ে এসেছি। একজন চাকরিজীবী তরুণ হজের পরিকল্পনা করতে পারে আমাদের থেকে অর্থ নিয়ে। যে হজটা তিনি চিন্তা করতেন বৃদ্ধ বয়সে অর্থ জমিয়ে করবেন, তিনি চাইলে আমাদের অর্থায়নে এখনই তা করতে পারছেন। আমরা রিটায়ারমেন্ট সেভিংস স্কিমও নিয়ে এসেছি। কিছুদিন হলো সরকার এটা চালু করেছে, আমরা তার আগে করেছি। বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ যেহেতু তরুণ, তাদের বাদ দিয়ে যদি আর্থিক খাতের পরিকল্পনা করা হয় তাহলে আমরা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাব। এতদিন আমরা হয়তো বাণিজ্যিক পণ্যে অর্থায়ন করতাম, সেটা ব্যাংকও করছে। কিন্তু এনবিএফআইগুলো সেখান থেকে বের হয়ে তাদের সেবা বিস্তৃত করছে।’
ডিবিএইচ ফাইন্যান্স পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও নাসিমুল বাতেন বলেন, ‘বাংলাদেশে জনসংখ্যার তুলনায় জায়গা অনেক কম। কিন্তু আমাদের প্রত্যেকেরই একটা স্বপ্ন থাকে নিজস্ব বাড়ির। বাস্তবতা হলো, ঢাকা শহরের ৭০ শতাংশ মানুষ ভাড়া বাড়িতে থাকছে। আমরা চেষ্টা করছি, ভাড়া বাসায় থাকা নাগরিকদের নিজস্ব বাড়িতে কীভাবে স্থানান্তর করা যায়। একটা নিজস্ব বাড়ি শুধু পরিবারের ওপর প্রভাব ফেলে না; সমাজ, এলাকা, সম্প্রদায়সহ অর্থনীতিতে এর বড় ধরনের অবদান আছে। এর সঙ্গে অনেক শিল্প জড়িত। ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকার মধ্যে যাদের আয় তাদের আবাসন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের গড় ঋণের পরিমাণ ৩৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে আমরা শুধু সমাজের বিত্তশালীদের ঋণ দিচ্ছি তা নয়। আমরা মধ্যবিত্ত শ্রেণী নিয়ে কাজ করছি। যাদের আয় ৫০ হাজার টাকার মধ্যে, যাদের ২০ লাখ টাকার মতো ঋণ নেয়ার সুযোগ রয়েছে, তাদের জন্য কাজ করছি। স্বল্পমেয়াদে আমানত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিচ্ছি। দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সংগ্রহের ক্ষেত্রে ঘাটতি আছে। আবাসন খাতে অর্থায়ন করতে গিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত এটার মুখোমুখি হচ্ছি। সমস্যা থাকবে, সে সমস্যা থেকে উত্তরণের চেষ্টা করছি। গত ১৮ বছরে আমাদের খেলাপি ঋণ কখনো ১ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়নি।’
ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামসুল ইসলাম বলেন, ‘মানুষের মৌলিক চাহিদা বাসস্থান নিয়ে আমরা কাজ করছি। দীর্ঘমেয়াদে ১০-২০ বছর গ্রাহকের নগদ প্রবাহ একই ধরনের নাও থাকতে পারে। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আমরা কার্যক্রম চালাই। গত ২৫ বছরে ৩০ হাজার গ্রাহককে সেবা দিয়েছি।’
ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বলেন, ‘শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং এখন শুধু মুসলমানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন দেশে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের নন-ব্যাংক বলা হয়, কিন্তু আমরা নন-ব্যাংক না, আর্থিক প্রতিষ্ঠান। দু-একটি কার্যক্রম ছাড়া ব্যাংকের সব কাজই আমরা করি, বিনিয়োগের সব জায়গায় আমাদের বিচরণ রয়েছে। আমাদের পণ্যগুলো সম্পূর্ণ শরিয়াহভিত্তিক।’
অনুষ্ঠানে আবাসন খাত নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান বিপ্রপার্টির মহাব্যবস্থাপক (জিএম) তানজিল আহমেদ বলেন, ‘আমরা ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, গ্রাহকসহ অনেকের সঙ্গে কাজ করি। আমার যে গ্রাহক বাড়ি কিনতে চান তার সম্পদের তথ্য ব্যাংকে সরবরাহ করি। ব্যাংক তার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। পুরো সেবা তারাই দেয়। আমাদের সেবার মান একেবারে ভিন্ন। এর মাধ্যমে তিনি শুধু বাসা পাচ্ছেন না, পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানও করতে পারেন।’
মিট দ্য লিডারস অনুষ্ঠানে প্রশ্নোত্তর পর্বে উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্য থেকে অনেকে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেন। গ্রাহক ঋণের বিপরীতে করা এফডিআর থেকে লভ্যাংশ কমে যাওয়া, ছোট আকারের ঋণ, জামানত ছাড়া ঋণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হওয়ায় ব্যাংক থেকে ঋণ না পাওয়ার মতো বিষয় সিইওদের সামনে তুলে ধরেন। মঞ্চে থাকা অতিথিরা সেসব প্রশ্নের উত্তর দেন। একজন উদ্যোক্তা জানান, তারা ক্ষুদ্র আকারে ব্যবসা করলেও দ্রুততম সময়ে ব্যাংক থেকে ঋণ পান না। তাদের জন্য এনবিএফআইগুলো অনেক সময় ভরসা হয়ে ওঠে। আবার শহরের বাইরের ছোট উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা এসব প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে না জানায় তাদের পক্ষে অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয় না। এজন্য মেলা অথবা এনবিএফআই সংযোগ আয়োজনের পরামর্শ দেন গ্রাহক। এক্ষেত্রে রাজধানীর বাইরে এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনের দাবি জানান তারা।





