ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩-এর সফট লঞ্চিং হচ্ছে আজ। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) আশা করছে, আগামী বছরের শেষ নাগাদ নতুন এ টার্মিনাল বাণিজ্যিকভাবে চালু হবে। দৃষ্টিনন্দন ও অত্যাধুনিক এ টার্মিনালের মধ্য দিয়ে নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে দেশের আকাশ পরিবহন খাত। টার্মিনাল-৩ যাত্রীদের যেমন স্বাচ্ছন্দ্য দেবে, তেমনি বিমান পরিবহন সংস্থাগুলোও আকৃষ্ট হবে। বেবিচকের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের অর্থনীতিকে আরো গতিশীল করে তুলবে নতুন এ টার্মিনাল।

‘‌হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রথম পর্যায়’ প্রকল্পের মাধ্যমে গড়ে তোলা হচ্ছে এ তৃতীয় টার্মিনাল। ২০১৭ সালের অক্টোবরে অনুমোদিত প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খরচ হচ্ছে ২১ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা। প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থ ঋণ হিসেবে দিচ্ছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)।

২ লাখ ৫৪ হাজার বর্গমিটার আয়তনের টার্মিনালটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে জাপানের মিৎসুবিশি ও ফুজিতা করপোরেশন এবং কোরিয়ার স্যামসাংয়ের জয়েন্ট ভেঞ্চার ‘এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম’। বেবিচকের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন টার্মিনাল চালুর পর শাহজালাল বিমানবন্দরের সক্ষমতা আড়াই গুণ বাড়বে।

বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী ধারণ সক্ষমতা ৮০ লাখ। তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে প্রতি বছর নতুন করে আরো ১ কোটি ২০ লাখ যাত্রীকে সেবা দেয়া যাবে বলে জানিয়েছেন বেবিচকের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রুটের সংখ্যা বাড়বে এবং নতুন নতুন গন্তব্য বাংলাদেশের আকাশপথের সঙ্গে যুক্ত হবে।

আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টার্মিনাল-৩ সফট ওপেনিং করবেন। উদ্বোধনের পর এর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট আনুষ্ঠানিকভাবে থার্ড টার্মিনাল ব্যবহার করে ঢাকা ছাড়বে। এর প্রস্তুতি হিসেবে এরই মধ্যে নির্মাণাধীন এ টার্মিনালের কিছু অংশ ব্যবহার করে দুটি উড়োজাহাজে যাত্রী ওঠানামা করেছে। গত সোমবার বিমানের ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু ফ্লাইটটি (বিজি-৩৭১) প্রথমবারের মতো তৃতীয় টার্মিনালের কিছু স্থাপনা ব্যবহার করে ঢাকা ছাড়ে। বোয়িং ৭৩৭ সরু বডির উড়োজাহাজটি হাই-স্পিডি ট্যাক্সিওয়ে দিয়ে থার্ড টার্মিনালের পার্কিং বেতে দাঁড়ায়। সেখান থেকে থার্ড টার্মিনালের বোর্ডিং ব্রিজ দিয়ে ওই ফ্লাইটে ওঠেন যাত্রীরা। তবে ইমিগ্রেশনসহ, চেক-ইন ও নিরাপত্তা তল্লাশিগুলো পুরনো টার্মিনাল-২-এ সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার একইভাবে আরেকটি কাঠমান্ডু ফ্লাইট থার্ড টার্মিনাল ব্যবহার করে পরিচালনা করা হয়।

বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, স্মার্ট বাংলাদেশের স্মার্ট বিমানবন্দর হতে যাচ্ছে এ তৃতীয় টার্মিনাল। আগত ও বহিরাগত যাত্রীদের জন্য টার্মিনালটিকে মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্টের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। যত ধরনের ট্রান্সপোর্ট নিয়ে আমরা চিন্তা করতে পারি, সবই সংস্থান রাখা হয়েছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে টার্মিনালটি যুক্ত করা হয়েছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে আরো কানেক্টিভিটি বাড়ানোর জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে মহাসড়ক, মেট্রোরেলের মতো যোগাযোগ অবকাঠামোর সঙ্গেও টার্মিনালটি সংযুক্ত করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। হজ ক্যাম্প থেকে এবং বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে আন্ডারগ্রাউন্ড টানেলের মাধ্যমেও এ টার্মিনালের সংযোগ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে এরই মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, যার কাজ শিগগির শুরু হবে।

মফিদুর রহমান বলেন, ‘আন্ডারগ্রাউন্ড টানেলটি কার্যত আমাদের বিমানবন্দরের জন্যই সুফল বয়ে আনবে। যাত্রীদের সুবিধার জন্য টার্মিনাল ভবনের পূর্ব পাশে একটি বহুতল পার্কিং ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। যেখানে একসঙ্গে ১ হাজার ২৩০টি গাড়ি পার্ক করে রাখা যাবে।’

টার্মিনাল-৩-এর গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাজের জন্য জাপানের একটি কোম্পানি আগ্রহ দেখিয়েছে বলে বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন বেবিচকের কর্মকর্তারা। তারা জানিয়েছেন, আগ্রহী জাপানি প্রতিষ্ঠানকেই এ কাজ দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে তারা কাজ করবে। তবে জাপানের কোন কোম্পানি এবং কীভাবে তাদের কাজ দেয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি বেবিচক কর্মকর্তারা।

শাহজালালের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর পর যাত্রী হয়রানি অনেকাংশে কমে যাবে বলে মনে করেন আকাশ পরিবহন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌এতদিন আমাদের যে টার্মিনালটা ছিল সেটা অনেক পুরনো। এটা লাইনিং করা হয়েছিল ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের একটা বিমানবন্দর হিসেবে। তৎকালীন প্রাদেশিক রাজধানীর বিমানবন্দর হিসেবে প্ল্যান করা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের আগ পর্যন্ত কিছুটা কাজ করা হয়েছিল। তারপর স্বাধীনতার পর আবার কাজ করা হয়। এরপর ১৯৮১ সালে এয়ারপোর্টটা যাত্রা শুরু করে। সে সময় যে যাত্রী সংখ্যা ছিল, যে মুভমেন্ট ছিল তখনকার চেয়ে এখন ১০০ গুণ বেড়ে গেছে। এরপর কিছু সংযোজন-বিয়োজন হয়ে স্টপ গ্যাপ মুভমেন্ট আকারে আজকের এ পর্যায়ে এসেছে। ইন্টারন্যাশনাল যে টার্মিনালটা আছে, তার সঙ্গেই পাশে কিন্তু ডমিস্টিক অপারেশন্স হতো। পরে ধীরে ধীরে আলাদা করা হয়েছে। কিন্তু একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যে প্ল্যান দরকার ছিল তা সম্ভব হয়নি। যে কারণে আমাদের কিছু সমস্যা সৃষ্টি হতো। যাত্রীদের কমফোর্টনেস, সিকিউরিটিসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যেভাবে করা দরকার ছিল তা কিন্তু করা যায়নি। নতুন টার্মিনাল হওয়ায় এটা পরিকল্পনামাফিক করা যাচ্ছে। ফলে নিরাপত্তাসহ যে বিষয়গুলো বিবেচনা করা দরকার তার সবই বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে এটা অনেক বেশি বাস্তবমুখী হয়েছে। এর মাধ্যমে যারা এ এয়ারপোর্ট ব্যবহার করবে তাদের জন্যও অনেক সুযোগ-সুবিধা পাবে। এয়ারপোর্টে যাত্রীদের হয়রানি অনেকাংশে দূর হয়ে যাবে।’