ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নবনির্মিত তৃতীয় টার্মিনালের কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি হচ্ছে সফট লঞ্চিংয়ের মধ্য দিয়ে। কম-বেশি এক বছরের মধ্যে টার্মিনাল-৩-এর বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে চায় সরকার। এমন পরিপ্রেক্ষিতে টার্মিনাল-৩-এর সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ এবং দেশের এভিয়েশন খাতের নানা দিক নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) মহাসচিব ও নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩ বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আমাদের এভিয়েশন খাতে যত অবকাঠামো সংযোজিত হয়েছে, আমি বলব সেগুলোর মধ্যে তৃতীয় টার্মিনাল নিশ্চিতভাবে অনন্য। এ রকম একটি স্থাপনা আমাদের অনেক আগেই প্রয়োজন ছিল। বর্তমান সরকার বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক ইচ্ছা এবং উনার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে আমরা থার্ড টার্মিনালের মতো একটি স্থাপনা পেতে যাচ্ছি।

টার্মিনাল-৩-এর সর্বোচ্চ সুফল পেতে এখন করণীয় কী?

একটি বিমানবন্দরে টার্মিনাল ছাড়াও আনুষঙ্গিক অনেক বিষয় আছে। তার মধ্যে রানওয়ে একটা। বর্তমানে শাহজালালে বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের যে চাহিদা, তা সক্ষমতার তুলনায় কম। ‘‌ডিপাচার কনজেশন’ বলে একটা কথা আছে। একটা ফ্লাইট গেট ত্যাগ করার পর থেকে টেক অফ করা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে বর্তমানে গড়ে ৩০-৪০ মিনিট সময় লেগে যাচ্ছে। বিপরীত দিকে অ্যারাভাইল কনজেশনও হচ্ছে গড়ে ২০-৩০ মিনিট। ল্যান্ডিং করার আগে একটি বিমানকে অতিরিক্ত সময় আকাশে থাকতে হচ্ছে। এ কনজেশনের জন্য একদিকে যেমন যাত্রীদের বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে, তেমনি এয়ারলাইনসের খরচও বহু গুণ বেড়ে যাচ্ছে। টার্মিনাল-৩ চালুর পর স্বাভাবিকভাবেই বিমান ওঠানামা বেড়ে যাবে। একটি রানওয়ে থাকায় বিমানজট কিন্তু আরো বাড়বে। এটা দূর করার জন্য প্রয়োজন ছিল নতুন একটি স্বাধীন রানওয়ের। সরকার শাহজালালে একটি বিকল্প টার্মিনাল তৈরির পরিকল্পনা করছে। কিন্তু যদি টার্মিনাল-৩ এবং বিকল্প বা স্বাধীন রানওয়ের পরিকল্পনা একসঙ্গে করা হতো, তাহলে টার্মিনাল-৩ আরো বেশি ফাংশনাল হতে পারত। বিমানবাহিনীর উড্ডয়ন কার্যক্রমও কিন্তু একই রানওয়ে থেকে হয়। এজন্য মাঝে মধ্যেই রানওয়েটা ব্লক থাকে। দুটো রানওয়ে যদি থাকত, তাহলে একটি ব্লক হলেও আরেকটি ব্যবহার করা যেত। এখন একটি স্বাধীন না হলেও বিকল্প রানওয়ে করতে হবে। না হলে থার্ড টার্মিনালের যে উদ্দেশ্য, তা অর্জিত হবে না।

শাহজালাল বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নও তো জরুরি।

আমাদের এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ৫০ বছরের পুরনো। এ সিস্টেম দিয়ে বর্তমান চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে না। বর্তমান সময়ের এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট এত সুচারু ও সুন্দরভাবে করা হয়, যেখানে নিরাপত্তার পাশাপাশি কার্যকারিতা ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলোও সমানভাবে গুরুত্ব পায়। অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে নিরাপদভাবে একটি এয়ারক্রাফট বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন বা অবতরণ করতে পারে। আমরা দীর্ঘদিন থেকে ধরে শুনছি আধুনিক এয়ার ট্রাফিক সিস্টেম করা হবে। তবে এটার কোনো অগ্রগতি দেখছি না। আমি মনে করি দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ জিনিসগুলো আমাদের করে ফেলা উচিত। টার্মিনাল-৩ পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবলও তো প্রয়োজন...।

