টার্মিনাল-৩ সফট লঞ্চিংয়ের মধ্য দিয়ে নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। দেশের এভিয়েশন খাতের এ মাহেন্দ্রক্ষণে টার্মিনালটির নানা দিক নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন জিএসএ-এয়ার এশিয়া ও টাস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোরশেদুল আলম চাকলাদার

হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩ উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশের এভিয়েশন খাতে কী পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে?

এখন আমরা যেটা দেখি, যারা দেশের বাইরে যান তাদের বাবা-মা, আত্মীয় সবাই এসে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন। রোদ, বৃষ্টি, গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এটা একটি অমানবিক ব্যাপার। আমি সবসময়ই ভাবতাম যদি তাদের জন্য বসার একটু জায়গা থাকত। এ অবস্থার একটু হলেও অবসান হবে টার্মিনাল-৩ চালুর মধ্য দিয়ে। আমরা কখনই ভাবিনি বাংলাদেশে এত সুন্দর বিমানবন্দর পাব। এমন নান্দনিক বিমানবন্দর উপহার দেয়ার জন্য প্রথমেই সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। তৃতীয় টার্মিনালের সঙ্গে যদি দ্বিতীয় একটি রানওয়ে হয় সেটি এভিয়েশন সেক্টরের জন্য খুবই ভালো হতো। টার্মিনাল হিসেবে ফ্লেক্সিবিলিটি বাড়বে। বেশকিছু অটোমেশনেরও ব্যবস্থা আছে। বুথে ই-পাসপোর্ট দিয়েই ইমিগ্রেশন পার হওয়া যাবে। এটি অসাধারণ এক পদক্ষেপ। কাউন্টারগুলো বাড়ানো হচ্ছে। মানুষকে আর ভিড়ের মধ্যে পড়তে হবে না। আরো এয়ারলাইনস আকৃষ্ট হবে। সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার জন্য আগ্রহী হবে। অনেক ধরনের পরিবর্তন আসবে এ খাতে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইনকাম জেনারেটিং চেঞ্জিং। সরকার এখান থেকে আয় করবে। আশা করি ঢাকার বাইরের বিমানবন্দরগুলোয়ও ভালো ইকুইপমেন্ট আসবে। কক্সবাজারে যেটা হচ্ছে সেখানে যখন আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হবে, তখন ট্যুরিজম বাড়বে। মানুষের আয়ও বাড়বে। বিভিন্ন ইস্যুর কারণে যারা বাংলাদেশে আসে না তারাও আসবে। অনেক ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর মাধ্যমে আরো ১৫-১৬টি এয়ারলাইনস আসবে বলে আমি মনে করি।

দেশের অর্থনীতিতে কেমন ভূমিকা রাখবে এ টার্মিনাল?

উদাহরণস্বরূপ একটি বিষয় বলতে চাই। মনে করুন আপনি একটি রেস্টুরেন্ট করেছেন। সেখানের খাবার যদি ভালো হয়, পরিবেশন সুন্দর হয়, পরিবেশ ভালো হয়, নানা জায়গা থেকেই মানুষ খাবারের স্বাদ নিতে আসবে। স্বাভাবিকভাবেই তৃতীয় টার্মিনালের ফলে বিভিন্ন এয়ারলাইনস আসবে। ট্যুরিজম উন্নত হবে। মালয়েশিয়া থেকে আগে যদি ১১টি ফ্লাইট আসত, তার পরিবর্তে এখন যদি দৈনিক ২০টি ফ্লাইট আসে, তখন কম দামে টিকিট পাওয়া যাবে। ডিমান্ড অনুযায়ী সাপ্লাই আসছে। ডিমান্ড অনুযায়ী সাপ্লাই থাকলে যাত্রীরা কম ভাড়ায় ভ্রমণ করতে পারবেন। দেশ থেকে যাওয়া বা বিদেশ থেকে আসার জন্য সবাই ভাববে এখন আর ভোগান্তিটা নেই। মুভমেন্ট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আয়ও বাড়বে, যার প্রভাব দেশের অর্থনীতিতেও পড়বে।

সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগও তো তৈরি হচ্ছে।

অবশ্যই। সিভিল এভিয়েশনের গ্রাইন্ড হ্যান্ডেলিং পুরোটাই বিমান বাংলাদেশ করে। যতগুলো বিমান নামে তার বিপরীতেই একটা ব্যয় আছে। এখন যে সংখ্যক বিমান দৈনিক অবতরণ করে তৃতীয় টার্মিনালের ফলে যদি আরো বেশি বিমান অবতরণ করে তাহলে অবশ্যই সরকারের আয় বাড়বে।

ঢাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরে একের অধিক স্বাধীন রানওয়ের প্রয়োজন কতটা?

প্রয়োজনটা অনেক বেশি। টার্মিনাল আছে কিন্তু বিমান ল্যান্ড করতে না পারলে পরিপূর্ণতা আসবে না। দুটোই পাশাপাশি হওয়া দরকার। আপনি রান্না করছেন কিন্তু খাবার লোক নেই, আবার আপনি লোক দাওয়াত দিয়েছেন কিন্তু খাবার নেই তাহলে কিন্তু হবে না। তৃতীয় টার্মিনালের পাশাপাশি যদি একটা রানওয়ে হয় সেটা বেটার হবে। পাশাপাশি যদি আরো একটি স্বাধীন রানওয়ে হয়, তাহলে আরো অনেক বেশি ফ্লাইট মুভমেন্ট হবে, ল্যান্ডিং সহজ হবে, আরো নতুন এয়ারলাইনস আসবে। এ সেক্টরে যেভাবে ফোকাস আসছে তাতে ‘‌টুডে অর টুমরো’ ঘুরে দাঁড়াবে। 

এভিয়েশন খাতে আর কী কী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে আপনি মনে করেন?

বাংলাদেশ ধীরে ধীরে এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে উঠবে। বাংলাদেশ থেকে এশিয়া অঞ্চল কভার করা খুবই সহজ। মধ্যপ্রাচ্য কভার হচ্ছে, ইউরোপে যাওয়াটাও খুব একটা কষ্ট হচ্ছে না। বাংলাদেশে বর্তমানে যে এয়ারলাইনস আছে, এর পাশাপাশি আরো বেশ কয়েকটি লোকাল এয়ারলাইনস হওয়ার সুযোগ রয়েছে। অভ্যন্তরীণ এয়ারলাইনস বাড়লে প্রতিযোগিতা বাড়বে। আগে মানুষ চিন্তাই করত না ঢাকা-সৈয়দপুর-রাজশাহী-খুলনা-বরিশাল এসব এলাকায় বিমানে যাতায়াত করবে। মানুষ বাস, ট্রেনে যাতায়াত করত। মানুষ এখন সময় বাঁচাতে চায়। কর্মদক্ষতাও বাড়ছে। যাওয়া-আসা মিলিয়ে বিমানে যে খরচ পড়বে মানুষ ভাবছে সেটা তার সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ না। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বাড়লে এ বিষয়গুলো আরো সহজ হবে। 

তৃতীয় টার্মিনাল কেন্দ্র করে তাস গ্রুপের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কিনা?

আমাদের অবশ্যই পরিকল্পনা রয়েছে। আমরাও চেষ্টা করছি। আমরা বিভিন্ন এয়ারলাইনসের সঙ্গে কাজ করছি। তারাও আগ্রহী হচ্ছে। আরো এয়ারলাইনস আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশে যত বেশি এয়ারলাইনস থাকবে, বাজার তত প্রতিযোগিতাপূর্ণ হবে, টিকিটের দাম কমবে, মানুষ উপকৃত হবে। তাস গ্রুপ আরো জিএসএ ও এয়ারলাইনসের জন্য চেষ্টা করছে। আমাদের ডেভেলপমেন্ট টিম কাজ করছে। আশা করছি সামনে ভালো সংবাদ আসবে ইনশা আল্লাহ।