একটি বিমানবন্দরে অনেক ধরনের কর্মী প্রয়োজন হয়। আমরা সুন্দর একটি অবকাঠামো গড়ে তুলেছি। এটি পরিচালনার জন্য হঠাৎ করে তো আর জনবল তৈরি হবে না। জনবল তৈরি করতে হলে তো একটা দীর্ঘ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিয়ে আসতে হবে। টার্মিনালের কার্যক্রম শুরুর আগেই এখানে প্রশিক্ষিত জনবল নিযুক্ত করা জরুরি। বিমানবন্দরে ই-গেট বসানো হয়েছে। কিন্তু এটার সুফল সেভাবে আমরা পাচ্ছি না। ই-গেট কার্যকর করাও জরুরি। উড়োজাহাজের জ্বালানি তেল সরবরাহের একটা বিষয় আছে। জ্বালানি তেল সরবরাহ করে পদ্মা পেট্রোলিয়াম। মাত্র একটি এজেন্সি। ঢাকার মতো একটি বড় এয়ারপোর্টে একটি এজেন্সি যথেষ্ট নয়। এখানে তেল সরবরাহের জন্য একের অধিক এজেন্সি থাকা উচিত। পদ্মা বর্তমানেই জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। থার্ড টার্মিনাল চালুর পর বিমানবন্দরে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়বে। তখন কিন্তু তেল সরবরাহের চাহিদা আরো বাড়বে। কিন্তু এ বাড়তি চাহিদা পূরণে পদ্মা কি প্রস্তুত? একইভাবে বিমানবন্দরের অন্য যেসব সেবাদাতা সংস্থা রয়েছে, তারা কেউ কিন্তু সেভাবে প্রস্তুত নয়।

প্রস্তুতির এ ঘাটতির কারণ কী?

আমি বলব এখানে সমন্বয়ের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। টার্মিনাল-৩ তৈরির পরিকল্পনার সময়ই বেবিচকের উচিত ছিল অংশীজনদের মতামত নেয়া। অবশ্যই একটি দৃষ্টিনন্দন বিমানবন্দর আমরা পাচ্ছি। অনেকেই এটাকে স্বপ্নের টার্মিনালসহ নানা উপমায় ভূষিত করছে। তবে আমি এটার নান্দনিকতার চেয়ে ব্যবহারিক দিকটিতে গুরুত্ব দিতে চাই। টার্মিনাল-৩ যাত্রীদের জন্য কতটা স্বাচ্ছন্দ্যময় হবে এবং অপারেটরের জন্য কতটা সহজ হবে সেদিকে জোর দিতে চাই। যেকোনো বিমানবন্দরে এয়ারলাইনসগুলোর জন্য একটি নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা দরকার। এটাকে কমিউনিকেশন নড বলে। টার্মিনাল-৩-এর জন্য বিষয়টি এখনো চিন্তাই করা হয়নি। নির্মাণ পরিকল্পনায় এয়ারলাইনসগুলোকে সম্পৃক্ত করলে যোগাযোগ ব্যবস্থাটি রেখেই টার্মিনালটি হয়ে যেত। এখন যেটা হবে, আমরা বলার পর নতুন করে হয়তো ব্যবস্থাটি যুক্ত করা হবে। কিন্তু অংশীজন হিসেবে আমাদের ডাকলে আমরা এ পরামর্শ দিতে পারতাম। আমরা দৃষ্টিনন্দন একটা টার্মিনাল করলাম। কিন্তু এ টার্মিনালের সৌন্দর্য্যকে ব্যাহত করতে যাচ্ছে কার পার্কিং ভবন। আমরা সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৪-এর আদলে মাটির নিচে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করতে পারতাম। তাহলে সৌন্দর্যটা ঠিক থাকত। প্রথমে তো থার্ড টার্মিনালে কার পার্কিংয়ের প্ল্যানটাই ছিল না, এটা পরে যুক্ত করা হয়েছে। আমি দেখেছি অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে সেকেন্ড একটা এয়ারপোর্ট করেছে। সেখানে দীর্ঘ সময়ব্যাপী ইউজার যারা, আশপাশের যে জনবসতি, তাদের মধ্যে একটা সার্ভে করেছে। সে ইনপুটগুলো ইনকরপোরেট করা হয়েছে প্ল্যানিংয়ের মধ্যে। আমাদের এ প্ল্যানিংয়ে কিন্তু স্টেকহোল্ডারের সম্পৃক্ততা নেই। জনগণের সম্পৃক্ততাও নেই।

দেশের অভ্যন্তরীণ বিমান সংস্থাগুলো কি এ টার্মিনালের সুফল পাবে?

টার্মিনালটা হলে আমি আশা করি, যদি আমরা প্রশিক্ষিত জনবল দিয়ে পরিচালনা করতে পারি, এখানে যাত্রীরা একটা কমফোর্ট পাবে। এয়ারলাইনসগুলোও বাড়তি স্পেস পাবে। তবে এ টার্মিনালের মূল সুবিধাভোগী হবেন যাত্রীরা। আমাদের এয়ারলাইনসগুলোর এ টার্মিনাল সুবিধা নেয়ার জন্য সে প্রস্তুতি নেই। বিমানের যথেষ্ট ফ্লাইট নেই এ টার্মিনাল ব্যবহারের জন্য? আবার প্রাইভেট এয়ারলাইনসের তো ওই ধরনের প্লেনই নেই যে এখানকার পুরো সুবিধা ব্যবহার করবে। ইউএস বাংলার সীমিতসংখ্যক এয়ারক্রাফট আছে। অন্যদের একটিও প্লেন নেই। ফলে দেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিমান ও ইউএস বাংলা ছাড়া আর কেউ এ টার্মিনালের সুবিধা পাবে না। তবে আমরা যদি টার্মিনালটি সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারি, তাহলে যাত্রীদের জন্য নিঃসন্দেহে এটি ভালো একটি স্থাপনা হয়ে উঠবে।

টার্মিনাল-৩ কে কেন্দ্র করে নভোএয়ারের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে?

নভোএয়ারের পরিকল্পনা কোনো টার্মিনাল কেন্দ্রিক নয়। আমাদের পরিকল্পনা হলো মার্কেট ফোরকাস্ট কেন্দ্রিক। পরিকল্পনা করার ক্ষেত্রে যাত্রী চাহিদা ও প্রতিযোগী সংস্থাগুলোর সক্ষমতাসহ আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোকে আমরা প্রাধান্য দিই। তাই মার্কেটের ওপর ভিত্তি করে নভোএয়ারের পরিকল্পনাগুলো করা হচ্ছে। শুধু থার্ড টার্মিনালকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আমাদের কোনো পরিকল্পনা নেই।

শাহজালাল ছাড়াও দেশের অন্য বিমানবন্দরগুলোর উন্নয়নেও সরকার কাজ করছে। দেশের এভিয়েশন খাতের জন্য এগুলো কতটা সুফল বয়ে আনবে?

আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল দেশের এভিয়েশন অবকাঠামোগুলো বাড়াতে হবে। ঢাকায় অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল খুবই অপ্রতুল ছিল, এখনো আছে। যশোর ও সৈয়দপুরে পুরনো টার্মিনাল ছিল। ২০১৪-১৫ সালের পর থেকে এসব অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। সেদিক থেকে আমরা খুবই উৎসাহিত ও আনন্দিত। এজন্য বিশেষভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ দিতে চাই। উনার দীর্ঘমেয়াদি ভিশনের কারণেই এগুলো সম্ভব হয়েছে। তবে যতই অবকাঠামো গড়ে তুলি না কেন, সেগুলো যথাযথভাবে পরিচালনা করতে না পারলে যাত্রীরা তার সুফল পাবে না। তাই অবকাঠামোর পাশাপাশি বিমানবন্দরগুলো পরিচালনার দিকেও আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। আর একটি বিষয় হলো নির্মাণ ব্যয়। আমি যদি তুলনা করি, বেঙ্গালুরুতে যে টার্মিনাল তৈরি করা হয়েছে সেটা আয়তনে আমাদের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি। সেটার খরচ হয়েছে ৪ হাজার ৫০০ কোটি রুপি। বাংলাদেশের টাকায় হয়তো সাড়ে ৫ হাজার কোটি থেকে ৬ হাজার কোটি টাকার মতো। অথচ আমাদের টার্মিনাল করতে ২১ হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে, যা শেষ করতে হয়তো সব মিলিয়ে ৩০ হাজার কোটি টাকা লেগে যাবে। অন্তত পাঁচ গুণ বেশি খরচ আমরা করছি। এ টাকা দিয়ে আমরা দেশের অনেক বন্ধ বিমানবন্দর চালু করতে পারতাম। নতুন বিমানবন্দর তৈরি করতে পারতাম। খরচের দিকটাও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। আমাদের প্রশ্ন করতে হবে, প্রতিবেশী ভারতের চেয়ে আমাদের খরচের পার্থক্য এত বেশি কেন?